• ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, রাত ১১:৩১
  • রেজিস্ট্রেশন ৪৬১

বাস্তবে জীবিত থাকলেও কাগজে মৃত

বার্তাকন্ঠ
প্রকাশিত আগস্ট ২৩, ২০২১, ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ
বাস্তবে জীবিত থাকলেও কাগজে মৃত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ।।

কাগজে তারা সবাই মৃত। তবে বাস্তবজগতে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন সবাই। তবে বাস্তবে জীবিত থাকলেও জমির মালিকানা হারিয়েছেন। এছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্রেও মারাত্মক বিপদের মুখে পড়েছেন তারা। এখন দরজায় দরজায় ঘুরছেন হাজার হাজার মানুষ। ভারতের এমন ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।

আপনি যদি মারা যান, তাহলে আর জমির মালিক থাকতে পারেন না। আর ঠিক এই কারণেই ভারতে অনেক জীবিত মানুষকে মৃত হিসেবে নিবন্ধিত করে তাদের সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়ার এসব ঘটনা ঘটছে। এরকম জালিয়াতির ঘটনা ফাঁস হওয়ার পরও এ নিয়ে ভুক্তভোগীরা কিছুই করতে পারছেন না।

পাডেসার ইয়াদব রীতিমত জীবিত এবং ভালোই আছেন। কিন্তু যখন তিনি আবিস্কার করলেন যে কাগজে-কলমে তিনি আসলে মৃত- তখন বেশ অবাক হলেন। তার বয়স এখন ৭০ এর কোঠার শেষের দিকে। হঠাৎ করে তার মেয়ে এবং মেয়ের জামাই মারা গিয়েছিলেন।

তখন দুই নাতি-নাতনিকে দেখাশোনার দায়িত্ব পড়লো তার কাঁধে। তাদের লালন-পালন আর পড়াশোনার খরচ জোগাতে তিনি বাধ্য হয়ে নিজের গ্রামে কিছু জমি বিক্রি করলেন। এই জমি তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন তার বাবার কাছ থেকে। কিন্তু কয়েক মাস পর তিনি একটা অদ্ভূত ফোন কল পেলেন।

তিনি বলেন, ‘যে লোকটির কাছে আমি জমি বিক্রি করেছিলাম, সে আমাকে ফোন করে বললো, আমার বিরুদ্ধে নাকি একটা মামলা আছে। আমার ভাতিজা নাকি সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে আমি মারা গেছি এবং এক ব্যক্তি আমার ছদ্মপরিচয়ে প্রতারণা করে এই জমি বিক্রি করেছে।’

পাডেসার ইয়াদব থাকেন কলকাতায়। তিনি সাথে সাথে উত্তর প্রদেশের আজমগড়ে তার গ্রামের দিকে রওনা দিলেন। গ্রামের লোক যখন তাকে দেখলেন, তারা রীতিমত চমকে উঠলেন। ইয়াদব বলেন, ‘ওরা এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো, যেন ওরা ভূত দেখছে। ওরা বললো, আপনি তো মারা গেছেন! আপনার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পর্যন্ত হয়ে গেছে!’

পাডেসার ইয়াদব জানান, ভাতিজার সঙ্গে তার বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। যখনই তার ভাতিজা শহরে আসতেন, তার সঙ্গে দেখা করতেন। কিন্তু তিনি যখন একদিন ভাতিজাকে জানালেন যে তিনি জমি বিক্রির পরিকল্পনা করছেন, তারপর তার আসা-যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।

পাডেসার এখন জানতে পারছেন যে তার ভাতিজা আসলে উত্তরাধিকার সূত্রে তার জমি দাবি করছে। কাজেই পাডেসার তার মুখোমুখি হলেন। পাডেসার বলেন, ‘ও বলছিল, এই লোকটাকে তো আমি জীবনে কখনো দেখিনি। আমার চাচা তো অনেক আগে মারা গেছে। ভাতিজার কথা শুনে আমি তো রীতিমত স্তম্ভিত। আমি ওকে বললাম, আমি তো তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। আমি জীবিত। কেন তুমি আমাকে চিনতে পারছো না?’

পাডেসার জানান, এরপর তিনি কয়েকদিন ধরে কান্নাকাটি করছিলেন। তারপর একদিন তিনি মন শক্ত করলেন এবং ‘এসোসিয়েশন ফর দ্য লিভিং ডেড ইন ইন্ডিয়া’ (জীবিত মৃত মানুষদের সমিতি) বলে একটি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।

এই সংগঠনটি চালান লালবিহারি মৃতাক, তার বয়স এখন ষাটের বেশি। জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণার পরিণাম কী, সেটা তিনি ভালোভাবেই জানেন। তার নিজের জীবনের এক তৃতীয়াংশ সময় তিনি আসলে ‘মৃত’ হিসেবেই কাটিয়েছেন।

লালবিহারি খুবই দরিদ্র এক পরিবার থেকে এসেছেন। তিনি কখনোই লেখাপড়ার সুযোগ পাননি, কারণ তাকে সাত বছর বয়সেই একটি শাড়ির কারখানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল কাজ করতে। এরপর তার বয়স যখন ২০ পেরিয়েছে, তখন তিনি তার পাশের শহরে একটি কাপড়ের কারখানা খুললেন। তখন ব্যাংক থেকে কিছু ঋণ করার দরকার পড়লো। ঋণ দেয়ার জন্য ব্যাংক জামানত হিসেবে কিছু চাইছিল। নিজের পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে লালবিহারি কিছু জমি পেয়েছিলেন। এই জমির দলিল পেতে তখন তিন আজমগড় জেলায় তার নিজের গ্রাম খলিলাবাদের সরকারি অফিসে গেলেন।

অফিসের হিসাবরক্ষক তার নাম দিয়ে জমির দলিল খুঁজে পেলেন, কিন্তু সাথে ছিল একটি ‘ডেথ সার্টিফিকেট’, যাতে লেখা, লালবিহারি মারা গেছেন। লালবিহারি যতই প্রতিবাদ জানিয়ে বলছিলেন যে, তিনি ‘মৃত’ হতে পারেন না, কারণ তিনি তো জীবিত অবস্থাতেই সামনে দাঁড়িয়ে আছেন- তাতে কোন ফল হচ্ছিল না। সরকারি অফিসের লোকটি তাকে সোজা বলেন, ‘এখানে তো কালো অক্ষরে পরিস্কার লেখা যে আপনি মারা গেছেন’।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে যখন লালবিহারিকে মৃত বলে নিবন্ধিত করা হয়, তখন পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে তার পাওয়া জমির মালিকানা চলে যায় তার চাচার পরিবারের কাছে। লালবিহারি জানান, আজ পর্যন্ত তিনি নিশ্চিত হতে পারেননি, এটা কি একটা দাফতরিক ভুল ছিল নাকি তার চাচার দিক থেকে কোন জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছিল।

ঘটনা যেটাই হোক, লালবিহারির সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। তার কারখানাটি বন্ধ করে দিতে হয়েছিল, নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল তার পরিবার। কিন্তু লালবিহারি তার কথিত ‘মৃত্যু’ কোন লড়াই ছাড়া মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। তিনি এ নিয়ে লড়াই করতে গিয়ে দেখলেন, তার মতো ভারত জুড়ে আরও বহু মানুষ একই ধরনের ঘটনার শিকার হচ্ছেন, জমি আত্মসাতের জন্য আত্মীয়-স্বজনরা জালিয়াতি করে তাদের ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করছে।

এরকম ভুক্তভোগীদের সংগঠিত করতে লালবিহারি ‘দ্য এসোসিয়েশন ফর দ্য লিভিং ডেড’ নামের সংগঠন গড়ে তোলেন।তাদের সংগঠনের হিসেবে কেবল উত্তর প্রদেশ রাজ্যেই এরকম জীবিত ‘মৃত’ মানুষের সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি। এদের বেশিরভাগই খুব গরীব, নিরক্ষর এবং সমাজের নীচের জাতের মানুষ। এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে তাদের সংগঠন আন্দোলন শুরু করলো।

লালবিহারি তার নামের শেষে মৃতাক যুক্ত করলেন- যার মানে প্রয়াত। লালবিহারির নাম হয়ে গেল প্রয়াত লালবিহারি। তিনি গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রতিবাদ কর্মসূচীর আয়োজন করতে লাগলেন। কিন্তু তারপরও অবস্থার কোন বদল হচ্ছিল না।

এরপর লালবিহারি জাতীয় নির্বাচনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন এবং ব্যালট পেপারে একজন মৃত ব্যক্তির নাম ঢোকাতে সক্ষম হলেন। কিন্তু এরপরও যখন তিনি কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে পারলেন না যে তিনি আসলে জীবিত, তিনি তিন তিনবার আমরণ অনশন করে নিজেকে প্রায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেন।

এরপর তিনি এ ঘটনার শেষ দেখার জন্য মরিয়া হয়ে আইন ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি তার চাচার সন্তানকে অপহরণ করলেন। তিনি আশা করছিলেন যে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করবে এবং এর মাধ্যমে স্বীকার করে নেবে যে তিনি আসলে জীবিত। কারণ কোন মৃত মানুষকে তো আসলে গ্রেফতার করা যায় না। কিন্তু পুলিশ বুঝতে পেরেছিল লালবিহারির আসল উদ্দেশ্য কি, কাজেই তারা এ ঘটনায় নিজেদের জড়ালো না।

লালবিহারি শেষ পর্যন্ত বিচার পেয়েছিলেন, তবে তিনি যেসব অভিনব উপায়ে চেষ্টা চালাচ্ছিলেন সেভাবে নয়। যে সরকারি ব্যবস্থার ফাঁদে পড়ে তার জীবনে উলটপালট ঘটে গিয়েছিল, তারাই ব্যবস্থা নিল। একজন নতুন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তার অভিযোগটি নতুন করে খতিয়ে দেখলেন এবং দীর্ঘ ১৮ বছর পর তাকে জানানো হলো, তিনি মৃত নন, জীবিত।

লালবিহারি জানান, তার সংগঠনের মাধ্যমে তিনি ভারত জুড়ে হাজারো মানুষকে সাহায্য করেছেন, যারা তার মতো একই ধরনের দুর্ভোগের শিকার হয়েছিল।

এদের অনেকে অবশ্য তার মতো এত সৌভাগ্যবান ছিল না। অনেকে বছরের পর বছর চেষ্টা করেও কোন প্রতিকার পাননি, শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে আত্মহত্যা করেছেন। আবার অনেকের মামলার সুরাহা হওয়ার আগেই তারা মারা গিয়েছেন।

তিলক চান্দ ঢাকাদ নামের এক ব্যক্তি মাত্রই একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছেন। মধ্যপ্রদেশের ৭০ বছর বয়সী এই লোক যখন তার নিজের কৃষিজমি দেখতে যান, তখন তাকে বেড়ার বাইরে থেকে তাকিয়ে থাকতে হয়। অথচ এই জমিতেই তিনি বেড়ে উঠেছেন। তিলক চান্দের অনেক ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যা আছে। তিনি জানেন, এই জমি যতদিনে তিনি আবার ফিরে পাবেন, ততদিন তিনি হয়তো আর বাঁচবেন না।

তিলক চান্দ যখন তরুণ ছিলেন, তখন আয়-উপার্জনের জন্য শহরে পাড়ি জমিয়েছিলেন। নিজের জমি তখন তিনি বর্গা দিয়েছিলেন এক দম্পতিকে। কিন্তু কিছু দলিলে সই করতে যখন তিনি গ্রামে ফিরে যান, তখন তিনি আবিস্কার করেন যে এই জমির মালিকানা আর তার কাছে নেই, কারণ তিনি নাকি মারা গেছেন।

এরকম জীবিত মৃতদের পক্ষে কিছু মামলা লড়েছেন অনিল কুমার নামের এক আইনজীবী। তার অনুমান, উত্তরপ্রদেশের আজমগড়, লালবিহারি যেখানকার বাসিন্দা, সেখানে হয়তো অন্তত এরকম শ’খানেক মানুষ আছেন, যাদেরকে জীবিত অবস্থাতেই মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

তিনি জানান, প্রতিটি কেসই বেশ জটিল। অনেক সময় হয়তো দাফতরিক ভুলের কারণে এটা হয়েছে, অনেক সময় হয়তো সরকারি কর্মচারীদের ঘুষ দিয়ে কারও নামে ডেথ সার্টিফিকেট জারি করা হয়েছে।

অনিল কুমার জানান, এসব মামলা যেহেতু জালিয়াতির ফল, তাই ন্যায়বিচার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তিনি একটি মামলা লড়েছিলেন, যেখানে তার মক্কেল যে জীবিত এটা প্রমাণ করতে প্রায় ছয় বছর সময় লেগেছিল। আর যে লোকটি জালিয়াতির মাধ্যমে তার মক্কেলকে মৃত ঘোষণা করেছিল, তার বিরুদ্ধে মামলার রায় ২৫ বছর পর এখনো হয়নি, তারা এখনো বিচার পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন।

অনিল কুমার বলেন, ‘এসব মামলার বিচার যদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত করা হতো, যাতে অপরাধীরা সাজা পায়, তাহলে যেসব লোক এধরণের অপরাধে জড়িত, তারা হয়তো ভয় পেত।’

লালবিহারি মৃতাককে মৃত ঘোষণার পর ৪৫ বছর পেরিয়ে গেছে। তিনি যে জীবিত, সেটি প্রমাণ করার পর পেরিয়ে গেছে আরও দুটি দশক। কিন্তু তারপরও তিনি প্রতি বছর তার ‘পুর্নজন্ম দিবস’ পালন করেন। জন্মদিনের কেকের চারপাশে জড়ো হন তার অতিথিরা। কিন্তু যখন কেক কাটার জন্য তিনি ছুরি চালান, তখন অতিথিরা বুঝতে পারেন, এটি আসলে সত্যিকারের কেক নয়, কেকের মতো দেখতে একটি কার্ডবোর্ডের খোল।

তিনি বলেন, ‘এই কেকের ভেতরটা আসলে একদম ফাঁপা, আমাদের কিছু সরকারি কর্মকর্তার মতো, যারা ফাঁপা বুলি ছাড়ে, যাদের কাছে ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না। আমি উদযাপন করার জন্য এই কেক কাটি না। আমরা যে সমাজে বাস করি, তার অবস্থা তুলে ধরার জন্যই আমি এটা করি।’

লালবিহারি জানান, দেশের নানা প্রান্ত থেকে এখনো বহু মানুষ তাকে ফোন করেন, তার কাছে পরামর্শ চান, কীভাবে তারা নিজেদের জীবিত বলে প্রমাণ করতে পারেন। কিন্তু ৬৬ বছর বয়সে এসে লালবিহারি যেন কিছুটা ক্লান্ত। এখন তিনি এই লড়াই থেকে অবসর নেয়ার কথা ভাবেন।

Sharing is caring!