কমবয়সেই ‘হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ কীভাবে

52
মশিয়ার রহমান কাজল ##  তরুণ বয়সে, যখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাঠ নিচ্ছি তখনকার কথা দিয়ে আলোচনা শুরু করি। কমবয়সি বা বছর তিরিশের কোনও ব্যক্তির বুকে ব্যথা হওয়ার প্রথম কারণ হিসেবে ‘হার্ট অ্যাটাক’ বা ‘করোনারি ধমনীর’ সমস্যার কথা বললেই শিক্ষকরা জোর ধমক দিতেন! আজ, পঞ্চাশ বছর পরে, দেখছি কোনও যুবক বা যুবতীর বুকে ব্যথার কারণ হিসেবে হার্টের অসুখের কথা প্রথমে না বললেই বরং শিক্ষক তাঁর ছাত্রকে ধমক দেবেন!
মোট কথা, সমগ্র বিশ্বেই কমবয়সে হার্ট অ্যাটাকের সংখ্যা বাড়ছে। এক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান যথেষ্ট উদ্বেগজনক।
কোন বয়স কমবয়স?
মোটামুটি ৪০ থেকে ৪৫ বছর বয়সের নীচে কোনও ব্যক্তির হার্ট অ্যাটাক হলে সেক্ষেত্রে ‘কমবয়সে হার্ট অ্যাটাক’ হয়েছে বলা যায়।
বিশ্বের খতিয়ান—
• ৪০ বছর বয়সের নীচে হার্ট অ্যাটাকের সংখ্যা প্রতি বছরে ২ শতাংশ।
• ৩০ থেকে ৩৪ বছর বয়সি প্রতি হাজার পুরষের মধ্যে ১৩ জনের হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে।
• ৩৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সি প্রতি হাজার জন মহিলার ৫ জন হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছেন।
নজরের আড়ালে!
কমবয়সে হার্ট অ্যাটাক নিয়ে এই আলোচনায়, বিদেশের এক সমীক্ষার কথা বলা দরকার। নানা কারণে প্রাণ হারিয়েছিলেন এমন ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সি ৭৫০ জন ব্যক্তির ময়নাতদন্ত এবং ধমনি পরীক্ষা করে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি প্রতি ১০০ জন প্রাণহীন ব্যক্তির মধ্যে ২ জনের ধমনীতে ভালো রকম অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস হতে দেখা গিয়েছে। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, রক্তবাহী ধমনীতে প্লাক (ধমনীর ভিতরের গাত্রে কোলেস্টরল ও অন্যান্য চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে তৈরি হয় প্লাক।) জমে সেই রক্তবাহী ধমনী সরু ও অনমনীয় হয়ে পড়ার প্রক্রিয়াকে বলে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস। হার্ট অ্যাটাকের মূল কারণ হল এই অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস।
ফিরে আসি সমীক্ষার ফলাফলে। ওই স্টাডিতেই দেখা যায়, ৩০ থেকে ৩৪ বছর বয়সি পুরুষের মধ্যে শতকরা ২০ জনের ধমনীতে ভালোরকম প্লাকের অস্তিত্ব আছে। মহিলাদের ক্ষেত্রে আবার ওই বয়সে প্লাক জমার শতকরা হিসেব ৮। অর্থাৎ এভাবেই নজরের আড়ালে ধীরে ধীরে, ১০ বছর বয়সের পর থেকেই হার্ট অ্যাটাক হওয়ার জন্য দায়ী উপাদানগুলি জমা হচ্ছে আমাদের রক্তবাহী নালীতে! অতএব হৃদরোগের প্রতিরোধ শুরু করা উচিত শৈশব থেকেই।
লক্ষণের বিবিধ প্রকাশ—
• ধরা যাক, কমবয়সি কোনও ব্যক্তির হার্টের ধমনীতে প্লাক জমছিল দীর্ঘদিন ধরেই। ক্রমশ সরু হচ্ছিল ধমনী। অথচ রোগের কোনও বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি। এভাবেই যখন ধমনী বেশি সরু হয়ে যায় তখন কোনওভাবে ওই ব্যক্তির হার্টরেট বেড়ে গেলে বা ওই ব্যক্তি পরিশ্রম করা শুরু করলে অথবা ওই ব্যক্তি উত্তেজিত হয়ে পড়লে দেখা যাবে তিনি বুকে চাপ ও ব্যথা অনুভব করছেন! আসলে হার্ট রেট এবং রক্তচাপ বেড়ে গেলে হার্টের পেশিতে আরও বেশি অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। অথচ ধমনী সরু হয়ে যাওয়ার ফলে হার্টের পেশিতে যে পরিমাণে রক্ত সরবরাহ করা প্রয়োজন পড়ে তা সরবরাহ না হলে হার্টে কষ্ট শুরু হয়। ওই ব্যক্তি বুকে চাপ অনুভব করেন।
• কমবয়সিদের মধ্যে এইরকম কোনও পূর্বলক্ষণ ছাড়াও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। কারণ, অনেকখানি প্লাক জমে ততটা ধমনী সরু না হলেও, প্লাক বিপদ ঘটাতে পারে অন্যভাবেও। প্লাকের উপর কোনও ক্ষত তৈরি হলে বা প্লাক ফেটে গেলে সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে রক্তনালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এভাবে রক্তনালীতে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ভয় থেকেই যায়।
• কমবয়সে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস ছাড়াও শতকরা ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে অন্য কারণেও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, করোনারি ধমনীতে জন্মগত ত্রুটি থাকলে অকালে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এছাড়া কানেক্টিভ টিস্যু ডিজিজ অথবা অটোইমিউন ডিজিজ (উদাহরণ হিসেবে সিস্টেমিক লুপাস এরিথেমাটোসাস বা এসএলই-এর কথা বলা যায়) এর মতো অসুখে শরীরের বিভিন্ন রক্তবাহী নালী সরু হতে থাকে। হার্টের রক্তবাহী নালীও একইভাবে সরু হয়ে যায় যার ফলশ্রুতি হল হার্ট অ্যাটাক।
অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস এবং হার্ট অ্যাটাক হওয়ার অন্যান্য ঝুঁকি
• নানা কারণে হৃদপিণ্ডের করোনারি ধমনীর অন্দরের দেওয়ালের আস্তরণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই সমস্যাকে বলে এন্ডোথেলিয়াল ডিসফাংশন। এছাড়া অনেকের রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা থাকে বা রক্ত তরল রাখার সমস্যাও থাকতে পারে। এই সব কারণেও হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বাড়ে।
• কোনও ব্যক্তির বংশে অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার প্রবণতা থাকলে তাঁরও কমবয়সে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার আশঙ্কা বা঩ড়ে। দেখা গিয়েছে, কোনও ব্যক্তির বাবা অথবা মায়ের মধ্যে কোনও একজনের প্রি ম্যাচিওর হার্ট ডিজিজ থাকলে ওই ব্যক্তির কমবয়সে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার আশঙ্কা থাকে ৬০ থেকে ৭৫ শতাংশ। আবার কোনও ব্যক্তির ভাই-বোনের মধ্যে অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ইতিহাস থাকলে ওই ব্যক্তির কমবয়সে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায় ৪০ শতাংশ।
• বাবা অথবা মায়ের কমবয়সে (বাবার ৫৫ বছর বয়সের নীচে ও মায়ের ৬৫ বছর বয়সের নীচে) হার্ট অ্যাটাক হলে ওই পরিবারের সন্তানাদির মধ্যে কমবয়সে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
• উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, ধূমপান, তামাক সেবন, মদ্যপানের অভ্যেস অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস এবং হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বাড়িয়ে তোলে।
• রক্তে এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইডস-এর মাত্রা বৃদ্ধি পেলেও এবং ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিএল-এর মাত্রা কমলে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বাড়ে। এছাড়া নতুন কিছু বিষয় গবেষকদের নজরে এসেছে— রক্তে হোমোসিস্টিন, ফিব্রিনোজেন, লাইপোপ্রোটিন এ, স্মল ডেন্স এলডিএল, অ্যাপো বি-এর মতো উপাদানের মাত্রা বৃদ্ধিও হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বাড়িয়ে তোলে।
• শরীরের অন্যান্য অংশের মতো ধমনীর অন্দরের গাত্রে প্রদাহ হতে পারে। এই ধরনের প্রদাহ হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বাড়িয়ে তোলে। প্রদাহের মাত্রা নির্ণয়ের জন্য কিছু কিছু মার্কার রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে হাই সেনসিটিভিটি সি রিয়্যাকটিভ প্রোটিন-এর কথা বলা যায়।
• কিছু কিছু ইনফেকশন যেমন কোভিড-এর মতো সংক্রমণও হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বাড়িয়ে তোলে বলে জানা যাচ্ছে। তবে এই বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা করা দরকার।
• অতিরিক্ত স্ট্রেস বাড়িয়ে তোলের হার্টের অসুখের আশঙ্কা। এই স্ট্রেস দীর্ঘদিনের হতে পারে অথবা হঠাৎ হওয়া প্রচণ্ড শক বা উত্তেজনাও (উদাহরণ হিসেবে হঠাৎ প্রিয়জনের মৃত্যুর কথা শুনে তৈরি হওয়া স্ট্রেস-এর কথা বলা যায়) হতে পারে ।
• নিষিদ্ধ ড্রাগ গ্রহণ যেমন কোকেন বা অ্যামপিটামিন-এর সেবন ডেকে আনতে পারে অকালে হার্ট অ্যাটাক।
কখন পরীক্ষা
কোনও ব্যক্তির হার্টের অসুখের লক্ষণ দেখা দিলে অথবা ওই ব্যক্তি উল্লিখিত ঝুঁকির আওতায় থাকলে ৩০ বছর বয়সের পরে কিছু কিছু পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া দরকার—
• লিপিড প্রোফাইল অবশ্যই করাতে হবে। তবে নতুন যে রক্তের মার্কার গুলির কথা বলা হল (হোমোসিস্টিন, ফিব্রিনোজেন, লাইপোপ্রটিন এ, স্মল ডেন্স এলডিএল, অ্যাপো বি, হাই সেনসিটিভিটি সি রিয়্যাকটিভ প্রোটিন), সেগুলির মাত্রাও দেখে নিতে হবে।
জীবনযাত্রার অবশ্য পরিবর্তন দরকার
মদ্যপান, ধূমপান এবং যে কোনও রকম তামাকের ব্যবহার ছাড়তে হবে। ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ওজন বেশি থাকলে কমাতে হবে। আর হ্যাঁ, অতিঅবশ্যই ব্যায়াম করতে হবে। ব্যায়ামের অনেক সুফল আছে। ব্যায়াম হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করে। এমনকী দেখা গিয়েছে হার্ট অ্যাটাকের রোগীর দ্রুত সেরে ওঠার ক্ষেত্রেও ব্যায়ামের ভূমিকা রয়েছে। খাদ্যতালিকায় ভাজাভুজির মাত্রা কমানোর সঙ্গে টাটকা শাকসব্জি ও ফলের পরিমাণ বাড়ানোও দরকার। তাই অসুখ থাকুক বা নাই থাকুক, সুস্থ থাকতে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের দিকে নজর দিতেই হবে। এভাবেই জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অল্প বয়সে হৃদরোগ প্রতিরোধ করা যেতে পারে। আর অসুখ এড়াতে জীবনে সংযম আনতে হবে শৈশব থেকেই।