• ২৫শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৯ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, সন্ধ্যা ৭:২২
  • রেজিস্ট্রেশন ৪৬১

জলাতঙ্কের নিশ্চিত মৃত্যু প্রতিরোধ সম্ভব 

বার্তাকন্ঠ
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২১, ০৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ
জলাতঙ্কের নিশ্চিত মৃত্যু প্রতিরোধ সম্ভব 
ডেস্ক রিপোর্ট।। 
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে রাত সাড়ে ১১টার দিকে কুকুরে কামড়ানো এক রোগী আসেন ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। আঠারো বছরের এই তরুণকে প্রায় আড়াই মাস আগে কুকুর কামড়ায়। সে চিকিৎসা না করিয়ে গ্রামের কবিরাজ থেকে পানি পড়া, তাবিজ নেয়। তবে দিন দিন ছেলেটির অবস্থা খারাপ হতে থাকে। অ্যাগ্রেসিভ আচরণ সঙ্গে অতিরিক্ত লালাক্ষরণ হতো তার। এমনকি পানি বাতাস দেখে ভয় পেতো বলে তাকে এ  হাসপাতালে ভর্তি করাতে নিয়ে আসেন স্বজনরা। পরদিন সকাল সাড়ে নয়টার দিকে সে মারা যায়।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এরকম রোগী প্রতিদিন গড়ে আড়াই শ’ থেকে প্রায় ৩০০  হাসপাতালে আসে।
হাসপাতালের দায়িত্বরত একজন চিকিৎসক বলেন, এ হাসপাতালে কাজ করতে না এলে আমার নিজেরও জানা ছিল না, প্রতিদিন ‘অ্যানিমেল বাইট’র কারণে অসুস্থ হয়ে এত মানুষ আসেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই চিকিৎসক বলেন, পোষা প্রাণির ক্ষেত্রে বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ের কারণে বেশি রোগী পান তারা। এ ছাড়া কুকুরের কামড়েও রোগী আসছে। আর এসব প্রাণির কামড় বা আঁচড়ের কারণে হয় জলাতঙ্ক।
চিকিৎসকরা বলছেন, জলাতঙ্ক হলে মৃত্যু নিশ্চিত। এটি একটি মরণব্যাধি। জলাতঙ্ক র‍্যাবিস ভাইরাসজনিত একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ। ব্র্যাবিস ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত কুকুর রোগটির প্রধান বাহক। তবে বিড়াল, খেঁকশিয়াল, বেজি, বান, বাদুড়ের কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমেও জলাতঙ্ক হতে পারে। তবে আশার কথা হচ্ছে, যদি যথাসময়ে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয়; টিকা নেওয়া যায় তাহলে মৃত্যু প্রতিরোধ সম্ভব। আর তাই সচেতনতার প্রতিই জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
তারা বলছেন, জলাতঙ্কের চিকিৎসা এখন পুরো দেশজুড়ে রয়েছে। কিন্তু মানুষ চিকিৎসকের কাছে যেতে চায় না। এমনকি টিকাও নিতে চায় না। তারা গ্রামের টোটকা, চিকিৎসায় বেশি আগ্রহী। আর তাতেই আসলে মৃত্যু হয় বেশি। মানুষ অসচেতন বলেই এটা হচ্ছে। কিন্তু সময়মতো অর্থাৎ কামড় বা আঁচড়ের সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত স্থান সাবান পানি দিয়ে ধুয়ে পূর্ণ ভোজ টিকা গ্রহণের মাধ্যমে রোগটি শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ওই চিকিৎসক বলেন, ভ্যাক্সিনেশনের কোনও বিকল্প নেই। কারণ জলাতঙ্কের উপসর্গ দেখা দিলে আর কোনও চিকিৎসা নেই। তাই কেবলমাত্র সচেতন হতে হবে।
প্রতিবছর বিশ্বে ৫৯ হাজারের বেশি মানুষ জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এ রোগের ভয়াবহতা উপলব্ধি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধ ও নির্মূলের লক্ষে ২০০৭ সাল থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেও বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস উদযাপন করে আসছে।
দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘জলাতঙ্ক: ভয় নয়, সচেতনতায় জয়’।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের জুনোটিক ডিজিজ কন্ট্রোল কর্মসূচি জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির ২০২০-২১ অর্থবছরে সারাদেশে জেলা সদর হাসপাতালে ৬৭টি এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০১টি কেন্দ্রের মাধ্যমে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী অ্যান্টি র‌্যাবিস ভ্যাকসিন (এআরভি) এবং র‌্যাবিস ইমোনোগ্লুবিন (আরআইজি) সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরবরাহ করে আসছে। প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে তোলা হয়েছে জলাতঙ্ক কর্নার।
আর আক্রান্ত স্থান ১৫টি মিনিট ধরে ধৌত করা হলে উক্ত স্থানে উপস্থিত ৭৫-৮০ ভাগ জলাতঙ্কের জীবাণু চলে যায়।
২০১২ সালে বিনামূল্যে প্রায় এক লাখ ২০ হাজারের বেশী রোগী টিকা পেয়েছে যা ২০১৯ সালে বৃদ্ধি পেয়ে আড়াই লাখ হয়েছে। রাজধানী ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, চট্টগ্রামের বিআইটিআইডি হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম ও জেলা সদর হাসপাতালের তথ্য থেকে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানাচ্ছে, ২০০৯ সালে জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে আনুমানিক ২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। আর চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৩০ জনের মতো।
জলাতঙ্ক নির্মূলে ব্যাপকহারে কুকুরের টিকাদান কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়ে চলতি বছরের এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশজুড়ে কুকুরের জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকাদান (এমডিডি) কার্যক্রমের আওতায় দেশের ৬৪ জেলায় প্রথম রাউন্ড, ১৬ জেলায় দ্বিতীয় রাউন্ড আর সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধা জেলায় তৃতীয় রাউন্ড টিকাদান কার্যক্রমের আওতায় প্রায় ২১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৩৯টি কুকুরকে জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকা দেওয়া হয়েছে।
একমাত্র সচেতনতাই পারে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ করতে-  এমনটিই জানালেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম।
আঁচড় বা কামড় হোক- এ দুটোর যেকোনও একটি হলেও হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে টিকা নিলে জলাতঙ্কে একটিও মৃত্যুর হয় না। শতভাগ সেফ হয়ে যায়। আর এটা খুব জরুরি- বলেন তিনি।
অধ্যাপক নাজমুল ইসলাম বলেন, কাউকে যদি কুকুর বিড়ালে কামড়ায়; আর তাকে যদি টিকা না দেওয়া হয়, তাহলে হাড্রেড পারসেন্ট ডেথ। কিন্তু যদি টিকা নেওয়া যায়, তাহলে শতভাগ এই মৃত্যুকে প্রতিরোধ সম্ভব।
এজন্য দেশের ৬৪ জেলা সদর হাসপাতালে জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধক হিসেবে শতভাগ ব্যবস্থা রয়েছে। দেশের ১০১টি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সবকিছু রয়েছে। তাহলে কেবলমাত্র সচেতন হয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে জানিয়ে অধ্যাপক নাজমুল ইসলাম বলেন- অপচিকিৎসা, টোটকা কোনও অবস্থাতেই যেন না করা হয়।

Sharing is caring!