• ৩০শে নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, রাত ১১:৩০
  • রেজিস্ট্রেশন ৪৬১

একবার রোপণ করে একই গাছ থেকে পাঁচবার ধান

বার্তাকন্ঠ
প্রকাশিত নভেম্বর ২২, ২০২১, ১৮:২৪ অপরাহ্ণ
একবার রোপণ করে একই গাছ থেকে পাঁচবার ধান
ডেস্ক রিপোর্ট ।।
প্রথমবারের মতো একবার একটি ধানগাছ রোপণ করে একই গাছ থেকে পাঁচবার ফলন পাওয়া গেছে। বোরো জাতের এ নতুন ধানগাছ উদ্ভাবন করে চমক সৃষ্টি করেছেন, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার জিনবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী।
এক রোপণে পাঁচবার ধান!
ড. আবেদ চৌধুরী আগাম উন্নতজাত আমন ধান কানিহাটি-১ নামের আরেকটি ধানও উদ্ভাবন করেছেন। এ ধানের বিশেষত্ব হলো, বীজতলা থেকে শুরু করে মাত্র ১১০ দিনে ধান জমি থেকে ঘরে উঠানো যায়। আর প্রতি শতকে আঠারো কেজি সম্পূর্ণ চিটামুক্ত ধানের উৎপাদন হয়।
প্রবাসী এ বিজ্ঞানী দীর্ঘদিন ধরে ধানের নতুন জাত আবিষ্কার নিয়ে গবেষণা চালিয়ে আসছে। এক ধান গাছ থেকে পাঁচবার ফলন পাওয়াতে তিনি সন্তুষ্ট নন। যাতে ছয়বার একই গাছ থেকে ধান পাওয়া যায় এ নিয়ে বর্তমানে গবেষণা করছেন। একই সাথে নতুন জাতের এ ধান যাতে সারাদেশে চাষাবাদ করা যায় সেই চেষ্টা চালাচ্ছে।
ড. আবেদ চৌধুরীর সাথে কথা বললে তিনি জানান, তার জন্মমাটি কানিহাটি গ্রামের নামে রাখা কানিহাটি-১ নতুন জাতের এ ধান অত্যন্ত কম সময়ে জমি থেকে উঠানো যাবে। তিনি জানান, আমন ধান বীজতলা থেকে শুরু করে মাত্র ১১০ দিনে ধান পাকবে। এ ধান প্রতি শতকে জমিতে আঠারো কেজি উৎপাদন হওয়ার ক্ষমতা রাখে। সেই সাথে সবকটি ধান হবে সম্পূর্ণ চিটামুক্ত। তাছাড়া উৎপাদনও হবে অন্যান্য ধানের চেয়ে বেশি।
জানা যায়, বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রে কৃষি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে অস্ট্রেলিয়া চলে যায়। অস্ট্রেলিয়ায় জাতীয় গবেষণা সংস্থার প্রধান হিসাবে ধান বিষয়ে ধানের জিন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনি জানান, এ পর্যন্ত তিনি তার একক প্রচেষ্টায়  তিনশ’ জাতের নতুন ধান উদ্ভাবন করেছেন।
ড. আবেদ চৌধুরী জানান, অন্যান্য গাছের মতো বছরের পর বছরজুড়ে টিকে থাকতে পারে না ধান গাছ। এটি নিয়ে তার মধ্যে একটি চিন্তার জন্ম নেয়। ভাবেন গবেষণার কথা। এতেই তিনি মনোযোগ দেন ধান গবেষণা নিয়ে। প্রথমে গবেষণা করতে নামেন ধানের দ্বিতীয় জন্ম নিয়ে। টানা চৌদ্দ বছর তিনি নানাভাবে এ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। তিনি জানান, ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে তার নিজ গ্রাম কানিহাটিতে দুই শতকের এক টুকরো জমিতে বিশটি ধানের জাত নিয়ে নামেন গবেষণা করতে। গবেষণায় এ ধানের মধ্যে ছিল ফিলিপাইন, চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশের স্থানীয় প্রজাতির ধান।
ফলন হলে ধান পাকার পর কেটে নিয়ে যাবার শেষে যে গাছ থেকে শীষ বের হয় এসব ধানগাছ আলাদা করেন তিনি। এ রকম এক সাথে বারোটি ধানের জাত সংরক্ষণ করে পরবর্তীতে এসব ধান তার জমিতে টানা তিন বছর চাষ করতে থাকেন। দেখা যায় এসব ধানে নিয়মিতভাবে দ্বিতীয়বার ফলন দিচ্ছে।
এরপর শুরু করেন এক ধান গাছ থেকে তৃতীয়বার ফলন কিভাবে আসে এ নিয়ে গবেষণা। এতে দেখা গেল মাত্র চারটি জাতের ধানগাছ চতুর্থবার ফলন দিলেও অন্যসবকটি মারা যায়। জিনবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী জানালেন, এ চারটি জাতের ধানগাছ একবার রোপণে পাঁচবার ফলন দিচ্ছে। তিনি এ চার জাতের ধানের উপর দশ বছর ধরে গবেষণা করছেন। গবেষণা সফল করতে চলতি বছর বোরো মৌসুমে এই চারটি জাত পনেরো শতক জমিতে রোপণ করা হয়।
প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ ও সঠিক পরিচর্যার পর দেখা যায়, ১১০ দিনের মধ্যে পঁচাশি সেন্টিমিটার থেকে এক মিটার লম্বায় পরিণত হয় গাছগুলো। একই সাথে ধান গাছে ফলনও ভালো আসে। এরপর জমির মাটি থেকে উপরে প্রয়োজন মতো পয়ত্রিশ সেন্টিমিটার ধান কাটা হয়।
ড. আবেদ চৌধুরী জানান, চলতি বছর জুন মাসে প্রথমবার ধান কাটতে গিয়ে হেক্টরপ্রতি চার মেট্রিক টন ধান উৎপাদন পাওয়া গেছে। পরবর্তী সময়ে ৪৫ দিন অন্তর প্রতি মৌসুমে হেক্টরপ্রতি দুই থেকে তিন মেট্রিক টন ধান পাওয়া গেছে। সবকটি জাত হেক্টর প্রতি ষোল মেট্রিক টন উৎপাদন দিয়েছে।
গবেষণায় দুটি পদ্ধতির মাধ্যমে ধানের জাতগুলো তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় জাতের সঙ্গে বিভিন্ন উচ্চ ফলনশীল জাত এবং স্থানীয় জাতের সাথে স্থানীয় হাইব্রিড জাতের সংকরায়ন করা হয়েছে।
সরকারি হিসাব মতে, হেক্টর প্রতি ধান উৎপাদন হয় তিন থেকে চার মেট্রিক টন। জিনবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী এই সফলতাকে ঐতিহাসিক ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি নিজ গ্রামের কৃষকদের সহায়তায় গবেষণা সফল ভাবে পরিচালনা করতে পারায় কৃষকদের কাছে কৃজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বিজ্ঞানী ড. আবেদ তার উদ্ভাবিত ধান গাছকে বর্ষজীবী বলে আখ্যায়িত করছেন। কারণ ব্যাখ্যা দিতে তিনি বলেন, একটা মৌসুমের পর ধানগাছ সাধারণত মারা যায়। তবে তার এ উদ্ভাবিত ধানগাছ বোরো, আউশ ও আমন এ তিন মৌসুমে সারা বছর ধরেই ফলন দিবে।
পাঁচ ফলনশীল এই ধানের চারা সাধারনত পাঁচ সেন্টিমিটার দূরত্বে রোপণ করতে হবে। এতে গাছটি ভালোভাবে পুষ্টি নিয়ে বড় হতে পারবে। এছাড়াও একটি গাছ থেকে আরও বেশকয়েক ধানগাছের জন্ম দেবে। এতে করে ফলনও বৃদ্ধি পাবে।
এছাড়াও ড. আবেদ এ ধরনের ধান গাছকে পরিবেশবান্ধব উল্লেখ করে বলেন, এক জমি একাধিবার চাষ দিলে মিথেন গ্যাস ও কার্বনড্রাইঅক্সাইড প্রচুর নির্গত হয় যা পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। কিন্তু এ ধান একবার চাষে উৎপাদন খরচ অনেকটা কম হবে। এ ধানের চাষাবাদ অন্য ধানের মতোই সহজ। বীজতলা থেকে চারা নিয়ে ধান রোপণ করা যায়।
বার্তাকণ্ঠ/এন

Sharing is caring!