• ২৮শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, দুপুর ২:৫৬
  • রেজিস্ট্রেশন ৪৬১

কেরানীগঞ্জে কবিরাজের ভুল চিকিৎসায় পা হারালো শিশু

বার্তাকন্ঠ
প্রকাশিত অক্টোবর ৬, ২০২১, ১৩:১৮ অপরাহ্ণ
কেরানীগঞ্জে কবিরাজের ভুল চিকিৎসায় পা হারালো শিশু

দেলোয়ার হোসেন, ঢাকা ব্যুরো ।।

ঢাকার দক্ষিন কেরানীগঞ্জে ৬ দিনের শিশু অনিক কান্না করায় আবদুল্লাহপুর রসুলপুর রোড (কলাকান্দি চৌরাস্তা ) বাজারের কদমপুর এলাকার কবিরাজ, দেব কিশোর ওরফে ধীমান সরকার এর নিকট নিয়ে গেলে ঝার-ফুক দেয়, পরে ছোট্ট শিশুটির মা ও বাবাকে কোন কিছুই না বলে শিশুর পায়ে ট্রাইজন নামে ইনজেকশন পুশ করে এই বলে আর কান্না করবে না ভালো হয়ে যাবে। ঘটনাটি ঘটে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আব্দুল্লাহ্পুর মধ্যপাড়া এলাকায়। শিশু অনিকের মা বাবার বাড়ি একই এলাকায় হলেও তারা মারফত মিয়ার ভাড়া বাসায় থাকেন।কবিরাজ  নাম নরেন্দ্রনাথ ওরফে কিশোর,তার পিতা হরিপদ, সেও একজন কবিরাজ বলে জানা গেছে। কিশোর কবিরাজির পাশাপাশি ফার্মেসি খুলে ঔষধ বিক্রি করে। শিশু অনিক গত ৯ সেপ্টেম্বর দুনিয়ায় আলো দেখে জন্ম নেয়। জন্মের ৬ দিন পর শিশুটি কান্নাকাটি করলে অসুস্থ হয়ে পরে। চিকিৎসার জন্য স্থানীয় কবিরাজ ও কথিত ডাক্তার কিশোরের কাছে নিয়ে এলে সে ঝারফুক ও একটি ট্রাইজন নামক ইনজেকশন পুশ করে। শিশুটিকে বাসায় নিয়ে এলে রাতে কান্না না থেমে আরো বেড়ে যায়। দ্বিতীয় দিন আবার সেই কবিরাজ এর নিকট নিয়ে গেলে সেইদিন ও কবিরাজ আবার একটি ইনজেকশন পুশ করে। তৃতীয় দিন শিশুর পা ফুলে গেলে কবিরাজ বলে ঢাকা মেডিকেলে দেখাতে। কোন উপায় খুঁজে না পেয়ে একালার স্থানীয় মাদবরদের নিকট বিচার দেন শিশু অনিকের বাবা আবুল বাসার। মাদবররা বিচার কবিরাজকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলে কবিরাজ শিশুটিকে ইনজেকশন দেয়ার কথা স্বীকার করেন। তাকে চাপপ্রয়োগ করলে কবিরাজ তাদের কথা মত বাচ্চার চিকিৎসার সকল খরচ বহন করবে বলে জানান। কথিত ডাক্তার ও কবিরাজ নিজেই প্রথমে শিশুটিকে স্যার সলিমুল্লাহ্ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে ভর্তি করান।সেখানে শিশু অনিক এর অবস্থা অবনতি হলে ঢাকার আজগর আলী হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ডাক্তার শিশুটিকে ভর্তি করাতে না পেরে বাংলাদেশ স্পেশালাইড হাসপাতালে ভর্তি করার। তবে সেখানে এআইসিও না থাকায় ধানমন্ডিতে মাদার কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসক জানান শিশু অনিকের ডান পায়ের হাড়ে পচন ধরেছে। এখন তার পা কাটা ছাড়া কোন উপায় নেই। অবশেষে গত ২৬ সেপ্টেম্বর শিশুটির পা কেটে ফেলা হয়। এখন চিকিৎসা সেবার ব্যয় বহন করতে না পারায় গত কাল সন্ধ্যায় শিশুটিকে পঙ্গু অবস্থায় বাড়ী নিয়ে আসে অনিকের বাবা আবুল বাসার ও মা সীমা বেগম বাসায় ফিরে ২৩ দিন পর নির্মম ঘটনার কথা সাংবাদিকদের নিকট খুলে বলেন।শিশুর বাবা আবুল বাসার অভিযোগ করে বলেন, কবিরাজ না বলে ইনজেকশন পুশ করার কারনে আমার আদরের ধন আজ পঙ্গু। আমার ছেলের মত কোন মানুষ হাতুড়ে চিকিৎসাকের নিকট না যায় আর কোন শিশুর পা হাড়াতে না হয়। আমি এর সঠিক বিচার ও শাস্তি দাবী করছি। এ ব্যাপারে স্থানীয় মাদবর খবির মিয়া বলেন, শিশুটির বাবা আমার আত্মীয় কবিরাজ তার ভুলের সব ঘটনা সত্যি বলেছে এবং কবিরাজ নিজে বাচ্চার চিকিৎসার সব খরচ দিবে বলে হাসপাতালে ভর্তি ও করিয়েছেন। জানতে পেড়েছি ২লক্ষ ১০ হাজার টাকার খরচ করেছে। পরিবার আমাকে জানিয়েছেন পা কাটার পর নাকি সে মাদার কেয়ার হাসপাতালে টাকা পরিশোধ করে চলে এসেছে। স্থানীয় মাদবর ও বাড়ি ওয়ালা মারফত ভান্ডারী বলেন, আমার কোন বোধগম্য হয় না কবিরাজ কেন এই ৬ দিনের বাচ্চাকে ধরে ইনজেকশন দিবে সে তো কবিরাজ। এখন বাচ্চাটির কি হবে? কবিরাজ দেব কিশোর ওরফে ধীমান সরকার নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে বলেন, আমি একজন পল্লী চিকিৎসক ও আমার বাবা কবিরাজি করতেন বলে, তার কাছ থেকে শিখে আমিও উৎসাহ পাই এবং ঝাড়ফুক করে আসছি । আমি প্রায় ৩৫ বছরধরে এ কাজ করছি।  ওই শিশুটির বয়স যখন ৬ দিন তখন শিশুটিকে তার মা আমার কাছে নিয়ে আসলে আমি তাকে নাভী শুকানো ও ঠান্ডা ভালো করার জন্য দুদিন ঝাড়ফুক ও দুটি ট্রাইজন ইনজেকশান পুশ করি। পরে জানতে পারি যে তার পায়ে ইনফেকশন হয়েছে। তার দাবী জম্মের পর থেকে তার ইনফেকশন ছিল। এরকম অবস্থায় স্থানীয়রা মিমাংসা করে দেয় যে, শিশুটিকে চিকিৎসা বাবদ সকল খরচ আমি বহন করবো। আমি স্থানীয়দের শালিসে রাজি হয়ে শিশুটিকে প্রথমে ঢাকার ওয়ারী এলাকায় আজগর আলী হাসপাতাল ও বাংলাদেশ স্পেশালাইড হাসপাতাল এবং শেষে ধানমন্ডি মাদার কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করি। শেষে গত ২৬ সেপ্টেম্বর শিশুটির পা কেটে ফেলতে হয়। এতে আমার মোট ২ লাখ ২০ (বিশ)হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মকর্তা ডাঃ মসিউর রহমান বলেন, কবিরাজি ও নামধারি ডাক্তারির নামে যারা অপচিকিৎসা করছে আমরা তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করবো। ভুল চিকিৎসার জন্য শিশুটির পা কেটে ফেলা অত্যান্ত দুঃখজনক। পা হারানো শিশু অনিক এর পিতা মাতার সাথে যোগাযোগ করে উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে এনে ফ্রী চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহন করবো। আমরা এর পূর্বে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছি। আবারোআমাদের ভ্রাম্যমান আদলত পরিচালনা করব। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কেরাণীগঞ্জ সার্কেল শাহাবুদ্দিন কবির বলেন, ভুল চিকিৎসার জন্য শিশুটির পা কেটে ফেলা অত্যান্ত দুঃখজনক। আর কেরানীগঞ্জের অলিগিলতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও নামে বেনামে ফার্মেসিতে যারা অপ চিকিৎসা বা ভুল চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। আমি শুনেছি তবে শিশুটির পরিবারের কেউ কোন অভিযোগ নিয়ে আসেনি। অভিযোগ পেলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।

Sharing is caring!