মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় হোসনে আরা লিপি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী

বিথি আক্তার :=

হোসনে আরা লিপি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় সফল হয়েছেন তিনি। তার এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে সংগ্রামের গল্প। যা আত্মপ্রত্যয়ী অনেক নারীর কাছে অনুপ্রেরণাও বটে। তার উপলব্ধি জীবনে সফল হতে হলে আত্মপ্রত্যয় আর কঠোর পরিশ্রমের সমন্বয় দরকার। এটি যে করতে পারবে সেই সফল। হোসনে আরা লিপি পেরেছেন বলেই অনুকরণীয়।
যশোর শহরের দড়াটানা জামে মসজিদ লেনে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আর দশজন পুরুষের পাশাপাশি তিনিও তার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। এই মার্কেটেই তার ছয়টি দোকান ভাড়া দেয়া। শহরের নীলরতন ধর সড়কে বাড়িও কিনেছেন। তার এই সাফল্যে দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে ঘরে-বাইরে।
সংগ্রাম ও সফলতার সম্পর্কে জানতে চাইলে হোসনে আরা খাতুন লিপি বলেন, তার এই সাফল্যের পিছনে সংগ্রামও কম নয়। অনার্স পড়াকালীন ২০০১ সালে যশোরের শাহীনুর রহমানের সাথে বিয়ে হয় তার। যশোর সরকারি সিটি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করে যোগ দেন চাকরিতে। দিনাজপুর নার্সিং ইন্সট্রাক্টর ইনস্টিটিউটে অতিথি প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। আড়াই বছর চাকরি করার পর জন্মদেন প্রথম সন্তান। শুরু হয় প্রতিবন্ধকতা। দিনাজপুরে ছিল না আত্মীয়-পরিজন। স্বামী শাহিনুর রহমান চাকরি করতেন ঢাকার একটি ফার্মেসিতে। ছোট বাচ্চা নিয়ে পরের চাকরি করলে অনেকে বিরক্ত হয়। একার পক্ষে সন্তান সামলে চাকরি করা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ফিরে আসেন যশোরে। শুরু হয় তার আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার প্রচেষ্টা। স্বামী শাহিনুর চাকরির পাশাপাশি স্টেশনারি দোকানের ব্যবসা শুরু করেন। তবে সেই দোকান দেখাশোনা করতেন তার চাচা।
হোসনে আরা লিপি বলেন, ধীরে ধীরে আমার দোকানে যাওয়া শুরু হয়। প্রথম অবস্থায় দোকানে এসে আমি কাগজ গুণে সাজাতাম। পরিবার থেকে অনেকবারই আমাকে থামানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি আমার স্বামীও প্রথম অবস্থায় আমার দোকানে যাওয়াটা মানতে পারেননি। শ্বশুরের উৎসাহে শুরু করি নিয়মিত দোকানে বসা। বাচ্চাটাকেও নিয়ে আসতাম সাথে। প্রতিদিন সংসারের কাজ শেষ করে দুপুরের পর চলে আসতাম। শুরু হয় আশেপাশের দোকানগুলো থেকে বিশ্রি মন্তব্য ছোঁড়া। কিছু মানুষতো বলেছিল ঠোঁটের লিপস্টিক দেখতেই আসে মার্কেটিং-এর লোকেরা। আর মেয়ে দেখতেই আসেন ক্রেতারা। তা সত্ত্বেও আমি হাল ছাড়িনি। প্রায় দশ বছর এখানে আছি। দড়াটানা জামে মনজিদ লেনে এখন আমার ছয়টা দোকান ভাড়া দেয়া। নীলরতন ধর রোডে একটি বাড়িও কিনেছি। পরিবারের সবার দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। বদলেছে আশেপাশের মানুষের চিন্তাও।
নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লিপি বলেন, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে যখন সাইকেল চালাতাম তখন থেকেই শুরু হয় বৈষম্যমূলক আচরণ। কেন মেয়ে হয়ে আমি সাইকেল চালাই সে কৈফিয়ত দিতে হয়েছে বাবাকে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন আমি হ্যান্ডিক্রাফট এর কাজ শিখি। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল স্বাবলম্বী হওয়ার। টিউশন, হ্যান্ডিক্রাফট ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের খরচ নিজে চালানোর চেষ্টা করতাম। পাশাপাশি সঞ্চয় করতাম। ছোট থেকেই নিজের ব্যবসা করার ইচ্ছা ছিল। উদ্যোক্তা হতে গেলে মূলধন থাকা জরুরি। তাই আয়ের উৎস ছোট বা বড় হোক, সঞ্চয় এর বিকল্প নেই। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে এখন বেশ স্বচ্ছন্দেই আছি। এখন স্বামীও আমার সাথে দোকানে বসেন।
হোসনে আরা লিপির জন্ম ১৯৮১ সালে পাবনা শহরে। ১৯৮৮ সালে বাবা-মায়ের সাথেই চলে আসেন যশোরে। বর্তমানে শহরের নীলরতন সড়কের বাড়িতে বসবাস করেন। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি মেজ। ১৯৯৭ সালে আদর্শ বহুমুখী বালিকা বিদ্যালয় যশোর থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর যশোর সরকারি সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি ও সরকারি এমএম কলেজ থেকে স্মাতক ও স্মাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

লেখকের সম্পর্কে

Shahriar Hossain

দীর্ঘ ২৪ বছর পর একই মঞ্চে লতিফ সিদ্দিকী ও কাদের সিদ্দিকী

রাহুল-আথিয়া সাত পাকে বাঁধা পড়লেন

দলমত নির্বিশেষে সবার জন্যই কাজ করছি

চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় হোসনে আরা লিপি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী

প্রকাশের সময় : ০৯:৩৭:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯
বিথি আক্তার :=

হোসনে আরা লিপি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় সফল হয়েছেন তিনি। তার এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে সংগ্রামের গল্প। যা আত্মপ্রত্যয়ী অনেক নারীর কাছে অনুপ্রেরণাও বটে। তার উপলব্ধি জীবনে সফল হতে হলে আত্মপ্রত্যয় আর কঠোর পরিশ্রমের সমন্বয় দরকার। এটি যে করতে পারবে সেই সফল। হোসনে আরা লিপি পেরেছেন বলেই অনুকরণীয়।
যশোর শহরের দড়াটানা জামে মসজিদ লেনে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আর দশজন পুরুষের পাশাপাশি তিনিও তার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। এই মার্কেটেই তার ছয়টি দোকান ভাড়া দেয়া। শহরের নীলরতন ধর সড়কে বাড়িও কিনেছেন। তার এই সাফল্যে দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে ঘরে-বাইরে।
সংগ্রাম ও সফলতার সম্পর্কে জানতে চাইলে হোসনে আরা খাতুন লিপি বলেন, তার এই সাফল্যের পিছনে সংগ্রামও কম নয়। অনার্স পড়াকালীন ২০০১ সালে যশোরের শাহীনুর রহমানের সাথে বিয়ে হয় তার। যশোর সরকারি সিটি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করে যোগ দেন চাকরিতে। দিনাজপুর নার্সিং ইন্সট্রাক্টর ইনস্টিটিউটে অতিথি প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। আড়াই বছর চাকরি করার পর জন্মদেন প্রথম সন্তান। শুরু হয় প্রতিবন্ধকতা। দিনাজপুরে ছিল না আত্মীয়-পরিজন। স্বামী শাহিনুর রহমান চাকরি করতেন ঢাকার একটি ফার্মেসিতে। ছোট বাচ্চা নিয়ে পরের চাকরি করলে অনেকে বিরক্ত হয়। একার পক্ষে সন্তান সামলে চাকরি করা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ফিরে আসেন যশোরে। শুরু হয় তার আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার প্রচেষ্টা। স্বামী শাহিনুর চাকরির পাশাপাশি স্টেশনারি দোকানের ব্যবসা শুরু করেন। তবে সেই দোকান দেখাশোনা করতেন তার চাচা।
হোসনে আরা লিপি বলেন, ধীরে ধীরে আমার দোকানে যাওয়া শুরু হয়। প্রথম অবস্থায় দোকানে এসে আমি কাগজ গুণে সাজাতাম। পরিবার থেকে অনেকবারই আমাকে থামানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি আমার স্বামীও প্রথম অবস্থায় আমার দোকানে যাওয়াটা মানতে পারেননি। শ্বশুরের উৎসাহে শুরু করি নিয়মিত দোকানে বসা। বাচ্চাটাকেও নিয়ে আসতাম সাথে। প্রতিদিন সংসারের কাজ শেষ করে দুপুরের পর চলে আসতাম। শুরু হয় আশেপাশের দোকানগুলো থেকে বিশ্রি মন্তব্য ছোঁড়া। কিছু মানুষতো বলেছিল ঠোঁটের লিপস্টিক দেখতেই আসে মার্কেটিং-এর লোকেরা। আর মেয়ে দেখতেই আসেন ক্রেতারা। তা সত্ত্বেও আমি হাল ছাড়িনি। প্রায় দশ বছর এখানে আছি। দড়াটানা জামে মনজিদ লেনে এখন আমার ছয়টা দোকান ভাড়া দেয়া। নীলরতন ধর রোডে একটি বাড়িও কিনেছি। পরিবারের সবার দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। বদলেছে আশেপাশের মানুষের চিন্তাও।
নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লিপি বলেন, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে যখন সাইকেল চালাতাম তখন থেকেই শুরু হয় বৈষম্যমূলক আচরণ। কেন মেয়ে হয়ে আমি সাইকেল চালাই সে কৈফিয়ত দিতে হয়েছে বাবাকে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন আমি হ্যান্ডিক্রাফট এর কাজ শিখি। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল স্বাবলম্বী হওয়ার। টিউশন, হ্যান্ডিক্রাফট ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের খরচ নিজে চালানোর চেষ্টা করতাম। পাশাপাশি সঞ্চয় করতাম। ছোট থেকেই নিজের ব্যবসা করার ইচ্ছা ছিল। উদ্যোক্তা হতে গেলে মূলধন থাকা জরুরি। তাই আয়ের উৎস ছোট বা বড় হোক, সঞ্চয় এর বিকল্প নেই। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে এখন বেশ স্বচ্ছন্দেই আছি। এখন স্বামীও আমার সাথে দোকানে বসেন।
হোসনে আরা লিপির জন্ম ১৯৮১ সালে পাবনা শহরে। ১৯৮৮ সালে বাবা-মায়ের সাথেই চলে আসেন যশোরে। বর্তমানে শহরের নীলরতন সড়কের বাড়িতে বসবাস করেন। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি মেজ। ১৯৯৭ সালে আদর্শ বহুমুখী বালিকা বিদ্যালয় যশোর থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর যশোর সরকারি সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি ও সরকারি এমএম কলেজ থেকে স্মাতক ও স্মাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।