মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: কী ভাবছে বাংলাদেশ?

ছবি : সংগৃহীত

স্টাফ রিপোর্টার  ।।

মানবিক দিক বিবেচনা করে প্রতিবেশী মিয়ানমারের এই নাগরিকদের আশ্রয় দিয়েছিল বাংলাদেশ। চার বছর আগে গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময় আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। সবমিলিয়ে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নাগরিক এখন বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত চার বছরে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অনেক ফোরামে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরানোর ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ অনেক দেশের কাছেও ধরনা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেবে বলে আশ্বাস দিলেও নানা চতুরতার আশ্রয় নিয়ে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরায়নি। ইতিমধ্যে দেশটিতে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হওয়ায় পুরোপুরি বন্ধ আছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া।

নতুন এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কী করবে এ সম্পর্কে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বিবিসিকে বলেছেন, বাংলাদেশ এই ইস্যুতে যতটা এগিয়েছিল, সেটা মিয়ানমারের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে থমকে গেছে।

প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এখন মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর জন্য আগামী মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইস্যুটি উত্থাপন করবে।

তবে তিনি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে রোহিঙ্গাদের ঢল বাংলাদেশের সীমান্তে আসতে শুরু করে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। এর চার বছর পুরো হয়েছে বুধবার। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, আলোচনা শুরুর ব্যাপারে মিয়ানমারের সামরিক সরকার থেকে কোনো ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, আমরা যতটুকু এগিয়েছিলাম, সেটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে থমকে গেছে। তবে এর আগে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সরকারের সময় আলোচনা বা চুক্তি হলেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন যে শুরু করা যায়নি সে প্রসঙ্গও তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি অবশ্য মনে করেন, প্রত্যাবাসন শুরু না হলেও তখন মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার একটা দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে দায়বদ্ধ ছিল।

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে অভিযোগ যে আন্তর্জাতিক আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে, সেই আদালতে শুনানিতে মিয়ানমারের আগের গণতান্ত্রিক সরকারের নিয়মিত অংশ নেয়ার বিষয়কেও উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি মনে করেন, তখন মিয়ানমারের আগের সরকারের ওপর একটা চাপ তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমারের বর্তমান সেনা শাসিত সরকার যদিও অভ্যন্তরীণভাবে বলেছে যে, রোহিঙ্গা বা অন্যান্য সমস্যার সমাধান তারা করতে চায়। কিন্তু কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ বা পদক্ষেপ আমরা তাদের দিক থেকে পাইনি।

গত চার বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরাতে না পারার হতাশার কথা সম্প্রতি জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনও৷ তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত জনগণ, আমরা কিছুদিনের জন্য তাদেরকে এখানে আশ্রয় দিয়েছি৷ আমাদের অগ্রাধিকার ইস্যু হচ্ছে তারা ফিরে যাবে৷ প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারও বলেছে, তাদেরকে নিয়ে যাবে৷ চার বছর হলো যায়নি, তারা কিন্তু কখনো বলেনি নেবে না৷

বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বরাবরই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা চেয়ে আসছে৷ তবে জাতিসংঘসহ অন্যান্য সংস্থা ও দেশ তেমন উদ্যোগ নেয়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেই রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে, সেজন্য দেশটির সামরিক সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক লাইলুফার ইয়াসমিন বিবিসিকে বলেন, এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর ভরসা করতে হলে বাংলাদেশ সরকারকে আরও সক্রিয় হতে হবে। একটা ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে, আমেরিকা এখন ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাতে কিন্তু বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা রাষ্ট্র। কিন্তু সেটার প্রতিফলন এখনো দেখা যাচ্ছে না। সেজন্য বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও সক্রিয় হতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: কী ভাবছে বাংলাদেশ?

প্রকাশের সময় : ১২:৩৩:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ অগাস্ট ২০২১

স্টাফ রিপোর্টার  ।।

মানবিক দিক বিবেচনা করে প্রতিবেশী মিয়ানমারের এই নাগরিকদের আশ্রয় দিয়েছিল বাংলাদেশ। চার বছর আগে গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময় আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। সবমিলিয়ে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নাগরিক এখন বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত চার বছরে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অনেক ফোরামে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরানোর ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ অনেক দেশের কাছেও ধরনা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেবে বলে আশ্বাস দিলেও নানা চতুরতার আশ্রয় নিয়ে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরায়নি। ইতিমধ্যে দেশটিতে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হওয়ায় পুরোপুরি বন্ধ আছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া।

নতুন এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কী করবে এ সম্পর্কে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বিবিসিকে বলেছেন, বাংলাদেশ এই ইস্যুতে যতটা এগিয়েছিল, সেটা মিয়ানমারের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে থমকে গেছে।

প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এখন মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর জন্য আগামী মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইস্যুটি উত্থাপন করবে।

তবে তিনি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে রোহিঙ্গাদের ঢল বাংলাদেশের সীমান্তে আসতে শুরু করে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। এর চার বছর পুরো হয়েছে বুধবার। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, আলোচনা শুরুর ব্যাপারে মিয়ানমারের সামরিক সরকার থেকে কোনো ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, আমরা যতটুকু এগিয়েছিলাম, সেটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে থমকে গেছে। তবে এর আগে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সরকারের সময় আলোচনা বা চুক্তি হলেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন যে শুরু করা যায়নি সে প্রসঙ্গও তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি অবশ্য মনে করেন, প্রত্যাবাসন শুরু না হলেও তখন মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার একটা দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে দায়বদ্ধ ছিল।

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে অভিযোগ যে আন্তর্জাতিক আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে, সেই আদালতে শুনানিতে মিয়ানমারের আগের গণতান্ত্রিক সরকারের নিয়মিত অংশ নেয়ার বিষয়কেও উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি মনে করেন, তখন মিয়ানমারের আগের সরকারের ওপর একটা চাপ তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমারের বর্তমান সেনা শাসিত সরকার যদিও অভ্যন্তরীণভাবে বলেছে যে, রোহিঙ্গা বা অন্যান্য সমস্যার সমাধান তারা করতে চায়। কিন্তু কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ বা পদক্ষেপ আমরা তাদের দিক থেকে পাইনি।

গত চার বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরাতে না পারার হতাশার কথা সম্প্রতি জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনও৷ তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত জনগণ, আমরা কিছুদিনের জন্য তাদেরকে এখানে আশ্রয় দিয়েছি৷ আমাদের অগ্রাধিকার ইস্যু হচ্ছে তারা ফিরে যাবে৷ প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারও বলেছে, তাদেরকে নিয়ে যাবে৷ চার বছর হলো যায়নি, তারা কিন্তু কখনো বলেনি নেবে না৷

বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বরাবরই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা চেয়ে আসছে৷ তবে জাতিসংঘসহ অন্যান্য সংস্থা ও দেশ তেমন উদ্যোগ নেয়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেই রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে, সেজন্য দেশটির সামরিক সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক লাইলুফার ইয়াসমিন বিবিসিকে বলেন, এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর ভরসা করতে হলে বাংলাদেশ সরকারকে আরও সক্রিয় হতে হবে। একটা ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে, আমেরিকা এখন ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাতে কিন্তু বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা রাষ্ট্র। কিন্তু সেটার প্রতিফলন এখনো দেখা যাচ্ছে না। সেজন্য বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও সক্রিয় হতে হবে।