• ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, বিকাল ৫:০৫
  • রেজিস্ট্রেশন ৪৬১

চালের বাজার: সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় ক্রেতা

বার্তাকন্ঠ
প্রকাশিত আগস্ট ২৩, ২০২১, ১৫:০০ অপরাহ্ণ
চালের বাজার: সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় ক্রেতা

ছবি: সংগৃহীত

বাণিজ্য ডেস্ক ।।

বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যপণ্য চাল। বাজারে কারসাজির ক্ষেত্রেও প্রধান হয়ে উঠেছে পণ্যটি। নিত্যদিনের আবশ্যিক এই পণ্য কিনতে প্রতিনিয়ত মানুষ শিকার হচ্ছেন অসহিষ্ণু কারসাজির। হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়তে হচ্ছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে। ভয়াবহ করোনা ছোবলের মধ্যে থেমেও নেই চালের বাজারের কারসাজি। করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সংকটে অনেকে কাজ হারিয়েছেন, ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন, আয় কমে গেছে। এর মধ্যে ভোগান্তি বাড়াচ্ছে চালের বাজার। প্রতিনিয়ত চালের বাজার নিয়ে কারসাজি চললেও এর দায় নিতে চায় না কেউই। এমনকি সরকারও কারসাজির পেছনে কারা আছে তাদেরকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে সক্রিয় হচ্ছে না কোনো সময়ই। 

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গরিব, মধ্যবিত্তের মোটা ও মাঝারি চালের বাজার সবচেয়ে বেশি ওঠানামা করে। এই দুই প্রকার চালের ক্রেতাই সবচেয়ে বেশি। করোনাভাইরাস ও ডেঙ্গুর প্রকোপে মানুষের জীবন যখন সংশয়ে, তখনই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চালের বাজার। মোটা চাল এখন বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫০ টাকা। এক বছর আগে যার দাম ছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকার মধ্যে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, চালের মানভেদে বাজারে গত এক বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৭ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত। অথচ সরকারি তথ্য মতে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ চাল উৎপাদন হয়েছে।

রাজধানীর কয়েকটি বাজার সূত্রে জানা গেছে, ইরি বা স্বর্ণা মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৪৮ থেকে ৫০ টাকায়। এ ছাড়া মাঝারি মানের চাল পাইজাম ও লতা ৫০ থেকে ৫৬ টাকা, সরু চাল নাজিরশাইল ও মিনিকেট ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চালের দাম বাড়লেই কেউ এর দায় নিতে চায় না। ব্যবসায়ীরা দোষ দেন মিল মালিকদের ঘাড়ে। আর মিল মালিকরা বলেন, সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকার একজন চাল বিক্রেতা বলেন, বর্তমানে বাজারে চালের দাম একটু বেশি। মিল মালিকরা প্রতি মৌসুমে চাল কিনে মজুদ করে রাখেন। এ কারণেই এখন চালের দাম বেশি। পাইকারি বাজারে চালের দাম বেশি, তাই খুচরাও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো ব্যবসায়ীদের ঘাড়ে দোষ দিলেন মিল মালিকরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ অটো মেজর হাস্কিং রাইস মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী বলেন, মিল গেটে চালের দাম বৃদ্ধির খবর একেবারেই ভিত্তিহীন। অধিকাংশ মিল এখনো প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৪০ টাকা কেজি দরে সরকারি গুদামে চাল দেওয়ায় ব্যস্ত। মিল মালিকরা নয়, ধান-চালের ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানই অধিক মুনাফার আশায় অবৈধ মজুদ করেছেন। আমরা প্রতি ১৫ দিন পর পর ধান কেনা, চাল বিক্রি এবং মজুদের তথ্য সরকারকে দিচ্ছি। তারপরেও বাজারে এই অস্থিতিশীলতার জন্য কারা দায়ী সেটা খুঁজে বের করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগের বছরগুলোতে বাজারে ধান-চালের সংকট থাকলে দাম বেড়ে যায়। সরবরাহ কম থাকলে এবং চাহিদা বেশি হলে দাম বাড়বে এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু এ বছরের চিত্র ভিন্ন। সরকারের কাছে প্রচুর চালের মজুদ রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে এখন ১৬ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ আছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে চালের মজুদ রয়েছে ১৩ লাখ টন।

আবার ভারত থেকে চাল আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য শুল্কহার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। সরকারিভাবে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল আমদানি করা হচ্ছে। এরপরও চালের দাম হু হু করে বাড়ছে।

এ প্রসঙ্গে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বলেন, মাঝারি ও সরু চালেরও দাম বাড়ছে। অবৈধভাবে কেউ চালের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে কি-না আমরা তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। আমরা চাচ্ছি, বেসরকারিভাবে কিছু আমদানি হোক। সেটার জন্য উদ্যোগ নিচ্ছি। চাহিদা অনুযায়ী আমদানি করা হবে। আমরা চাই কৃষক এবং ভোক্তা কেউই যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তাই যতটুকু দরকার ততটুকুই আমদানি করা হবে। আপাতত ১০ লাখ টন চাল আমদানির চিন্তা করছি। প্রয়োজন হলে আরও বেশি করতে পারি।

এ বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, সরকারিভাবে চাল আমদানি হচ্ছে এবং বেসরকারিভাবে চাল আমদানির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। ভোক্তাদের প্রতি মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের মানবিক হতে হবে। অতি মুনাফাখোর ও অবৈধ মজুদদারদের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে, এটি আরও জোরদার করা হবে। পাশাপাশি অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে দ্রুতই অভিযান শুরু হবে।

এ দিকে সরকারের তরফ থেকে বারবার মুখে হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও, চালের বাজারে কারসাজির বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতেই বারবার কারসাজি করার সুযোগ পাচ্ছে সিন্ডিকেট। খাদ্য মন্ত্রণালয় বরাবরই বলা হয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এবারের চালের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয় বলছে, চালের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে একাধিকবার ব্যবসায়ী, মিলার, স্থানীয় প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাবুল কুমার সাহা বলেন, চালের বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সারাদেশে আমাদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। আমরা অভিযান পরিচালনা করার পর গত এক মাসে চালের দাম আর বাড়েনি। তবে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এ ধরনের অভিযান চালিয়ে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ রাখা যাবে না।

বাজার নিয়ন্ত্রণের বিকল্প পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও বলেন, অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মত মিল থেকে কী দামে, কোন ব্যবসায়ীর কাছে কত পরিমাণ চাল হস্তান্তর হয়, সেই তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে অভিযান চালিয়ে ভুয়া দাম ঘোষণাকারী ও কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। সূত্র- সাম্প্রতিক দেশকাল

Sharing is caring!