মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

করোনাযুদ্ধে তাইওয়ান যেভাবে বিশ্বসেরা হয়ে উঠলো

রোকনুজ্জামান রিপন।।

তাইওয়ানে এখন পর্যন্ত কভিড-১৯ ভাইরাসে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা মাত্র ৩৮৫ জন এবং মারা গেছেন ৬ জন। অথচ ভাইরাসটির জন্মস্থান হিসেবে খ্যাত চীনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে দেশটি। চীনের বাইরে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার শুরুর দিকেই আক্রান্ত হয়েছিল তাইওয়ান। যদিও স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই এ মহামারীকে প্রায় পুরোপুরি থামিয়ে দিয়েছে দেশটি।

কাজের হলো শুরু : কেন তাইওয়ান সবচেয়ে ভালোভাবে করোনাভাইরাস মোকাবিলা করেছে? বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকরা বলছেন, ‘কভিড-১৯’ রোগটিকে প্রথম থেকে নজরে রেখে, পরিকল্পনা করে, প্রস্তুতি নিয়ে মানুষকে বাঁচানোর উদ্যোগগুলো তাইওয়ানে এত কার্যকর হয়েছে যে, জনগণ সরকারের উদ্যোগকে প্রশংসার জোয়ারে ভাসিয়ে দিচ্ছে।

কভিড-১৯ ভাইরাসটি গত বছরের ডিসেম্বর মাসে চীনের হুবেই প্রদেশের অন্তর্গত উহান শহরে প্রথম সংক্রমণ ঘটায়। পরে সেখান থেকে অন্যত্র যাওয়া মানুষদের মাধ্যমে ভাইরাসটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে মূলভূমি চীনের ফ্লাইট আসা-যাওয়া বন্ধ করে দেয় তাইওয়ান। করোনাভাইরাস ঠেকাতে পৃথিবীর প্রথম দেশ হিসেবে তারাই প্রথম এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তাইওয়ানের এ উদ্যোগ অন্যান্য দেশের কাছে ছিল পথ দেখানোর মতো। এর মধ্য দিয়ে মহামারী মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মনোযোগ কাড়তে শুরু করে দেশটি।

গত জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে কভিড-১৯ ভাইরাসটি যখন চীনের সীমানা অতিক্রম করে অন্যান্য দেশেও সংক্রমণ ঘটাতে শুরু করে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল- চীনের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ করোনা আক্রান্তের দেশ হবে তাইওয়ান। কারণ চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের নিবিড় সম্পর্ক। ৪ লাখ তাইওয়ানিজ চীনে বসবাস করছেন। প্রতি সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে আকাশপথে হাজার হাজার যাত্রী আনাগোনা করে। তাইওয়ানিজদের ভয়ংকর দুর্দশাচিত্রের জন্য যখন প্রবল কষ্ট নিয়ে পুরো বিশ্ব অপেক্ষা করছিল, তখন সবাই দেখল- ‘তাইওয়ান কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ মডেল’।

শুরু থেকেই করোনা মোকাবিলায় পশ্চিম এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় চোখে পড়ার মতো বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাইওয়ান। শুধু তাই নয়, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু ও নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্দা আর্ডেন সিদ্ধান্ত নেন, তারা তাইওয়ানের কভিড-১৯ রোগ মোকাবিলার গাইডলাইনটি অনুসরণ করবেন।

ডিসেম্বর থেকে মাঠে আছে : তাইওয়ানের সরকার এই মহামারীর বিরুদ্ধে উদ্যোগ নেওয়া শুরু করে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকেই, যখন উহানে নিউমোনিয়ার উপসর্গ নিয়ে বেশ কিছু মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং মারাত্মক কোনো ভাইরাসের সংক্রমণে এমনটি হতে পারে বলে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়।

প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে গত ৩১ ডিসেম্বর থেকেই তাইওয়ানের ‘দ্য সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল’ চীনের উহান থেকে আসা ফ্লাইটগুলোতে নজরদারি শুরু করে। যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা এবং কোনো ভাইরাস সংক্রমণ আছে কি-না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে শুরু করে তারা। ১০ দিন পর ৯ জানুয়ারি ‘দ্য সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল’-এর ওয়েবসাইটে জানানো হয় যে, ততদিনে তারা উহান থেকে আসা ১৪টি ফ্লাইটের মোট ১ হাজার ৩১৭ জন যাত্রী ও বিমানের ক্রুদের পরীক্ষা করেছেন।

জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে চীনের বাইরে অন্য দেশগুলোর নজরে আসতে শুরু করে রোগটি। এ অবস্থায় চীনের সঙ্গে সব ধরনের যাত্রী আনাগোনা বন্ধ করে দেয় তাইওয়ান। এই বিষয়ে তাইওয়ানের সংসদ সদস্য লো-চি-চেঙ বললেন, ‘অসংখ্য তাইওয়ানিজ চীনে বাস করেন। তাদের বেশিরভাগ প্রতি বছরের প্রথম দুই মাসে ছুটির দিনগুলোতে ফিরে আসেন।’

এভাবে রোগটি তার দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সম্ভাব্য মারাত্মক দুরবস্থা থেকে মানুষদের বাঁচাতে ও দেশকে ভালো রাখতে ‘দ্য সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল’ প্রতিদিন বিস্তারিত ঘোষণার পাশাপাশি কীভাবে নতুন রোগী আক্রান্ত হতে পারে ও নতুন কারও মধ্যে ছড়াতে পারে সেসব বিষয়ে বিবৃতি প্রদান শুরু করে। সতর্কতামূলক এ কাজটি এখনো অব্যাহত আছে।

সংসদ সদস্য লো জানান, ‘তাইওয়ানের নাগরিকরা সততাকে খুবই গুরুত্ব দেন। সরকার তথ্য দেওয়ার মাধ্যমে মানুষজন প্রবলভাবে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি না করে নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকবেন আশা করছেন।’ শুরু থেকে এই উদ্যোগ খুব কাজে দিয়েছে। ফলে দুই সপ্তাহের একটি ছুটির পর তাইওয়ানের বিদ্যালয়গুলোতে ফেব্রুয়ারিতেই আবারও ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। যদিও সেই সময়টিতে কভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছিল পার্শ্ববর্তী দেশ হংকং ও জাপানে বাড়ছিল।

অনলাইন চিকিৎসা ও সীমান্ত বন্ধ : তাইওয়ানের আছে পৃথিবীর অন্যতম সেরা ‘জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা’। দেশের  ৯৯.৯৯ শতাংশ নাগরিকই এই সেবাটি পান এবং সরকারিভাবেই তারা উন্নত মানের চিকিৎসাসেবা কম খরচে লাভ করেন। একজন নাগরিকের একবার ডাক্তার দেখাতে খরচ পড়ে মাত্র ১০ মার্কিন ডলার। দেশের সমন্বিত শক্তিশালী স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থাই তাইওয়ানের কভিড-১৯ রোগের বিপক্ষে প্রাথমিক লড়াইয়ে ব্যাপক ও মৌলিক অবদান রেখেছে। এই উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার চাদরে রোগীদের ঢেকে সরকার জাতীয় স্বাস্থ্য আইডি কার্ডে ভ্রমণ ইতিহাসের তথ্যগুলো যুক্ত করেছে। ফলে চিকিৎসকরা রোগীদের ভ্রমণ ইতিহাস জেনে চিকিৎসা করতে পেরেছেন। এই ডিজিটাল শাসন পরিচালনা করে সরকার সফলভাবে বেশিরভাগ রোগীকে চিহ্নিত করতে পেরেছে। অনলাইন মাধ্যমের সাহায্য নিয়ে ২৬ জানুয়ারি থেকে চীনের হুবেই প্রদেশ থেকে কারও তাইওয়ানে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশটির সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। মূলভূমি চীন থেকে কোনো পর্যটকের আগমনও নিষিদ্ধ করা হয়। করোনাভাইরাসের মহামারী ঠেকাতে শুরুর দিকেই সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে তাইওয়ান অন্যতম।

মহামারী সম্পর্কে দেশটির সরকার বিগ ডাটা টেকনিকস (অসংখ্য তথ্যকে সারিবদ্ধভাবে ও কার্যকর উপায়ে সাজানো) প্রয়োগ করে, যেন রোগের প্রাদুর্ভাব জেনে ওষুধ ও সেবার বিন্যাসে রোগের ভবিষ্যৎ জানা সম্ভব হয়। এ ধরনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সাহায্য গ্রহণ করে তারা।

মাস্কে সবার সেরা : কভিড-১৯ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে বাঁচতে মুখের মাস্ক ও মানুষকে ভালোভাবে কোয়ারেন্টাইন করে রাখার পদ্ধতিটি তাইওয়ানের করোনাভাইরাসে সাড়া দেওয়ার মডেলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়েছে। ২০০৩ সালে সার্স মহামারীতে আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল তাইওয়ান। সে-সময়ও তারা রোগটি থেকে বাঁচতে প্রধান অস্ত্র হিসেবে মাস্কের ব্যবহার করেছিল। এবার সে অস্ত্রকে মনে রেখে তাইওয়ানের সব মানুষই বিশ্বাস করেছেন, মুখের বন্ধনী পরার মাধ্যমে সহজ ও বাস্তব উপায়ে নিজেকে এবং পুরো দেশকে বাঁচানো যাবে। ফলে প্রতিদিনের জীবনে তারা প্রায় সবাই চর্চাটি করেছেন। পশ্চিমের সংস্কৃতি হলো, দেশগুলোর মানুষ মুখের বন্ধনীর সাহায্য নেন অসুখে ভুগলে; অস্বাস্থ্যকর, নোংরা পরিবেশে গেলে। তারা একে নিজেকে রক্ষার উপায় ভাবেন না। এ কারণেই তারা করোনাভাইরাসে বেশি ভুগছেন ও মারা যাচ্ছেন। তাইওয়ানের সংস্কৃতিতেই মুখের বন্ধনী ব্যবহারের ব্যাপক চল আছে। আসন্ন পরিস্থিতিকে সামাল দিতে ২৪ জানুয়ারি থেকেই তারা সব ধরনের মাস্ক রপ্তানি নিষিদ্ধ করে দেয়। ফেব্রুয়ারিতে নাগরিকদের কাছে রেশনের মতো করে তারা ‘মাস্ক’ বিতরণ শুরু করে, যেন পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে মাস্কের জন্য জনগণের মধ্যে বিশৃঙ্খলা শুরু না হয়। অথচ দেশটি চাহিদার মাত্র ১০ ভাগ মাস্ক তৈরি করে। বাকি ঘাটতি পূরণে এবার দেশটির সরকার ৩০টি বেসরকারি মাস্ক তৈরির প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হয়ে মাস্কের উৎপাদন বাড়ানো হয়। এছাড়াও মাস্ক নির্মাণের জন্য দেশটিতে নতুন আরও ৬০টি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তাতে বছরের মার্চের মাঝামাঝিতেই তারা প্রতিদিন ১ কোটি মাস্ক তৈরি করতে পারছে। দেশের ২ কোটি ৩০ লাখ নাগরিকের সবাই প্রতি দুই দিনে একটি মাস্ক পাচ্ছেন।

কার্যকর আইসোলেশন : তাইওয়ান সরকার আরও কার্যকর করেছিলেন খুব ভালোভাবে আলাদা করে রাখার তিন ধরনের পদ্ধতি। একটি ছিল বাড়িতে মানুষ নিজের উদ্যোগে আলাদা থাকবেন, অন্যটিতে বাড়িতেই সন্দেহজনকদের ওপর কড়া পাহারা বসানো হবে। শেষটিতে ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে এ সময়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা করবেন। তিনটিই খুব সফল ও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হয়েছে। স্বাস্থ্যগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিদেশ ফেরত নাগরিকরা সরকারের নির্দেশে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের খুব ভালোভাবে আলাদা করে রাখার পদ্ধতিতে গিয়েছেন। কেউ এই নিয়মগুলো ভাঙলে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের টাকায় ৫ হাজার ডলার (তাইওয়ানের মুদ্রায় দেড় লাখ) থেকে ১০ হাজার ডলার (তিন লাখ) পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হয়েছে। ফলে অবশ্যই পালন করা আলাদা করে রাখার পদ্ধতিগুলোর যথাযোগ্য প্রয়োগ রোগীদের মাধ্যমে ভাইরাসটিকে ছড়ানো কমিয়ে দিয়েছে। স্থানীয় পর্যায় থেকে অংশগ্রহণ ভালোভাবে আলাদা করে রাখার পদ্ধতিগুলোর সাফল্যের মূল কারণ। গ্রামের মাতবররা প্রতিদিন ডেকে ও গিয়ে দেখেছেন যারা আলাদা আছেন তারা আসলেই বাড়িতে আছেন। তারা তাদের খাবারও দিয়েছেন।

বৈজ্ঞানিক প্রমাণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ : তাইওয়ান মডেলের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল উপকরণ হলো, বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সাধারণ মানুষের আত্মবিশ্বাস ও সমর্থন লাভ। প্রেসিডেন্ট সাই-ইং-ওয়েন আলাদাভাবে তার স্বাস্থ্য ও কল্যাণমন্ত্রী চেন শি-চাংকে মহামারীটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট তার মন্ত্রীকে পেশাদারদের নিয়ে একটি কমিটি করতে বলেছিলেন। তাতে নামকরা চিকিৎসক, নানা ধরনের মহামারী বিশেষজ্ঞ আছেন। তারা রোগটির প্রতিরোধ করতে পুরোপুরি ভালো কাজ করেছেন। প্রতিদিনের যেকোনো নতুন ঘটনা তাইওয়ানের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল জানিয়ে দিচ্ছে। স্বাস্থ্য ও কল্যাণমন্ত্রী এবং কমিটির সদস্যরা প্রতিদিন দুপুরে তাদের সবার কাজের ফল হিসেবে দেশের অগ্রগতি ও অবস্থা জানাচ্ছেন। দেশের বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ নিজেরা পেছনে বসে কাজ করছেন। তারা পুরো কাজ ও উন্নতির দায়িত্ব নিচ্ছেন না। সরকার চিকিৎসা পেশাজীবীদের দেওয়া তথ্য ও সিদ্ধান্তগুলোকে সম্মান করে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কার্যকর করছেন। তাদেরই মহামারীটির বিপক্ষে যুদ্ধ করতে মানুষের আস্থা তৈরির পথ করছেন। শুরু থেকে প্রতিটি তাইওয়ানিজ বিমান কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অবশ্যই পূর্ণ প্রতিরোধক ব্যবস্থা থাকতে হচ্ছে এবং কোনো যাত্রীকেই তাদের স্বভাব অনুসারে আগের মতো সিট বদলানোর কোনো সুযোগ নেই। সেজন্য অনুমতি লাগছে। গণপরিবহনের মাধ্যমে মানুষের ব্যাপক সংস্পর্শে এসে কভিড-১৯ যেন ছড়াতে না পারে সেজন্য ১ এপ্রিল থেকে কোনো যাত্রীর শরীরে ৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা থাকলে তাকে গণপরিবহনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিদ্যালয়সহ জনগুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে যেতে যেকোনো মানুষকে জ্বর পরীক্ষা করতে হচ্ছে। এখন দেশের রাজধানী তাইপের প্রায় সব ভবনেই যথেষ্ট হ্যান্ড স্যানিটাইজার আছে।

পূর্ব অভিজ্ঞতা : তাইওয়ানে মহামারীর বিপক্ষে খুব দ্রুত সাফল্য লাভের আরেকটি সূত্র ছিল পূর্ব অভিজ্ঞতা। ১৭ বছর আগে সার্স ভাইরাসের বিরুদ্ধে তারা লড়াই করেছিল। এই রোগটিও শুরু হয়েছিল চীন থেকে। এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে অতি দ্রুত ছড়াতে শুরু করে। সার্স ভাইরাসে তাইওয়ানের ৭৩ জন মারা যায়।

চীনকে বিশ্বাস করার অভাব এই দেশের সরকারের অন্য দেশগুলোর চেয়ে কভিড-১৯ রোগকে অনেক বেশি ভালোভাবে প্রতিরোধ করার আরেকটি কারণ। ২০০৩ সালে সার্স মহামারীর সময় চীনের ক্ষমতায় থাকা চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি)’র সঙ্গে তাইওয়ান সরকারের বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই রোগের ব্যাপক বিস্তারের সময় সিসিপি বা চীনা সরকার তাইওয়ানকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে দেয়নি। তারা তার আগে তাদের দেশ থেকে তথ্য দিয়ে তাইওয়ানের প্রাদুর্ভাবের পেছনের কারণ বা অবস্থা জানার অনুরোধ নাকচ করেছিলেন। চীনের চিকিৎসা পরিসংখ্যান দেশটি পায়নি। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যভান্ডার ব্যবহারের অনুমতিও প্রদান করেননি তারা। রাজনৈতিক এই নিপীড়ন এবং তথ্যগত দিক থেকে পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার চীনা কর্মে তাইওয়ান ভয়ংকর পরিস্থিতিতে পড়ে গিয়েছিল। সার্স মহামারীর প্রায় ১০ ভাগ রোগী মারা গিয়েছিল এ দেশে। ফলে চীনকে অবিশ্বাস করে তাইওয়ান সিসিপির করোনাভাইরাসের সময়ে দেওয়া তথ্যাবলি বিশেষ কোনো বিষয় হিসেবে গণ্য করেনি। তার আগেই তারা নিজেদের আলাদা উন্নত তথ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থা তৈরি করেছেন। মহামারীতে যথেষ্ট শক্ত হাতে সব সামলাচ্ছেন। ফলে দেশের সরকার আরও বেশি কর্র্তৃত্বের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সবচেয়ে নির্ভুল কর্মকৌশল বের করতে পেরেছে। সুত্র : দেশ রুপান্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

লেখকের সম্পর্কে

Shahriar Hossain

করোনাযুদ্ধে তাইওয়ান যেভাবে বিশ্বসেরা হয়ে উঠলো

প্রকাশের সময় : ১০:১৩:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২০

রোকনুজ্জামান রিপন।।

তাইওয়ানে এখন পর্যন্ত কভিড-১৯ ভাইরাসে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা মাত্র ৩৮৫ জন এবং মারা গেছেন ৬ জন। অথচ ভাইরাসটির জন্মস্থান হিসেবে খ্যাত চীনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে দেশটি। চীনের বাইরে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার শুরুর দিকেই আক্রান্ত হয়েছিল তাইওয়ান। যদিও স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই এ মহামারীকে প্রায় পুরোপুরি থামিয়ে দিয়েছে দেশটি।

কাজের হলো শুরু : কেন তাইওয়ান সবচেয়ে ভালোভাবে করোনাভাইরাস মোকাবিলা করেছে? বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকরা বলছেন, ‘কভিড-১৯’ রোগটিকে প্রথম থেকে নজরে রেখে, পরিকল্পনা করে, প্রস্তুতি নিয়ে মানুষকে বাঁচানোর উদ্যোগগুলো তাইওয়ানে এত কার্যকর হয়েছে যে, জনগণ সরকারের উদ্যোগকে প্রশংসার জোয়ারে ভাসিয়ে দিচ্ছে।

কভিড-১৯ ভাইরাসটি গত বছরের ডিসেম্বর মাসে চীনের হুবেই প্রদেশের অন্তর্গত উহান শহরে প্রথম সংক্রমণ ঘটায়। পরে সেখান থেকে অন্যত্র যাওয়া মানুষদের মাধ্যমে ভাইরাসটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে মূলভূমি চীনের ফ্লাইট আসা-যাওয়া বন্ধ করে দেয় তাইওয়ান। করোনাভাইরাস ঠেকাতে পৃথিবীর প্রথম দেশ হিসেবে তারাই প্রথম এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তাইওয়ানের এ উদ্যোগ অন্যান্য দেশের কাছে ছিল পথ দেখানোর মতো। এর মধ্য দিয়ে মহামারী মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মনোযোগ কাড়তে শুরু করে দেশটি।

গত জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে কভিড-১৯ ভাইরাসটি যখন চীনের সীমানা অতিক্রম করে অন্যান্য দেশেও সংক্রমণ ঘটাতে শুরু করে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল- চীনের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ করোনা আক্রান্তের দেশ হবে তাইওয়ান। কারণ চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের নিবিড় সম্পর্ক। ৪ লাখ তাইওয়ানিজ চীনে বসবাস করছেন। প্রতি সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে আকাশপথে হাজার হাজার যাত্রী আনাগোনা করে। তাইওয়ানিজদের ভয়ংকর দুর্দশাচিত্রের জন্য যখন প্রবল কষ্ট নিয়ে পুরো বিশ্ব অপেক্ষা করছিল, তখন সবাই দেখল- ‘তাইওয়ান কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ মডেল’।

শুরু থেকেই করোনা মোকাবিলায় পশ্চিম এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় চোখে পড়ার মতো বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাইওয়ান। শুধু তাই নয়, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু ও নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্দা আর্ডেন সিদ্ধান্ত নেন, তারা তাইওয়ানের কভিড-১৯ রোগ মোকাবিলার গাইডলাইনটি অনুসরণ করবেন।

ডিসেম্বর থেকে মাঠে আছে : তাইওয়ানের সরকার এই মহামারীর বিরুদ্ধে উদ্যোগ নেওয়া শুরু করে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকেই, যখন উহানে নিউমোনিয়ার উপসর্গ নিয়ে বেশ কিছু মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং মারাত্মক কোনো ভাইরাসের সংক্রমণে এমনটি হতে পারে বলে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়।

প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে গত ৩১ ডিসেম্বর থেকেই তাইওয়ানের ‘দ্য সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল’ চীনের উহান থেকে আসা ফ্লাইটগুলোতে নজরদারি শুরু করে। যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা এবং কোনো ভাইরাস সংক্রমণ আছে কি-না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে শুরু করে তারা। ১০ দিন পর ৯ জানুয়ারি ‘দ্য সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল’-এর ওয়েবসাইটে জানানো হয় যে, ততদিনে তারা উহান থেকে আসা ১৪টি ফ্লাইটের মোট ১ হাজার ৩১৭ জন যাত্রী ও বিমানের ক্রুদের পরীক্ষা করেছেন।

জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে চীনের বাইরে অন্য দেশগুলোর নজরে আসতে শুরু করে রোগটি। এ অবস্থায় চীনের সঙ্গে সব ধরনের যাত্রী আনাগোনা বন্ধ করে দেয় তাইওয়ান। এই বিষয়ে তাইওয়ানের সংসদ সদস্য লো-চি-চেঙ বললেন, ‘অসংখ্য তাইওয়ানিজ চীনে বাস করেন। তাদের বেশিরভাগ প্রতি বছরের প্রথম দুই মাসে ছুটির দিনগুলোতে ফিরে আসেন।’

এভাবে রোগটি তার দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সম্ভাব্য মারাত্মক দুরবস্থা থেকে মানুষদের বাঁচাতে ও দেশকে ভালো রাখতে ‘দ্য সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল’ প্রতিদিন বিস্তারিত ঘোষণার পাশাপাশি কীভাবে নতুন রোগী আক্রান্ত হতে পারে ও নতুন কারও মধ্যে ছড়াতে পারে সেসব বিষয়ে বিবৃতি প্রদান শুরু করে। সতর্কতামূলক এ কাজটি এখনো অব্যাহত আছে।

সংসদ সদস্য লো জানান, ‘তাইওয়ানের নাগরিকরা সততাকে খুবই গুরুত্ব দেন। সরকার তথ্য দেওয়ার মাধ্যমে মানুষজন প্রবলভাবে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি না করে নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকবেন আশা করছেন।’ শুরু থেকে এই উদ্যোগ খুব কাজে দিয়েছে। ফলে দুই সপ্তাহের একটি ছুটির পর তাইওয়ানের বিদ্যালয়গুলোতে ফেব্রুয়ারিতেই আবারও ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। যদিও সেই সময়টিতে কভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছিল পার্শ্ববর্তী দেশ হংকং ও জাপানে বাড়ছিল।

অনলাইন চিকিৎসা ও সীমান্ত বন্ধ : তাইওয়ানের আছে পৃথিবীর অন্যতম সেরা ‘জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা’। দেশের  ৯৯.৯৯ শতাংশ নাগরিকই এই সেবাটি পান এবং সরকারিভাবেই তারা উন্নত মানের চিকিৎসাসেবা কম খরচে লাভ করেন। একজন নাগরিকের একবার ডাক্তার দেখাতে খরচ পড়ে মাত্র ১০ মার্কিন ডলার। দেশের সমন্বিত শক্তিশালী স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থাই তাইওয়ানের কভিড-১৯ রোগের বিপক্ষে প্রাথমিক লড়াইয়ে ব্যাপক ও মৌলিক অবদান রেখেছে। এই উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার চাদরে রোগীদের ঢেকে সরকার জাতীয় স্বাস্থ্য আইডি কার্ডে ভ্রমণ ইতিহাসের তথ্যগুলো যুক্ত করেছে। ফলে চিকিৎসকরা রোগীদের ভ্রমণ ইতিহাস জেনে চিকিৎসা করতে পেরেছেন। এই ডিজিটাল শাসন পরিচালনা করে সরকার সফলভাবে বেশিরভাগ রোগীকে চিহ্নিত করতে পেরেছে। অনলাইন মাধ্যমের সাহায্য নিয়ে ২৬ জানুয়ারি থেকে চীনের হুবেই প্রদেশ থেকে কারও তাইওয়ানে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশটির সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। মূলভূমি চীন থেকে কোনো পর্যটকের আগমনও নিষিদ্ধ করা হয়। করোনাভাইরাসের মহামারী ঠেকাতে শুরুর দিকেই সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে তাইওয়ান অন্যতম।

মহামারী সম্পর্কে দেশটির সরকার বিগ ডাটা টেকনিকস (অসংখ্য তথ্যকে সারিবদ্ধভাবে ও কার্যকর উপায়ে সাজানো) প্রয়োগ করে, যেন রোগের প্রাদুর্ভাব জেনে ওষুধ ও সেবার বিন্যাসে রোগের ভবিষ্যৎ জানা সম্ভব হয়। এ ধরনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সাহায্য গ্রহণ করে তারা।

মাস্কে সবার সেরা : কভিড-১৯ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে বাঁচতে মুখের মাস্ক ও মানুষকে ভালোভাবে কোয়ারেন্টাইন করে রাখার পদ্ধতিটি তাইওয়ানের করোনাভাইরাসে সাড়া দেওয়ার মডেলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়েছে। ২০০৩ সালে সার্স মহামারীতে আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল তাইওয়ান। সে-সময়ও তারা রোগটি থেকে বাঁচতে প্রধান অস্ত্র হিসেবে মাস্কের ব্যবহার করেছিল। এবার সে অস্ত্রকে মনে রেখে তাইওয়ানের সব মানুষই বিশ্বাস করেছেন, মুখের বন্ধনী পরার মাধ্যমে সহজ ও বাস্তব উপায়ে নিজেকে এবং পুরো দেশকে বাঁচানো যাবে। ফলে প্রতিদিনের জীবনে তারা প্রায় সবাই চর্চাটি করেছেন। পশ্চিমের সংস্কৃতি হলো, দেশগুলোর মানুষ মুখের বন্ধনীর সাহায্য নেন অসুখে ভুগলে; অস্বাস্থ্যকর, নোংরা পরিবেশে গেলে। তারা একে নিজেকে রক্ষার উপায় ভাবেন না। এ কারণেই তারা করোনাভাইরাসে বেশি ভুগছেন ও মারা যাচ্ছেন। তাইওয়ানের সংস্কৃতিতেই মুখের বন্ধনী ব্যবহারের ব্যাপক চল আছে। আসন্ন পরিস্থিতিকে সামাল দিতে ২৪ জানুয়ারি থেকেই তারা সব ধরনের মাস্ক রপ্তানি নিষিদ্ধ করে দেয়। ফেব্রুয়ারিতে নাগরিকদের কাছে রেশনের মতো করে তারা ‘মাস্ক’ বিতরণ শুরু করে, যেন পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে মাস্কের জন্য জনগণের মধ্যে বিশৃঙ্খলা শুরু না হয়। অথচ দেশটি চাহিদার মাত্র ১০ ভাগ মাস্ক তৈরি করে। বাকি ঘাটতি পূরণে এবার দেশটির সরকার ৩০টি বেসরকারি মাস্ক তৈরির প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হয়ে মাস্কের উৎপাদন বাড়ানো হয়। এছাড়াও মাস্ক নির্মাণের জন্য দেশটিতে নতুন আরও ৬০টি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তাতে বছরের মার্চের মাঝামাঝিতেই তারা প্রতিদিন ১ কোটি মাস্ক তৈরি করতে পারছে। দেশের ২ কোটি ৩০ লাখ নাগরিকের সবাই প্রতি দুই দিনে একটি মাস্ক পাচ্ছেন।

কার্যকর আইসোলেশন : তাইওয়ান সরকার আরও কার্যকর করেছিলেন খুব ভালোভাবে আলাদা করে রাখার তিন ধরনের পদ্ধতি। একটি ছিল বাড়িতে মানুষ নিজের উদ্যোগে আলাদা থাকবেন, অন্যটিতে বাড়িতেই সন্দেহজনকদের ওপর কড়া পাহারা বসানো হবে। শেষটিতে ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে এ সময়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা করবেন। তিনটিই খুব সফল ও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হয়েছে। স্বাস্থ্যগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিদেশ ফেরত নাগরিকরা সরকারের নির্দেশে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের খুব ভালোভাবে আলাদা করে রাখার পদ্ধতিতে গিয়েছেন। কেউ এই নিয়মগুলো ভাঙলে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের টাকায় ৫ হাজার ডলার (তাইওয়ানের মুদ্রায় দেড় লাখ) থেকে ১০ হাজার ডলার (তিন লাখ) পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হয়েছে। ফলে অবশ্যই পালন করা আলাদা করে রাখার পদ্ধতিগুলোর যথাযোগ্য প্রয়োগ রোগীদের মাধ্যমে ভাইরাসটিকে ছড়ানো কমিয়ে দিয়েছে। স্থানীয় পর্যায় থেকে অংশগ্রহণ ভালোভাবে আলাদা করে রাখার পদ্ধতিগুলোর সাফল্যের মূল কারণ। গ্রামের মাতবররা প্রতিদিন ডেকে ও গিয়ে দেখেছেন যারা আলাদা আছেন তারা আসলেই বাড়িতে আছেন। তারা তাদের খাবারও দিয়েছেন।

বৈজ্ঞানিক প্রমাণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ : তাইওয়ান মডেলের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল উপকরণ হলো, বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সাধারণ মানুষের আত্মবিশ্বাস ও সমর্থন লাভ। প্রেসিডেন্ট সাই-ইং-ওয়েন আলাদাভাবে তার স্বাস্থ্য ও কল্যাণমন্ত্রী চেন শি-চাংকে মহামারীটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট তার মন্ত্রীকে পেশাদারদের নিয়ে একটি কমিটি করতে বলেছিলেন। তাতে নামকরা চিকিৎসক, নানা ধরনের মহামারী বিশেষজ্ঞ আছেন। তারা রোগটির প্রতিরোধ করতে পুরোপুরি ভালো কাজ করেছেন। প্রতিদিনের যেকোনো নতুন ঘটনা তাইওয়ানের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল জানিয়ে দিচ্ছে। স্বাস্থ্য ও কল্যাণমন্ত্রী এবং কমিটির সদস্যরা প্রতিদিন দুপুরে তাদের সবার কাজের ফল হিসেবে দেশের অগ্রগতি ও অবস্থা জানাচ্ছেন। দেশের বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ নিজেরা পেছনে বসে কাজ করছেন। তারা পুরো কাজ ও উন্নতির দায়িত্ব নিচ্ছেন না। সরকার চিকিৎসা পেশাজীবীদের দেওয়া তথ্য ও সিদ্ধান্তগুলোকে সম্মান করে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কার্যকর করছেন। তাদেরই মহামারীটির বিপক্ষে যুদ্ধ করতে মানুষের আস্থা তৈরির পথ করছেন। শুরু থেকে প্রতিটি তাইওয়ানিজ বিমান কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অবশ্যই পূর্ণ প্রতিরোধক ব্যবস্থা থাকতে হচ্ছে এবং কোনো যাত্রীকেই তাদের স্বভাব অনুসারে আগের মতো সিট বদলানোর কোনো সুযোগ নেই। সেজন্য অনুমতি লাগছে। গণপরিবহনের মাধ্যমে মানুষের ব্যাপক সংস্পর্শে এসে কভিড-১৯ যেন ছড়াতে না পারে সেজন্য ১ এপ্রিল থেকে কোনো যাত্রীর শরীরে ৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা থাকলে তাকে গণপরিবহনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিদ্যালয়সহ জনগুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে যেতে যেকোনো মানুষকে জ্বর পরীক্ষা করতে হচ্ছে। এখন দেশের রাজধানী তাইপের প্রায় সব ভবনেই যথেষ্ট হ্যান্ড স্যানিটাইজার আছে।

পূর্ব অভিজ্ঞতা : তাইওয়ানে মহামারীর বিপক্ষে খুব দ্রুত সাফল্য লাভের আরেকটি সূত্র ছিল পূর্ব অভিজ্ঞতা। ১৭ বছর আগে সার্স ভাইরাসের বিরুদ্ধে তারা লড়াই করেছিল। এই রোগটিও শুরু হয়েছিল চীন থেকে। এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে অতি দ্রুত ছড়াতে শুরু করে। সার্স ভাইরাসে তাইওয়ানের ৭৩ জন মারা যায়।

চীনকে বিশ্বাস করার অভাব এই দেশের সরকারের অন্য দেশগুলোর চেয়ে কভিড-১৯ রোগকে অনেক বেশি ভালোভাবে প্রতিরোধ করার আরেকটি কারণ। ২০০৩ সালে সার্স মহামারীর সময় চীনের ক্ষমতায় থাকা চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি)’র সঙ্গে তাইওয়ান সরকারের বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই রোগের ব্যাপক বিস্তারের সময় সিসিপি বা চীনা সরকার তাইওয়ানকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে দেয়নি। তারা তার আগে তাদের দেশ থেকে তথ্য দিয়ে তাইওয়ানের প্রাদুর্ভাবের পেছনের কারণ বা অবস্থা জানার অনুরোধ নাকচ করেছিলেন। চীনের চিকিৎসা পরিসংখ্যান দেশটি পায়নি। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যভান্ডার ব্যবহারের অনুমতিও প্রদান করেননি তারা। রাজনৈতিক এই নিপীড়ন এবং তথ্যগত দিক থেকে পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার চীনা কর্মে তাইওয়ান ভয়ংকর পরিস্থিতিতে পড়ে গিয়েছিল। সার্স মহামারীর প্রায় ১০ ভাগ রোগী মারা গিয়েছিল এ দেশে। ফলে চীনকে অবিশ্বাস করে তাইওয়ান সিসিপির করোনাভাইরাসের সময়ে দেওয়া তথ্যাবলি বিশেষ কোনো বিষয় হিসেবে গণ্য করেনি। তার আগেই তারা নিজেদের আলাদা উন্নত তথ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থা তৈরি করেছেন। মহামারীতে যথেষ্ট শক্ত হাতে সব সামলাচ্ছেন। ফলে দেশের সরকার আরও বেশি কর্র্তৃত্বের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সবচেয়ে নির্ভুল কর্মকৌশল বের করতে পেরেছে। সুত্র : দেশ রুপান্তর