• ২৩শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, বিকাল ৪:২৬
  • রেজিস্ট্রেশন ৪৬১

বিপর্যয়ের মুখে ব্যক্তি মালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, কী হবে –

বার্তাকন্ঠ
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১, ১৫:৩৮ অপরাহ্ণ
বিপর্যয়ের মুখে ব্যক্তি মালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, কী হবে –

ডেস্ক রিপোর্ট।। 

অবশেষে দেড় বছরের বেশি সময় পর শ্রেণিকক্ষে ফিরল শিক্ষার্থীরা। দিনের হিসাবে ৫৪৪ দিন পর। স্কুলে ফিরেই নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শুরু হয়েছে বোর্ড পরীক্ষার চিন্তা। কারণ দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল গত ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিলে। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় তাদের পরীক্ষার সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে।

এ দিকে ভর্তির পর একদিনও ক্লাস না করা নবম ও একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময় কাছাকাছি চলে এসেছে। এদিকে গ্রামের প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় পড়াশোনার ক্ষতি পূরণে দুশ্চিন্তায় পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত হলেও এক হাজারের মতো কিন্ডারগার্টেন ও স্কুল খুলছে না। স্কুলের শিক্ষকরা বলছেন, মূলত আর্থিক অসচ্ছলতা, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী সংকটের কারণেই স্কুলগুলো বন্ধ রাখতে তারা বাধ্য হচ্ছেন। গ্রামের সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফিরে আনাও অনেক চ্যালেঞ্জ। কারণ দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় এসব শিক্ষার্থীর অনেকে নানা কাজে যুক্ত হয়ে গেছে।

সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন ব্যক্তি মালিকানাধীন এসব স্কুল নিয়ে এখনো তাদের কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের স্কুলে আনতে সরকার নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

দীর্ঘ ৫৪৪ দিন পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষকদের আনন্দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিতে দেখা গেছে। রাজধানীর কয়েকটি স্কুলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। শিক্ষার্থীরা জানায়, দীর্ঘদিনের ব্যবধানে স্কুলে আসার পর হয়েছে প্রথম স্কুলে আসার দিনে যে রকম অনুভূতি হয়েছিল, সে রকম অনুভূতি হচ্ছে। অনেকদিন পর সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা হওয়ায় বেশ আনন্দ লাগছে।

ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আমিন আল ফাতেহ বলেন, অনেক দিন পর স্কুলে আসায় বেশ আনন্দ হচ্ছে। স্কুলে প্রথম আসার মতো আনন্দ পাচ্ছি। তবে এখন ফাইনাল পরীক্ষার চিন্তা হচ্ছে। কারণ স্কুল না খুললে অটোপাস দেওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এখন স্কুল খুলেছে তাই পরীক্ষা হবে; কিন্তু এত অল্প সময়ে কীভাবে এত পড়াশোনা করব।

একই স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম বলেন, নবম শ্রেণিতে ওঠার পর ১২ সেপ্টেম্বর প্রথম ক্লাস করেছি। অনেকদিন পর শিক্ষক-সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা হলো। আমি খুবই আনন্দিত। স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষকরা আমাদের বরণ করে নিয়েছেন। ক্লাস না করেও শিগগির এসএসসি পরীক্ষা দিতে হবে। অথচ স্কুল খুললেও নিয়মিত ক্লাস হবে না। তাই ভালো ফলাফল নিয়ে তার অনেক চিন্তা। এর মধ্যে আবার নিয়মিত ক্লাস হবে না।

ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সেলিনা আক্তার বলেন, আমরা মাউশির ১৯ দফা নির্দেশনা পালন করছি। আবারও যাতে করোনার সংক্রমণ বেড়ে না যায় কিংবা কোনো শিক্ষার্থী বিপদের মুখে না পড়ে, সেদিকে আমরা সর্বাত্মক খেয়াল রাখব। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতিপূরণের জন্য অনলাইনেও ক্লাস নেওয়া হবে। পরীক্ষার সার্বিক প্রস্তুতির জন্য চেষ্টা করছি আমরা।

এ দিকে সরকারের নির্দেশনা মেনে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা থাকলেও যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলেনি তার একটি চট্টগ্রামের ভিশন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল।

স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন বলেন, ২১ শিক্ষক এবং সাড়ে ৪০০ শিক্ষার্থী নিয়ে তাদের স্কুল চলছিল। তবে চরম প্রতিকূল অবস্থায় পড়ে তাকে বাধ্য হতে হয়েছে স্কুলটি বন্ধ করে দিতে হয়। গত বছর রোজার পর আমরা সরকারের নির্দেশ মতো অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করেছিলাম; কিন্তু শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পায়নি। ঘর ভাড়া, গ্যাস ও কারেন্ট বিল, শিক্ষক, কর্মচারীদের বেতন- এসব কুলিয়ে উঠতে না পাড়ার কারণে ২০২১ সালে এসে আমরা স্কুলটা বন্ধ করতে বাধ্য হলাম।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল এবং কলেজ ঐক্য পরিষদ দাবি করছে সারা দেশে প্রায় ৬০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুল ছিল। সেখানে প্রায় ১০ লাখ শিক্ষক প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থীকে পাঠদান করে আসছিল; কিন্তু এই করোনাভাইরাসের প্রকোপে স্কুল যেমন বন্ধ হয়েছে, তেমনি নতুন করে স্কুল খুলতে শিক্ষকদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে নানা চ্যালেঞ্জ।

ঢাকার পপুলার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষক আমেনা বেগম তামান্না বলেন, স্বল্পসংখ্যাক শিক্ষক নিয়ে শুরু করলেও এখন স্কুলে শিশুদের ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ। স্কুলের ৫০ থেকে ৬০ ভাগ স্টুডেন্ট বিভিন্ন কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেছে। আমি নিজে ৩০টি পরিবারে গিয়েছি স্কুলে আসার জন্য তাদের অভিভাবকদের রাজি করাতে; কিন্তু তারা নিম্নবিত্ত পরিবারের। ফলে কাজ থেকে তারা আর স্কুলে ফিরবে না। এখন শিক্ষার্থী যদি না আসে তাহলে আমি স্কুল চালাবো কীভাবে!

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল এবং কলেজ ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, করোনার কারণে ১০ হাজারের মতো স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশে সব কিন্ডারগার্টেন ব্যক্তিমালিকানাধীন। তাদের খরচ চলে মূলত শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি দিয়ে। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় এখন অনেক স্কুলের শিক্ষক অন্য পেশা গ্রহণ করেছেন। অনেক স্কুলে পাঠদান করানোর মতো শিক্ষক এখন আর নেই। তিনি আরও বলেন, যেসব স্কুল এখনো চালু আছে তাদের ঘুরে দাঁড়াতে হলে সরকারি সহযোগিতা দরকার; কিন্তু আমরা সরকারের বিভিন্ন স্তরে ঘুরে কোন আশ্বাস পাইনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা এবং গবেষণা ইনস্টিউটের অধ্যাপক কাজী আফরোজ জাহান আরা বলেন, এই মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফিরিয়ে আনা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই। অভিভাবকদের এমনভাবে বোঝাতে হবে যে, তাদের শিশুরা কাজ করে সাময়িকভাবে হয়তো টাকা পাচ্ছে; কিন্তু সেটা ভবিষ্যতে তাদের পরিবার এবং সমাজের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। ঝরেপড়া এসব শিশুরা স্কুলে ফিরে আসলে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোকে চালানো যাবে।

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, শিক্ষার্থীদের স্কুলের বেতন পরিশোধে অভিভাবকদের যেন চাপ দেওয়া না হয় স্কুল-কলেজগুলোকে সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। করোনার এ সময়ে অনেকের অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। এইকসঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, স্কুল খোলা হয়েছে। এখন পরীক্ষা কীভাবে নেওয়া হবে সে সবকিছু নিয়েই আমাদের চিন্তা-ভাবনা রয়েছে।

Sharing is caring!