• ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, রাত ৩:৫৪
  • রেজিস্ট্রেশন ৪৬১

তাকদীরের ব্যাপারে ভ্রান্ত আক্বীদা

বার্তাকন্ঠ
প্রকাশিত নভেম্বর ২১, ২০২১, ১৮:২১ অপরাহ্ণ
তাকদীরের ব্যাপারে ভ্রান্ত আক্বীদা
হাফেজ মাওঃ মেহেদী হাসান।।
নেক মূর্খ লোক আছে, যারা ইবাদত-বন্দেগী, নামায-রোযার ধার ধারে না, সময় পেলেই তাকদীর নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু করে দেয় এবং এমন কথা বলতে শুরু করে, যা ঈমানের জন্যে হুমকিস্বরূপ; যেমন তারা বলে- সবকিছুই যখন আল্লাহ তা‘আলা লিখে রেখেছেন, তাহলে চোরের কী দোষ? মদখোরের কী দোষ? আল্লাহ তা‘আলা যখন কে জান্নাতী কে জাহান্নামী লিখে রেখেছেন, তাহলে ইবাদত-বন্দেগী করে লাভ কী? আল্লাহ তা‘আলা শয়তানকে সৃষ্টি করলেন কেন? ইত্যাদি  বিভিন্ন অমূলক প্রশ্ন তারা করে থাকে।
এ ধরণের প্রশ্ন ঈমানের জন্যে ক্ষতিকর। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা যা করেন, তার বিরুদ্ধে আপত্তি করার অধিকার
কারো নেই।’  [সূত্র : সূরা আমবিয়া, আয়াত ২৩]
সুতরাং আল্লাহর বিরুদ্ধে এ ধরণের আপত্তি ও অভিযোগ করা কুফরী কাজ। মানুষের  কামিয়াবী আল্লাহর হুকুম-আহকামকে সরল অন্তঃকরণে মেনে নেয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। সুতরাং, কোন যুক্তি-তর্ক বা অভিযোগ উত্থাপন না করে আল্লাহর প্রতি এরূপ বিশ্বাস রাখা কর্তব্য যে, তিনি যা বলেন, যা করেন, যে আদেশ-নিষেধ করেন, সবই সহীহ, সঠিক ও বান্দার জন্যে মঙ্গলজনক। এর মধ্যে বান্দার অনিষ্টের কিছু্ই নেই। তাকদীরের ব্যাপারে শরী‘আতের বিধান এই যে, ঈমানের অঙ্গ হিসেবে মনে-প্রাণে তা মেনে নেয়া এবং এ ব্যাপারে নিজেদের বুদ্ধি-বিবেচনা দ্বারা বা কল্পনাপ্রসূত কোন তর্ক-বিতর্ক বা আলোচনা-পর্যালোচনা না করা কর্তব্য। নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আকল-বুদ্ধি দ্বারা তাকদীরের ব্যাপারে তর্ক-বাহাস করল, তাকে কিয়ামতের দিবসে এ জন্যে জবাবদিহী করতে হবে। আর যে ব্যক্তি তাকদীরের বিষয়ে কোন তর্ক-বাহাস করল না, তাকে এজন্যে কিয়ামতের দিবসে কোন কৈফিয়ত দিতে হবে না।’ [সূত্র : ইবনে মাজাহ ও মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা ২২।]
অপর এক হাদীসে এসেছে, একদিন নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইরে  আসলেন। তখন কতিপয় সাহাবী রাযি. তাকদীরের বিষয়ে তর্ক করছিলেন। তা দেখে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভীষণ রাগান্বিত হয়ে গেলেন। তাঁর  চেহারা মুবারক লাল বর্ণ ধারণ করল। তিনি বলতে লাগলেন, ‘তোমাদের কি এ বিষয়ে বাহাস করতে আদেশ করা হয়েছে? না আমাকে এ বাহাস করার জন্যে তোমাদের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে? তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাকদীরের ব্যাপারে তর্ক-বিতর্ক করে ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি তোমাদেরকে কঠোর নির্দেশ দিচ্ছি যে, তোমরা এ ব্যাপারে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়ো না।’ [সূত্র : তিরমিযী শরীফ। খণ্ড-২ পৃষ্ঠা ৩৪।]
সুতরাং এ ধরণের আপত্তিকর কথাবার্তা কোনক্রমেই না বলা উচিত। এ ধরণের উদ্ভট প্রশ্নকারীদের চিন্তা করে দেখা উচিত যে, আল্লাহ তা‘আলা পূর্ব হতেই সবকিছু জেনে সেভাবেই লিপিবদ্ধ করে থাকলে, তাতে আমাদের কী? আমরা তো আর সে লেখা দেখিনি বা জানিও না। তাছাড়া তিনি পূর্ব হতে লিখে রাখার দরুন আমাদের শক্তি তো লোপ পায়নি। আমাদেরকে তিনি ভালো-মন্দ বোঝার এবং সে অনুযায়ী কাজ করার শক্তি দান করেছেন এবং ভালো কাজ করার ও মন্দ কাজ না করার আদেশ দিয়েছেন। আমরা অতিক্ষুদ্র মাখলুক ও তাঁর দাস। সুতরাং তিনি আমাদেরকে যে আদেশ করেছেন, তা বিনা বাক্য ব্যয়ে শিরোধার্য করে নেয়াই আমাদের দায়িত্ব। তিনি কী লিখে রেখেছেন, তা আমাদের দেখার বিষয় নয়। বরং তার হুকুম তামিল করাই আমাদের দায়িত্ব। তাঁর প্রদত্ত শক্তির অপব্যবহার করলে কিংবা তাঁর আদেশ লঙ্ঘন করলে, এ নাফরমানির দরুন নিশ্চয়ই তাঁর নিকট জবাবদিহী করতে হবে এবং তাঁর প্রদত্ত শক্তির সহীহ ব্যবহার করলে, তাঁর আদেশ পালন করলে তিনি তার উত্তম প্রতিদান দিবেন।
বিস্ময়ের কথা হলো যে, তাকদীরের দোহাই দিয়ে লোকেরা আখিরাতের জন্যে নেক কাজের চেষ্টা-তদবির বন্ধ করে বসে থাকে এবং আল্লাহ তা‘আলার ফায়সালার ওপর খুবই ভরসা ও তাওয়াক্কুল রয়েছে বলে প্রকাশ করে; কিন্তু দুনিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যে, আয়-রোজগার, উন্নতি-অগ্রগতির ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ভরসা করে বসে থাকতে দেখা যায় না; বরং দুনিয়ার ব্যাপারে তারা অত্যন্ত হুঁশিয়ারি, খুবই কর্মঠ। যত রকম চেষ্টা-তদবির আছে, কোন কিছুই তখন আর বাদ থাকে না। অথচ ঐ সব ব্যাপারও তো সে মায়ের পেটে থাকা অবস্থায়ই আল্লাহ আল্লাহ তা‘আলা লিখে রেখেছেন যে, তার রিযিক কী পরিমাণ হবে? সে চেষ্টা করুক আর নাই করুক, ঐ পরিমাণ রিযিক তার ভাগ্যে জুটবেই। [সূত্র : সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ১৮]। এবং শত চেষ্টা-তদবির করেও তার থেকে একবিন্দু পরিমাণ রিযিকও সে বাড়াতে পারবে না।[সূত্র : সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৩০।]
উল্লেখ্য যে, মানুষ যতই মেহনত করুক, রিযিকের ব্যাপারে তার ভাগ্যের নির্ধারণ পরিমাণ ঠিকই থাকবে। তবে কেউ ধৈর্য ধারণ করলে হালাল পন্থায় অর্জন করবে, আর কেউ অধৈর্য হয়ে জায়িয-নাজায়িযের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে হারাম পন্থায় তা উপার্জন করবে। প্রশ্ন হলো, দুনিয়া ও আখিরাতের উভয় বিষয় যখন লেখা আছে, তাহলে একটার ব্যাপারে এত চেষ্টা-তদবির এবং দ্বিতীয়টার প্রতি উদাসীনতা কেন? যদিও সে আল্লাহর ওপর ভরসা দেখাচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে কি তাই? আসল কথা হলো, তাকদীরের ব্যাপারে আমাদের ঈমান বড় দুর্বল। আখিরাতের ব্যাপারে বিশ্বাস বড় কমজোর এবং আগ্রহের খুবই অভাব। কারণ, অধিকাংশ লোক ঈমান হাসিল করা, তা সহীহ-শুদ্ধ করা ও পাকা-পোক্ত করার ব্যাপারে চরম উদাসীন। এটাকে তো কোন কাজই মনে করে না; এর প্রতি কোন গুরুত্বই দেয় না এবং এর জন্যে কোন মেহনতের প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করে না। বরং পৈতৃক সূত্রে যে মুসলমানী নাম লাভ করেছে, তাকেই মু‘মিন ও মুসলমান হওয়ার জন্য যথেষ্ট মনে করে। মুসলিম মিল্লাতের অধঃপতনের জন্য একে মৌলিক কারণ বললে ভুল হবে না। আল্লাহ তা‘আলা সকলকে দ্বীনের সহীহ বুঝ দান করুন।
ভ্রান্ত আক্বীদা-২৮:
ধন-সম্পদ ও উন্নতি অগ্রগতির ব্যাপারে কিছু লোক বলতে শুরু করেছে যে, এগুলো ভাগ্যের সাথে সম্পৃক্ত নয়। যারা চালাক-চতুর, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের পলিসি ও টেকনিক জানা আছে, তারাই নিজ গুনে এ জাতীয় উন্নতি করতে পারে এবং অঢেল সম্পদের অধিকারী বা বিশিষ্ট শিল্পপতি হওয়া তাদের জন্যে কোন ব্যাপারই নয়। তাদের চিন্তাধারা আল্লাহর দুশমন কারুনের চিন্তাধারার ন্যায়।[সূত্র : সূরা কাসাস, আয়াত -৭৮।]
কুরআনের বহু আয়াতে রিযিক ও ধন-দৌলতকে আল্লাহর ফায়সালার সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, কোন একটি আয়াতেও মানুষের চেষ্টা-তদবিরের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়নি। সুতরাং তাদের এ বিশ্বাস কুফরী-আক্বীদা এর থেকে তাদের তওবা করা ফরয।
এই অধ্যায় যেসব ভ্রান্ত ও কুফরী আকীদার আলোচনা করা হলো, তার দ্বারা উদ্দেশ্য, মুসলমান ভাইদের ঈমান-আকীদার হেফাযত করা। প্রত্যেকে যেন এসব ভ্রান্ত আক্বীদা থেকে বেঁচে থাকতে পারেন। আল্লাহ না করুন, কেউ অজ্ঞতাবশত যদি এ ধরণের ভ্রান্ত আক্বীদা পোষণ করে থাকেন, তাহলে তিনি সেগুলো অন্তর থেকে ধুয়ে-মুছে উক্ত ভ্রান্ত আক্বীদা পরিহার করে খালিসভাবে তাওবা করে নিবেন।
জরুরী হুশিয়ারিঃ
কেউ এই কিতাব পড়ে কারো মধ্যে এমন কুফরী আক্বীদা প্রত্যক্ষ করলে, যার সম্পর্কে এই কিতাবে কাফির বলা হয়নি। তাকে কাফির বলবেন না বা কাফির ফাতাওয়া দিবেন না। কারণ, কুফরের মধ্যে বিভিন্ন স্তর রয়েছে, কোনটা উপরের স্তরের, আবার কোনটা নিচের স্তরের। উপরের স্তরের কুফর কারো মধ্যে পাওয়া গেলে, সে ব্যক্তি কাফির ও বেদ্বীন হয়ে ইসলাম থেকে বহিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু নিম্নস্তরের কুফর কারো মধ্যে পাওয়া গেলে যদিও উক্ত আক্বীদা নিঃসন্দেহের কুফর এবং তার পোষণকারী স্পষ্টভাবে কফির না হলেও নিশ্চিতভাবে পথভ্রষ্ট, গোমরাহ, বিদ‘আতী, ফাসিক ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত থেকে খারিজ। হাদীসে তাদেরকে ৭২ ফিরকার অন্তর্ভুক্ত ও জাহান্নামী বলা হয়েছে, কিন্তু কুফরের এসব স্তর নির্ণয় করা সহজ ব্যাপার নয়। একমাত্র বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ উলামা ও মুফতীগনই এগুলো নির্ণয় করতে পারেন। সুতরাং, যেসব আক্বীদা পোষণকারীকে এ কিতাবে কাফির বলা হয়নি, সে ধরণের কোন আকীদার হুকুম জানার প্রয়োজন পড়লে বিজ্ঞ উলামা ও মুফতীগণ থেকে জেনে নিবেন বলে আশা করি। প্রত্যেকে নিজে আন্দাজ-অনুমান করে দ্বীনের ব্যাপারে কিছু বলবেন না। এটা মহা অপরাধ। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে “ যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তার পিছে পড়ো না।” [সূত্র: সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৩৬।]
 
 বার্তাকণ্ঠ/এন

Sharing is caring!