• ৫ই আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২১শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, সকাল ৯:৩১
  • রেজিস্ট্রেশন ৪৬১

কেমন হবে আগামীর সাংবাদিকতা

bmahedi
প্রকাশিত ডিসেম্বর ৭, ২০১৯, ১৮:০৫ অপরাহ্ণ
সাংবাদিকতার প্রেক্ষাপট সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশ পরিবর্তিত হচ্ছে। সাংবাদিকতার সবচেয়ে বেশি প্রাধান্যের জিনিসটা হচ্ছে যোগাযোগ। আমাদের সমাজব্যবস্থা আর কাঠামোর যোগাযোগব্যবস্থা যেমন হবে, সাংবাদিকতার পরিসর এবং ব্যবস্থাপনা সেরকমভাবেই গড়ে উঠবে। সাধারণ মানুষের কাছে অজানা তথ্য পৌঁছে দেওয়াই সাংবাদিকতার মূলমন্ত্র। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি কোন উপায়ে এই তথ্য পৌঁছে দিচ্ছেন, সেটার ওপরই নির্ভর করবে সাংবাদিকতার ধরন। তথ্য পৌঁছানোর প্রক্রিয়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। যেমনটা হচ্ছে— রাজাধিরাজদের শাসনামলে ঢোল পিটিয়ে খাজনা আদায়ের যে বার্তা, সেটাই তখনকার সাংবাদিকতা, কিংবা এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে দূতের মাধ্যমে যে বার্তা পাঠানো হতো সেটাই সাংবাদিকতা। এই যে একেক সময়ের একেক যোগাযোগের ধরন, সেই আলোকেই বর্তমান সাংবাদিকতার এই রূপ।

বলতে গেলে একুশ শতকের শুরুতে এই দেশে মিডিয়ার বিপ্লব ঘটেছে। স্যাটেলাইট টেলিভিশনের জয়যাত্রায় সাংবাদিকতারও বিপ্লব ঘটেছিল। তখনকার সাংবাদিকতায় যারা এসেছিলেন, তাদের সামাজিক মর্যাদা ছিল অনেকটা ওপরে। খুব অল্পসংখ্যক হলেও যারা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকতায় আসতেন তারা একটি ভিন্ন পরিচিতি পেতেন সারা দেশে। মিডিয়া বিপ্লবের শুরুতে সাংবাদিকতা ছিল শুধু টেলিভিশন আর পত্রিকাকেন্দ্রিক। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে আর সেরকমটি নেই। যোগাযোগমাধ্যমে যোগ হয়েছে অনেক নতুনত্ব। যাকে বলা হয় নিউ-মিডিয়া। আমরা এখন যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক বৈচিত্র্যপূর্ণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করি। এসব মাধ্যমের ফলে সাংবাদিকতার ধরনটাই পাল্টে গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে সাংবাদিকতা যে হুমকির সম্মুখীন এ কথাও সর্বজনবিদিত। কারণ এখন মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের আগে যে কোনো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে যায়। এর ফলে যারা সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত তাদের পড়তে হয় ঝামেলায়। যা মানুষ জানে, তা নিশ্চয় কেউ পরের দিন জানতে চাইবে না, নতুন কিছু জানাতে গিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে হয় সাংবাদিকদের। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের দিকটি হচ্ছে লাইভ রিপোর্টিং। যে যেখানে পারছে সেখান থেকেই লাইভ দেখানোর এক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে, কারণ কোন চ্যানেলের আগে কোন চ্যানেল দেখাতে পারবে এই চিন্তায় থাকে মিডিয়া হাউজসহ সংবাদকর্মীরা। সুতরাং দর্শকদের আগ্রহ আর সবার আগে সব তথ্যের বিবেচনায় লাইভ রিপোর্টিং জায়গা করে নিয়েছে প্রথম স্থান। যোগাযোগের এই মাত্রাটির পরিবর্তন সংবাদিকতাকে ভিন্ন কিছুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে দিন যতই যাচ্ছে ততই পরিবর্তিত হচ্ছে সাংবাদিকতার ধারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে মূলধারার সাংবাদিকতা হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদন করতে সব ধরনের নিয়মের বাইরেও যেতে হচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে সব কাঠামো। এমন পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন থেকেই যায়, কেমন হবে আগামীর সাংবাদিকতা?

আগামীর সাংবাদিকতার একটি দিক সবচেয়ে স্পষ্ট। আর তা হচ্ছে সময়ের দিকটি। আমরা যত সভ্য হচ্ছি ততই সময়ের মূল্য বেড়ে যাচ্ছে। খুব বেশি সময় ধরে আমরা কোনো কিছুই দেখতে কিংবা পড়তে ইচ্ছুক নই। আগামীতে সময়ের প্রতি আমাদের আরো বেশি সীমাবদ্ধতা চলে আসবে। এই সময়কে কেন্দ্র করে সাংবাদািকতার ধরন পাল্টাবে। যে যত কম সময়ে যত বেশি তথ্য দিতে পারবে সে এগিয়ে থাকবে অনেকটা। সাংবাদিকতার ধরন পাল্টাচ্ছে। যোগ হচ্ছে নতুন নতুন ধারা। এর মধ্যে বর্তমান সময়ে মোবাইল জার্নালিজম (মোজো) অনেকটা বিকশিত হচ্ছে। মোবাইল জার্নালিজম অনেক বেশি দর্শক টানছে। সব ধরনের মিডিয়া হাউজ নজর দিচ্ছে মোবাইল জার্নালিজমের ওপর। মানুষের সময় আর চাহিদার দিকে লক্ষ রেখে নতুন নতুন দিক জায়গা করে নিচ্ছে সাংবাদিকতায়। পঞ্চম জেনারেশনের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ, ফলে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ব্যাপক প্রভাব পড়বে, টেকনিক্যাল অনেক কিছু হয়তো বদলে যেতে পারে এর কারণে। অনেক শঙ্কা এবং সম্ভাবনার দিক রয়েছে এতে।

প্রযুক্তির কল্যাণে চাকরি হারাতে হচ্ছে অনেক মানুষকে। আগে যেখানে কয়েকজন লোক প্রয়োজন ছিল, সেখানে একজন লোককে দিয়েই অনেক কাজ করিয়ে নিতে পারছে মিডিয়া। যেখানে ক্যামেরাম্যান, ফটোগ্রাফার আলাদাভাবে কাজ করত, সেখানে একজন রিপোর্টারই সব কিছু পারছে। একাই তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে, সংবাদ সম্পাদনা পর্যন্ত করছে। এটি সাংবাদিকতার পরিবর্তনের ইঙ্গিত। আগামীর সাংবাদিকতায় শঙ্কা যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে সম্ভাবনাও। সাংবাদিকতা এখন আর সীমাবদ্ধতার ভেতর থাকছে না, থাকছে না কোনো কাঠামোর মধ্যে। নিজেদের ভেতরকার সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে সাংবাদিকতায় নতুন দিগন্ত সূচনা করা সম্ভব। মানুষের ভেতরকার মনোভাব বুঝে সে অনুযায়ী নতুন কিছু দিতে পারলে সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে সাংবাদিকতা। যোগ্যতার অভাবে অনেকে হোঁচট খাচ্ছেন, তবে যারা যোগ্য তারা অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে যাচ্ছে এই সাংবাদিকতা দিয়েই। নিত্য নতুন কলাকৌশল শিখতে হবে নবীনদের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে মূলধারার সাংবাদিকতা যেন হারিয়ে না যায়, কিংবা প্রযুক্তি যেন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়; সেই দিকটি লক্ষ রেখেই কাজ করে যেতে হবে।

আগামীর সাংবাদিকতায় হুমকির চেয়ে সম্ভাবনাই বেশি। আমাদেরকে হতাশ হলে চলবে না, নিজেদের প্রস্তুত করতে পারলে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। নতুন নতুন ধারাকে বুঝে নিয়ে, সে অনুযায়ী তথ্য সরবরাহের ব্যবস্থাটিই সাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় উপায়। এই দেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখতে হবে আমাদেরই। একটু ভাবতে হবে কোন দিকটিতে আমরা পৌঁছাতে পারি, কোন দিকটি সাংবাদিকতার জন্য খোলা। যারা এই সম্ভাবনাকে বুঝতে পারে, আগামীর সাংবাদিকতা জগতের নেতৃত্বে তারাই আসবে। সময়ের সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিবর্তন আমাদের মেনে নিতে হবে। যারা আগামী নিয়ে ভাববেন না তারা সাংবাদিকতার উৎকর্ষতা থেকে বঞ্চিত হবেন। আমাদের সবার প্রত্যাশা, এই দেশে সুষ্ঠু সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটুক। প্রযুক্তির কারণে হারিয়ে না গিয়ে বরং আরো নবদিগন্তের সূচনা হোক সাংবাদিকতার জগতে।

Sharing is caring!