• ২৬শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১০ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, দুপুর ১২:২০
  • রেজিস্ট্রেশন ৪৬১

বেনাপোল-যশোর-খুলনা ট্রেনটি চোরাকারবারীদের নিরাপদ রুট

bmahedi
প্রকাশিত জুলাই ২১, ২০১৯, ১৯:৪১ অপরাহ্ণ
বেনাপোল-যশোর-খুলনা ট্রেনটি চোরাকারবারীদের নিরাপদ রুট
মো: আব্দুল লতিফ ।। 
বেনাপোল – যশোর – খুলনা রুটে চলাচলকারী কমিউটার ট্রেনটি চোরাকারবারীদের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। আর এসব চোরাকারবারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সহযোগিতা করছে ট্রেনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, জিআরপি পুলিশ, বেনাপোল রেলওয়ে পুলিশ ও স্টেশন মাষ্টার। এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চোরাকারবারীদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘ দিন ধরে।
তবে ট্রেনের কর্তৃপক্ষ জিআরপি পুলিশ, বেনাপোল রেলওয়ে পুলিশ ও স্টেশন মাষ্টার ও থানা পুলিশ বরাবরের মত চোরাকারবারীদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
এই রুট দিয়ে নিরাপদে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে ভারতীয় হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা, কসমেটিকস, ইমিটেশন গহনা, মসলাজাত দ্রব্য, আতসবাজি, বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ মারাত্মক অস্ত্র। চোরাকারবারী এসব পণ্য আসার প্রধান স্থানগুলো হলো বেনাপোলের দৌলতপুর, গাতিপাড়া, বড়আঁচড়া, তেরঘর, সাদিপুর, পুটখালী, গোগা, ভুলোট, কায়বা, রুদ্রপুর, ধান্যখোলা, ঘিবা, কাশিপুর ও শালকোনা সীমান্ত। সীমান্তে চোরাচালান প্রতিহত করতে দায়িত্বে রয়েছে বিজিবি তারপরেও তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলছে অবাধে এসব ব্যবসা।
বেনাপোল থেকে খুলনা পর্যন্ত দিনে একবার যাতায়াত করতো কমিউটারটি ট্রেনটি। তবে যাত্রীদের দাবির ফলে বছর খানেক আগে একই ট্রেনটি প্রথমে সকাল ৯টায় বেনাপোল থেকে যাত্রী যশোরে নামিয়ে দিয়ে বেনাপোলে ফিরে আসতো। একই ট্রেন বেনাপোল থেকে বিকাল ৫টায় যাত্রী নিয়ে খুলনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। তবে সেই ট্রেনটিতে যাত্রীদের কোন সুফল বয়ে আনতে পারেনি এখনো পর্যন্ত।
পক্ষান্তরে চোরাকারবারীদের পাচারকারী বাহান হিসেবে বহুলাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ট্রেনটি সাধারণ যাত্রী উঠলে চোরাকারবারীদের দ্বারা বিভিন্ন ভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছে। ট্রেনের বাথরুম থেকে সিটের নিচে, উপরে মালামাল থাকে। এমনকি ট্রেনের সিলিং কেটেও তার মধ্যে মালামাল লুকিয়ে রাখে চোরাকারবারীরা। তবে সব দেখেও যেন না দেখার ভান করেন ট্রেনে থাকা জিআরপি পুলিশ।
আরও পড়ুন : সীমান্ত থেকে ফেন্সিডিলসহ আটক ১
এ রুটের যাত্রীরা যশোর-খুলনায় যেতে বাসের চেয়ে ট্রেনের ভাড়া অনেক কম এবং আনন্দদায়ক বলে ট্রেনে যেতেই বেশি পছন্দ করে থাকেন। কিন্তু একবার যদি কোনো সাধারণ যাত্রী এ ট্রেনে উঠেন তা হলে তিনি আর দ্বিতীয় বার চোরাচালানীদের দ্বারা হেনাস্ত হওয়ার ভয়ে ট্রেনটিতে উঠতে চাই না। ট্রেনের অধিকাংশ আসনগুলো চোরাকারবারীরা দখল করে মালামাল পাচার করে থাকে। অথচ সাধারণ যাত্রীরা টিকিট কেটে ট্রেনে উঠে গাদাগাধি করে বসে থাকতে হয়।
কোন যাত্রী ভাগ্যক্রমে আসন্ন পেলেও ট্রেন ছাড়ার পর পরই শুরু হয় চলন্ত গাড়িতে চোরাকারবারীদের মালামাল জানালা দিয়ে উঠা-নামানো। কোন যাত্রী প্রতিবাদ করলে তাকে হতে হয় চোরকারবারী দ্বারা লাঞ্ছিত। অথচ এসব চোরাকারবারীরা বেনাপোল থেকে খুলনায় ট্রেনের ৬০ টাকা ভাড়া ১০ থেকে ২০ টাকা দিয়ে যাতায়াত করে থাকে। চোরাকারবারীরা সড়ক পথে বিভিন্ন স্থানে স্থানে  চৌকি এড়াতেই তারা ট্রেনটিকে তাদের নিরাপদ রুট হিসাবে ব্যবহার করছে। সড়ক পথে বেনাপোল চেকপোস্ট সীমান্ত পার হলে ঢাকা-বেনাপোল সড়কের আমড়াখালি নামক স্থানে বিজিবি চেকপোস্ট, বেনাপোল বন্দর থানা, নাভারণ হাইওয়ে ফাঁড়ি, শার্শা থানা, ঝিকরগাছা থানা অতিক্রম করা ঝুঁকিপুর্ণ।
অথচ ট্রেনের চোরাই পণ্য পরিবহন অনেক সহজ লভ্য ও খরচ কম। বেনাপোল স্টেশনে ট্রেনে অবৈধ পণ্য তোলাটাই শুধু সমস্যা। একবার এসব পণ্য ট্রেনে তোলা হলে বেনাপোল থেকে যশোর, খুলনা আর কোথাও বাধা নেই, নেই কোথাও বিজিবি কিম্বা পুলিশ। তাই অধিকাংশ চোরাকারবারীরা বেনাপোলের এ কমিউটার ট্রেনটিকে তাদের পাচারের নিরাপদ বাহন হিসাবে ব্যবহার করছে। ট্রেনের মধ্যে দায়িত্বে নিয়োজিত রেলওয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট হারে টাকা পেয়ে এসব চোরাকারবারী পণ্যকে বৈধ্যতা দিচ্ছে।
আর নির্দিষ্ট থানা পার হতে চোরাকারবারীরা থানার দালালদের দিচ্ছে টুপলা প্রতি ১০০/২০০/৩০০ টাকা করে। অকথ্য ভাষায় চলে চোরকারবারী মহিলাদের গালিগালাজ। যাহা যাত্রীরা শুনে মুখে কাপড় দিয়ে মুখ লুকানোর চেষ্টা করে। এভাবেই চলছে বেনাপোল থেকে খুলনাগামী কমিউটার ট্রেনের যাত্রী সেবা।
ট্রেনে চলাচলকারী যাত্রীরা জানান, বেনাপোল রেলস্টেশন এলাকায় বিজিবির টহল থাকায় সেখান থেকে চোরাকারবারীরা খুব বেশি মালামাল উঠাতে পারে না। তাই চোরাকারবারীরা অনন্ত ১০ কিলোমিটার দুরে রেললাইনের পাশ দিয়ে মালামাল নিয়ে অবস্থান করেন। অনেক সময় চোরাচালানীরা ট্রেনের চেইন টেনে ধরে ট্রেন থামায়। আর এসময়ের মধ্যে চোরকারবারীরা তাদের মালামাল ট্রেনের দরজা-জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে ট্রেনের মধ্যে।
আর ট্রেনের মধ্যে থাকা অপর চোরাকারবারী মালামালগুলো টানা হেচড়া করতে করতে তাদের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যায়। ট্রেন থামার স্থানগুলোর মধ্যে দিঘিরপাড়, কাগজপুকুর, ভবারবেড় পশ্চিম পাড়া, নাভারণ ব্রিজের উপর। তবে বর্তমানে বেনাপোল থেকে নাভারণ পর্যন্ত ট্রেনটিকে বিজিবি স্কট করার কারণে বেনাপোল থেকে মালামাল কম করে উঠায়। নাভারণ স্টেশন থেকে ট্রেনটি ছাড়ার পরে এক কিলোমিটার দুরে নাভারণ ব্রিজের কাছে গেলে ট্রেনের চেইন টেনে ট্রেনটি দাঁড় করানো হয়। এসময়ে দ্রুত গতিতে চোরাকারবারীরা মালামাল উঠিয়ে নেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনাপোল কমিউটারের এক ট্রেন চালক জানান, আমরা ট্রেন রাস্তায় থামাই না। চোরাকারবারীদের এক দল স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠে। এর পর যেখানে যেখানে তাদের মালামাল থাকে সেখানে গিয়ে ট্রেনের হর্সপাইপ খুলে দিয়ে হাওয়া ছেড়ে দেয়। ফলে সেখানে ট্রেন দাঁড়িয়ে গেলে চোরকারবারীরা খুবই দ্রুত মালামাল ট্রেনে উঠিয়ে ন।

Sharing is caring!