• ২৫শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, রাত ৪:০১
  • রেজিস্ট্রেশন ৪৬১

বন ও পরিবেশ বাস্তবতার নিরিখে

বার্তাকন্ঠ
প্রকাশিত জুন ৮, ২০২১, ২০:০২ অপরাহ্ণ
বন ও পরিবেশ বাস্তবতার নিরিখে

বার্তাকণ্ঠ ডেস্ক ##

সম্প্রতি জাতীয় দৈনিকের একটি ছবি নজর কাড়ল। জনৈক ব্যক্তি চারাগাছ নিয়ে রিকশায় বাড়ি ফিরছেন। সে গাছ তিনি যত্ন করে রোপণ করবেন, যার সুফল ছড়িয়ে পড়বে প্রকৃতিতে। গ্রীষ্মের শেষ থেকে বর্ষা অবধি দেশের সর্বত্র এমন দৃশ্য আমাদের মুগ্ধ করে। তবে এর বিপরীত চিত্রও আছে। সমীকরণটা এমন- কিছু মানুষ গাছ লাগিয়েই যাচ্ছে, আর কিছু মানুষ গাছ কেটেই যাচ্ছে। এ মুহূর্তে আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় উদাহরণ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। যেখানে রীতিমতো আয়োজন করে বৃক্ষ নিধন করা হয়েছে। অথচ একটু সংবেদনশীল হলেই এমনটা ঘটত না। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ দূষণও তীব্র আকার ধারণ করেছে। কারখানার বর্জ্য একদিকে যেমন মাত্রাতিরিক্ত নদী দূষণ করছে। অন্যদিকে ইটভাটার চিমনির ধোঁয়া ফল-ফসলের মারাত্মক ক্ষতি করছে। প্রকৃত অর্থে একে ক্ষতি না বলে সর্বনাশ বলাই ভালো। আমাদের দেশে প্রকৃতি ও পরিবেশ দূষণের এমন চিত্র সর্বত্র। 

গত ১০০ বছরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বন, পাহাড় আর নদী। কারণ অধিকাংশ সাধারণ মানুষ এই তিন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদকে লুটের মাল মনে করে। মনে করা হয়, লুটপাট করে যা কিছু পাওয়া যায় তাতেই নিজের মঙ্গল। বনবিভাগ কর্তৃক দেশের সংরক্ষিত বনের যে চিত্র উপস্থাপন করা হয় তার সঙ্গে বাস্তবের বিশাল ফারাক। দেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত চুনতি বনের কথাই ধরা যাক। অন্যান্য বনের মতো এই বনেও বিদেশি গাছের আগ্রাসন ভয়ংকর অবস্থা তৈরি করেছে। পরিণত গাছপালা নেই বললেই চলে। বনতলের লতাগুল্ম সাফ-সুতরো। বনের ভেতর অবৈধ বসতি। মানুষের অবাধ যাতায়াত। সবচেয়ে আত্মঘাতী কাজ, বনে বিদেশি প্রজাতির বৃক্ষরোপণ। এই অপকর্মের মূল হোতা স্বয়ং বনবিভাগ ও স্থানীয় বাসিন্দারা। যদিও বনবিভাগ বলছে তারা বনের উজাড় হওয়া গাছপালার শূন্যতা পূরণে ২২ প্রজাতির দেশি-বিদেশি গাছ রোপণ করেছে; কিন্তু বাস্তবে তার কোনো সত্যতা মেলেনি। বনজুড়ে এখন শুধুই অ্যাকাশিয়ার বিস্তার। প্রস্তাবিত অন্য কোনো গাছই চোখে পড়ে না।

চুনতি বনে একসময় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছপালার মধ্যে বাইট্টা গর্জন, তেলিয়া গর্জন, ধূলিয়া গর্জন, চাপালিশ, বাঁশ, বেত, ফার্ন গাছ এবং বনকলা অন্যতম ছিল। এখন শুধু বিক্ষিপ্তভাবে কিছু গর্জন, ২-৪ বছর বয়সী কিছু বেত, হাতেগোনা কয়েকটি চাপালিশ, দু-একটি ছোট হরিণার দেখা মেলে। ছোট গাছের মধ্যে কাউ, জাম, দাঁতরাঙা, টগর, পিচণ্ডী এখনো যৎসামান্য টিকে আছে।

প্রসঙ্গত, সুন্দরবন ও মধুপুর বনের কথা বলা যায়। যা নিয়ে অসংখ্য লেখালেখি হয়েছে। এতে পরিবেশ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের অংশগ্রহণ উল্লেখ করার মতো। সেই সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকদের অবদানকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বিগত দশকগুলোতে শালবন ও সুন্দরবন নিয়ে যে পরিমাণ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে, তা জড়ো করলে বিস্মিত না হয়ে উপায় থাকবে না; কিন্তু কোনো ফলোদয় ঘটেনি। এসব খবরাখবর সরকারের টনক নাড়াতে পারেনি। লেখকরা লিখেছেন আর ‘বনভক্ষকরা’ নিশ্চিন্তে তাদের কাজ চালিয়ে গেছেন। অদূর ভবিষ্যতে শালবনকে শুধু ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া যাবে। বনবিভাগের পৃষ্ঠপোষকতায়ই নিঃশেষ হলো শালবন। বিকল্প উডলট বন নামে এই অথর্ব প্রকল্পটি কোন বিবেচনায় তৈরি তাও বোধগম্য নয়। শালবন সাফসুতরো করে চাষ হচ্ছে কলা আর আনারসের। সর্বত্রই গাছ কাটার হিড়িক যেন।

বনবিভাগের কর্ণধার কারা? বনমন্ত্রী, বন সচিব। বন সম্পর্কে কি তাদের কোনো মৌলিক ধারণা আছে? সব কিছুই মুখস্তবিদ্যা। যিনি উদ্ভিদ কিংবা বন সম্পর্কে কিছুই জানেন না তিনি বনমন্ত্রী, বন সচিব। কাজেই তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে বনবিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের ওপর। মন্ত্রী-সচিব বদলালেও তারা স্থায়ী আসনে অনড়। একেবারে দুর্নীতির পাকাপোক্ত ব্যবস্থা। তাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে সমাজের অপরাপর অসাধু লোকদের। ফলে বন উজাড় নিয়ে অসংখ্য মামলা থাকলেও ‘বনভোজিরা’ সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২০০৭ সালে দৈনিক প্রথম আলোয় ‘সুন্দরবনকে রক্ষায় দুর্নীতি হ্রাস ও সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে বাওয়ালিরাও বনকর্তাদের হয়রানির হাত থেকে রেহাই পায় না, মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েই তাদের কাজ করতে হয়।

 

সারাদেশে প্রাকৃতিক বন কেটে নতুন করে ‘বনায়নের’ অপচেষ্টা চলছে। বনবিভাগের লোক দেখানো ও অর্থ-আত্মসাতের উৎস হিসেবে চিহ্নিত এসব প্রকল্পে ‘বনায়ন’ শিরোনামের সাইনবোর্ড শোভা পায়। এখানেই ঘোর আপত্তি। গাছ লাগানো আর বন তৈরি কি এক কথা? মানুষের পক্ষে কি প্রাকৃতিক বন বানানো সম্ভব? হাজার হাজার বছরের সম্মিলিত প্রয়াসে তৈরি হওয়া এসব বনের নিবিড়তা কি দু-একদিন গাছ লাগিয়েই ফিরিয়ে আনা সম্ভব? তাহলে বন বিভাগ কিসের বন বানাচ্ছে? তাই বনায়ন কথাটি ব্যবহার না করে বৃক্ষায়ন কথাটি ব্যবহার যথার্থ। আবার বৃক্ষরোপণ নিয়েও আছে নানান অভিযোগ। প্রথমত চারা নির্বাচনে দেশি প্রজাতি বাদ দিয়ে বিদেশি প্রজাতির অগ্রাধিকার। তারপর অপ-পরিকল্পনা। কোন গাছটি কোথায় লাগানো উচিত বা সঠিক পরিচর্যা কি হওয়া উচিত সাধারণ মানুষকে এসব বিষয়ে কোনো ধারণাই দেওয়া হয় না। ফলে প্রতি বছর লাগানো লক্ষ লক্ষ চারা দুএক মাসের ব্যবধানেই হারিয়ে যায়। সেই পুরনো কৌতুকটি বলে নিই। সরকারি অফিসের জনৈক পিয়ন কর্তাব্যক্তির কাছে জানতে চাইল, এ বছর গাছগুলো কোথায় লাগানো হবে? কর্তাব্যক্তি নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, কেন ভুলে গেছ? গত বছর যেখানে যেখানে লাগানো হয়েছিল, এবারও একই স্থানে লাগাও! দেশজুড়ে এ হচ্ছে বৃক্ষরোপণের বাস্তব চিত্র। গাছ লাগানোর পর সে গাছের আর পরিচর্যা হয় না। ফলে প্রতি বছর বৃক্ষরোপণের নামে বরাদ্দকৃত লাখ লাখ টাকা কোনো কাজে আসে না।

আসলে বনভূমি রক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন ও সর্বস্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও অন্যদের একাজে নিরুৎসাহিত করবে। সরকারের পরিবেশ বিভাগের কাজের স্বচ্ছতা থাকতে হবে। সাইনবোর্ড সর্বস্ব পরিবেশ সংগঠন ও ভুয়া লোকজনদের পরিবর্তে অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য সংগঠনগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। নগর-নিসর্গ রচনায় বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের সম্পৃক্ত করতে হবে, যা কখনই করা হয়নি। তা না হলে পরিবেশ বিপর্যয় এড়ানো অসম্ভব হবে। আর আমাদের আর্তনাদ ভাবনার অতলে মাথা ঠুকে মরবে।

এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও কেউ কেউ মনে করেন উদ্ভিদ নিয়ে এত হইচই কেন! আমরা যখন এসব নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে যাই তখন অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই। অথচ দু’জন বিদেশির কথা ভাবুন। একজন এখন আর বেঁচে নেই। তিনি লন্ডনের কিউ উদ্যানের কর্মী রবার্ট লুইস প্রাউডলক। ১৯০৮ সালে প্রথম ঢাকা শহরে পরিকল্পিত নিসর্গশোভা নির্মাণের জন্য ব্যাপক কাজ করেন। তাঁর কাজটি তখন সমগ্র রমনা এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আরেকজন এখনো বেঁচে আছেন। তিনি নটর ডেম কলেজের শিক্ষক, ফাদার বেনাস। সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছি, এই ভিনভাষী মানুষটি যখন তার ব্যক্তিগত ব্রিফকেস থেকে অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার ‘শ্যামলী নিসর্গ’ বইটি বের করলেন। দু’জনই আমাদের গাছপালাকে অকৃত্রিমভাবে ভালোবেসেছেন। অথচ আমরা নিজেরাই আমাদের উদ্ভিদগুলো ভালোবাসি না।

আমাদের ভোগবাদী স্বভাবটাও রীতিমতো দুঃখজনক। বাড়িতে যদি দুটি ফলগাছ, দুটি কাঠগাছ ও দুটি ফুল গাছ থাকে, তাহলে ফলগাছই সবচেয়ে বেশি যতœ পায়। কারণ তার সঙ্গে সরাসরি ভোগ করার বিষয়টি জড়িত; কিন্তু গুরুত্বের দিক থেকে আমাদের কাছে সব গাছই সমান হওয়া উচিত। বাড়ির যে গাছটি থেকে সুস্বাদু কোনো ফল পাওয়া গেল না তার কিন্তু অন্য গুণাবলিও থাকতে পারে। ফলে সব গাছের প্রতিই সমান দৃষ্টি রাখতে হবে। বরং না রাখাটাই এক ধরনের স্বার্থপরতা। আমরা অনেকেই জানি, দেশে প্রাকৃতিক ভারসাম্যতার জন্য প্রয়োজনীয় বনভূমি আমাদের নেই। ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে আমাদের বন। সমস্ত প্রাকৃতিক নিয়মগুলো মূল সূত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নদীগুলো শুকিয়ে গেছে, পাহাড়গুলো ন্যাড়া হয়ে পড়েছে। এসব কারণে ক্রমেই উষ্ণতার পরিমাণ বাড়ছে। অতিরিক্ত গরমে ছড়িয়ে পড়ছে নানান রোগ-ব্যাধি।

শীতপ্রধান অঞ্চলে একদানা শস্য ফলাতে হলেও অসাধ্য সাধন করতে হয়। অপেক্ষায় থাকতে হয় গ্রীষ্মের। তারা একেকটি বাগান রক্ষণাবেক্ষণে যে অর্থ ব্যয় করে আমরা কয়েক একর ফসলি জমি আবাদ করতেও তা ব্যয় করি না। গ্রীষ্ম ব্যতীত সমগ্র ইউরোপ ও আমেরিকার অধিকাংশ অঞ্চলই নিষ্প্রাণ থাকে। সে তুলনায় আমাদের শস্য ফলানোর পদ্ধতি অনেক সহজ ও কম খরচের। তাছাড়া আমাদের প্রকৃতিও সারাবছর প্রাণবন্ত থাকে। প্রাকৃতিকভাবে আমাদের এত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আমরা তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের মাঠের নায়ক চাষিরা এখনো ‘গণি মিয়াদের’ উত্তরসূরি। এখনো সেই প্রাচীন পদ্ধতিতে শস্য ফলায়। মাটিতে বীজ বুনে এসে তারা বাকিটুকু ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেয়। বাংলার উর্বর পলিমাটি তাদের অধিকাংশ সময়ই নিরাশ করে না। আমাদের জনসংখ্যা যদি এত বিপুল না হতো তাহলে তাতেই আমাদের দু’বেলার অন্ন হয়ে যেত। আরেকটি বিষয় হলো-আমাদের ভবিষ্যৎ ভাবনাটা খুবই ছোট আকারের। এ কারণে প্রতি বছর রাস্তার ধারে যে গাছ লাগানো হয় পরের বছর উন্নয়নের নামে সেগুলো আবার কাটা হয়। অথচ পরিকল্পনা হওয়া উচিত আগামী একশ বা ততধিক বছর নিয়ে। পরিকল্পনা করলেই যে তাৎক্ষণিকভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে এমনও নয়। বাস্তবায়নটা ধীরে ধীরে হলে ক্ষতি কী। যে কোনো পরিকল্পনাই বেশ বড় করে করতে হয়। তাতে অনেক সুফল পাওয়া যায়।

আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ভবিষ্যতের প্রশ্নে আমরা অতীত ও বর্তমানকে কাজে লাগাতে পারিনি। বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের যে অপার সম্ভাবনা তার প্রতিও আমরা কোনো সুবিচার করিনি। ইতিহাসের স্বর্ণযুগে অন্তত একশ বছর আগেও আমরা প্রকৃতির যে বর্ণাঢ্য রূপ প্রত্যক্ষ করি তার কোনো কিছুই আজ আর আমাদের জন্য অবশিষ্ট নেই।

Sharing is caring!