• ২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, সন্ধ্যা ৬:৪৬
  • রেজিস্ট্রেশন ৪৬১

মহানায়ক উত্তম কুমার

bmahedi
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৯, ০৭:২২ পূর্বাহ্ণ
মো: মনিরুল আলম মিশর ।। 

১৯২৬ সালের, ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার আহিরীটোলায় সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় এবং চপলা দেবী জন্ম দেন এক পুত্র সন্তান এবং নাম রাখেন হেরম্ব চট্রোপধ্যায়। তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় তিনি। তার এক বোনও ছিলেন। যদিও তার দিদি ছেলেবেলাতেই মারা যান। পিঠাপিঠি হওয়াতে তিমি সারাজীবন বোন না থাকার কষ্টে থেকেছেন। পরে তার নাম রাখা হয় অরুণ কুমার। এই অরুণ কুমার উত্তম কুমার হয়ে আছেন আমাদের হৃদয়ে।

কলকাতার সাউথ সাব-আর্বা‌ন স্কুল থেকে ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পাস করে গোয়েঙ্কা কলেজে ভর্তি হলেও সংসারে আর্থিক অনটনের জন্য গ্র্যাজুয়েশন করা হয়ে ওঠেনি। কলেজে শেষ না করেই তাকে ছুটতে হয় চাকরির সন্ধানে। কলকাতা পোর্টে মাত্র ২৭৫ টাকা বেতনে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। পাড়ার নাট্যসংগঠন ‘লুনার ক্লাব’ এ লুকিয়ে লুকিয়ে নাটক দেখতেন, পরে এর সঙ্গে যুক্ত হন। তার কাকা তাকে তার আগ্রহ দেখে অনুমতি দেন সদস্য হবার। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে ছোট গয়াসুরের ভূমিকায় অভিনয় করে রীতিমত হইচই ফেলে দিয়েছিলেন তিনি।

স্কুল জীবনে রবীন্দ্রনাথের ‘মুকুট’ নাটকে অভিনয় করে তিনি পাকাপাকিভাবে অভিনয়জীবন শুরু করেন। ছোটবেলা থেকেই যাত্রা আর থিয়েটারে প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল তার। সেই থেকে মনে লালিত হতে থাকে রূপালী পর্দায় কাজ করার স্বপ্ন। ১৯৪৭ সালে তার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয় ভোলানাথ আঢ্যের ‘মায়াডোর’ নামক হিন্দি সিনেমার মাধ্যমে। কিন্তু মায়াডোর আলোর মুখ দেখেনি। পরবর্তী বছর ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে খুবই অল্প পারিশ্রমিকে কাজ করেন। ছবিটি সেসময় সফলতার মুখ দেখেনি। এরপর ‘কামনা’, ‘মর্যাদা’, ‘সহযাত্রী’, ‘নষ্টনীড়’, ‘কার পাপে’ এবং ‘সঞ্জীবনী’ ছবিতে ধারাবাহিকভাবে অসফলতার পর মুষড়ে পড়েন উত্তম কুমার।

একদিকে ফ্লপমাস্টার তকমা অন্যদিকে সিনেমার রোজগারে সংসার চালানো দায়। তাই অভিনয়ের পাশাপাশি চাকরি চালিয়ে গেলেন। গৌরি গাঙ্গুলিকে ভালোবেসে বিয়ে করেন ১৯৪৮ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে। ১৯৫০ সালে জন্ম হয় তার একমাত্র পুত্র সন্তান গৌতম চট্টোপাধ্যায়। সেসময় সব ছেড়ে সিনেমায় মন দেবেন বলে মনস্থির করেন।

পাহাড়ী স্যানাল তার নাম বদলে রাখেন উত্তম কুমার। অবশেষে ১৯৫২ সালে ‘বসু পরিবার’ ছবিতে কাজ করে আশাতীত সাফল্য পেলেন তিনি। সেই সাথে বাংলা চলচ্চিত্র পেল এক নতুন নক্ষত্র। শুরু হল নতুন এক অধ্যায়। পরের বছর নায়িকা সুচিত্রা সেন এর সাথে মুক্তি পেল ‘সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩)’, এখান থেকেই ইতিহাস রচনার শুরু।

কিংবদন্তী এই জুটির একসাথে পথ চলা, সাথে নায়ক থেকে মহানায়ক হওয়ার গল্প রচিত হল। ষাটের দশকে উত্তম-সুচিত্রা তাদের অসাধারণ কিছু প্রশংসিত ছবি উপহার দিয়ে দর্শক মাতিয়ে রেখেছিলেন, করেছিলেন বিমোহিত। তাদের অভিনীত ‘চাওয়া-পাওয়া’, ‘হারানো সুর’, ‘পথে হল দেরী’, ‘সপ্তপদী’, ‘বিপাশা’, ‘জীবন তৃষ্ণা’ এবং ‘সাগরিকা’ ছবিগুলোর মনোমুগ্ধকর অভিনয় তাদেরকে ‘রোমান্টিক’ জুটির শীর্ষস্থানে নিয়ে যায়, যা আজও বাঙ্গালির কাছে সমানভাবে জনপ্রিয় ও আকাঙ্ক্ষার বিষয়।

রোমান্টিক ছবির ফাঁকে ফাঁকে কিছু ভিন্ন ধাঁচের ছবিতেও কাজ করেন তিনি। তার প্রেমিকসুলভ আচরণের বাইরে অভিনয়ের দক্ষতা প্রমাণ করেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্ট বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সীর ভূমিকায় ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিটিতে। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবিতে পাড়ার অভিনেতা থেকে অরিন্দমের নায়ক হয়ে ওঠার গল্পে তিনি যেন নিজেরই চরিত্রেই অভিনয় করেছিলেন। ১৯৫৭ সালে তার অভিনীত ‘হারানো সুর’ পেয়েছিল রাষ্ট্রপতির সার্টিফিকেট অফ মেরিট সম্মাননা।

১৯৬৭ সালে ‘চিড়িয়াখানা’ এবং ‘এ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ছবিতে প্রশংসিত অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার পান তিনি। তার অভিনীত ‘দেয়া নেয়া’ ছবিতে হৃদয়হরণ নামক কমেডি চরিত্রে অভিনয় করেও ব্যাপকভাবে প্রশংসা পেয়েছিলেন। তার অভিনীত হিন্দি চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘ছোটিসি মুলাকাত (১৯৬৭)’, ‘দেশপ্রেমী (১৯৮২)’ ও ‘মেরা করম মেরা ধরম (১৯৮৭)’ উল্লেখযোগ্য। স্বল্পায়ু এই মহান অভিনেতা ২১০টিরও অধিক সফল ছবি বাংলার মানুষকে উপহার দিয়ে গেছেন।

কর্মজীবনে সফল এই ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন এতটা কোমলতায় ভরা ছিল না। খ্যাতির সাথে সাথে লোকমুখে রটনাও বাড়তে থাকে উত্তম-সুচিত্রাকে নিয়ে। স্ত্রী গৌরি দেবী তার অভিনয়ে আপত্তি না করলেও তাদের মেলামেশায় আপত্তি জানান, যার ফলে বাড়তে থাকে দূরত্ব। একসময় অভিনয় ছাড়তে বলেন স্ত্রী গৌরি, রক্তে মিশে থাকা অভিনয়ের নেশা ছাড়া সম্ভব হয়নি উত্তম কুমারের পক্ষে। উত্তম-সুপ্রিয়ার ‘শুন বনোরাণী’ সিনেমা ১৯৬০ সালের দিকে সাফল্য পায়। সুপ্রিয়া দেবী তখন বিশ্বজিৎ চৌধুরীর ধর্মপত্নী, একমাত্র কন্যা সোমার জননী। বিয়ের পর সুপ্রিয়াকে বাধ্য করা হয় অভিনয় ছাড়ার জন্য। তিনি বেশ কিছুকাল পর্দার আড়ালেই থাকেন। কিন্তু সুখ তার সংসারেও ধরা দেয়নি। স্বামীর সাথে বিচ্ছেদের পর তিনি আবার রূপালী পর্দায় ফিরে আসেন। তখন থেকে উত্তম কুমারের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। উভয়ের ব্যক্তিজীবনের শূন্যতা থেকে জন্ম নেয় প্রেম। শুরু হয় ভালোবাসা। জন্ম নেয় আরও এক নতুন গল্পের।

১৯৬৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পৈতৃক বাসভবন ছেড়ে উত্তম কুমার চলে আসেন সুপ্রিয়া দেবীর ময়রা রোডের ফ্ল্যাটে। আমৃত্যু একসাথেই থাকেন। গৌরি দেবীর সাথে আইনত বিবাহ বিচ্ছেদ না হওয়ায় রেজিস্ট্রি করতে পারেননি সুপ্রিয়া দেবীকে। কিন্তু সুপ্রিয়া দেবীর ভাষ্যমতে, ১৯৬২ সালের ২রা ডিসেম্বর ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় বিয়ে হয় তাদের। বিয়েতে সুপ্রিয়ার পরিবারসহ উত্তম কুমারের ঘনিষ্ঠ কিছু বন্ধুর সমাগম ঘটেছিল সেদিন। বিয়ের পরও জুটি বেঁধে একাধিক ছবিতে সফলতার সাথে কাজ করেছেন তারা। জীবনের বাকি সময় তিনি সুপ্রিয়া দেবীর সাথেই কাটান। বলা যায় সুখেই কেটেছিল তাদের জীবন।

তিনি কাজ পাগল লোক ছিলেন। কাজই ছিল তার কাছে মুখ্য বিষয়। সেটা তিনি তার নিজের জীবন দিয়েই প্রমাণ দিয়ে গেছেন। মহানায়ক হয়ে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই মৃত্যুবরণ করেন এই নক্ষত্র। ‘ওগো বধু সুন্দরী’ সিনেমাটির কাজ চলছিল তখন। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই শুটিংরত অবস্থায় হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শুটিং স্পটেই মারা যান তিনি।

ভারত সরকার উত্তম কুমারের শ্রদ্ধার্ঘ্যে কলকাতা মেট্রো টালিগঞ্জ অঞ্চলের স্টেশনটির নামকরণ করে ‘মহানায়ক উত্তম কুমার মেট্রো স্টেশন’। তিনি উত্তম কুমার, বাংলার মহানায়ক। যার হাসিতে তিনি বিশ্বকে জয় করতে পারতেন। গতকাল ছিল মহানায়কের ৯৩তম জন্মদিন।

Sharing is caring!