Barta Kontho
নিবন্ধন নম্বর: ৪৬১শুক্রবার , ২৫ মার্চ ২০২২
  1. 1st Lead
  2. 2nd Lead
  3. অপরাধ
  4. আইটি বিশ্ব
  5. আইন ও আদালত
  6. আন্তর্জাতিক
  7. আবহাওয়া
  8. ইসলাম
  9. খেলাধুলা
  10. চাকুরি
  11. ছবি ঘর
  12. জাতীয়
  13. জেলার খবর
  14. ট্রাভেল
  15. নির্বাচন

একাত্তরের সাহসী এক কলম সৈনিক ঝিকরগাছার ইকবাল হোসেন

Link Copied!

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের স্বাধীনতা বাঙালী জাতির এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। সংগ্রাম মুখর এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা। একটি সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে পাওয়া প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ এর অস্তিত্ব রক্ষা, হায়েনার হাত থেকে এর পবিত্র মাটিকে উদ্ধারের সংগ্রামে এদেশের আপামর জনসাধারণের রয়েছে অসাধারণ অবদান। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, যুবক, বৃদ্ধ, পুলিশ, আনসার, বাঙ্গালী সেনা এক অপরিসীম দুর্বার আকাঙ্খাকে বুকে লালন করে বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশমাতৃকা রক্ষার্থে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। আমাদের এই নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে সহযোগিতা করেছে এদেশের সর্বোস্তরের মুক্তি পাগল মানুষ। সশস্ত্র সংগ্রামে যেমন অংশ গ্রহন করেছে তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত, উৎসাহিত, সহযোগিতা ও আশ্রয় দিয়ে এক অন্যান্য অবদান রেখেছে আমাদের দেশের জনগণ।
যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার পায়রাডাঙ্গা গ্রামের মোঃ ওমর আলীর একমাত্র ছেলে সন্তান, একাত্তরের এক টগবগে তরুন ইকবাল হোসেন। সত্তরে এস এস সি পাশ করা যশোর সরকারী মাইকেল মধুসধন কলেজের ইন্টারমিডিয়েট এর ছাত্র। ভবিষ্যতে ডাক্তার হবে এই চিন্তায় রীতিমত পড়ুয়া ছাত্র। কিন্তু সত্তর এর নির্বাচনে বাঙ্গালীর নিরঙ্কুশ বিজয়কে যখন পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠি ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য নানা টালবাহানা করতে থাকে। প্রতিবাদে রাস্তায় রাস্তায় বাঙ্গালীদের পথসভা, মিছিল, মিটিং ইকবাল হোসেনকে আন্দোলিত করে তোলে। বিশেষ করে ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষন, তার স্বাধীনতার ঘোষনা তাকে সংগ্রামী হওয়ার পথে অগ্রগামী করে দেয়। আর ২৫ মার্চ ঢাকাসহ সমগ্র দেশে পাক-বাহিনী নিরস্ত্র বাঙ্গালীর উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ ইকবাল হোসেনকে আরও উদ্বিগ্ন ও কিছু একটা করার চিন্তা তাকে উদ্বেলিত করে তোলে। অস্ত্র হাতে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ গ্রহন না করে কলম হাতে মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতা পাগল মানুষের মনে সাহস জুগিয়েছেন, অনুপ্রানিত, আশ্বস্ত করেছেন দিশেহারা মানুষকে। ’স্বাধীন বাংলা’ নামে হাতে লেখা একটি সপ্তাহিক পত্রিকা তিনি গোপনে বের করেন। চারপাতা, কখনো কখনো ছয় পাতা নিয়ে পত্রিকাটি বের হতো। ‘এম-ডরিস’ ছদ্মনামে তিনি সম্পাদনা করতেন। মুজিবনগরকে পত্রিকার প্রকাশ স্থান উল্লেখ করে পাক বাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ ঝিকরগাছা থেকে ‘স্বাধীন বাংলা’ পত্রিকা বের করা হতো। সপ্তাহে ৫০ কপি পত্রিকা তিনি বের করতেন। মুলকপি থেকে অন্যান্য কপি করার ব্যাপারে তার ঘনিষ্ট বন্ধু আসাদুল হক বাবু তাকে সহযোগিতা করতেন। বিভিন্ন ভাবে ইকবাল হোসেন সংবাদ সংগ্রহ করতেন। বিভিন্ন সময় বর্ডারে যেখানে যেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকবাহিনীর যুদ্ধ হচ্ছে সেখানে যেতেন। গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতেন। তার কোন রেডিও ছিল না। তার গ্রামে পাচু চাচার একটা ছোট্ট রেডিও ছিলো। তিনি রাতের বেলায় গোপনে সেই রেডিও শুনতেন এবং সংবাদ সংগ্রহ করতেন। এছাড়া তিনি গোপনে প্রায় ১৫ মাইল পথ পায়ে হেঁটে নিকটবর্তী শার্শা উপজেলার কাশিপুর সিমান্ত হয়ে ভারতের বয়রা থেকে বাসে চড়ে বনগাঁ যেতেন। ভারতীয় পত্রিকা, কলকাতা থেকে প্রকাশিত জয়বাংলাসহ বিভিন্ন পত্রিকা সংগ্রহ করে ঝিকরগাছায় আনতেন। ঐ সকল পত্রিকা থেকে মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ ও মুজিবনগর সরকারের কর্মতৎপরতা সংগ্রহ করে তিনি নিজ পত্রিকায় লিখতেন। ভারত থেকে পত্রিকা আনা বেশ ঝুকিপূর্ণ ছিল। দুই বার তিনি রাজাকারদের হাত থেকে বেঁচে গেছেন। লাল বলপেন দিয়ে হেডলাইন লিখে পত্রিকাকে আকর্ষনীয় করে মুক্তিপাগল মানুষের সামনে তিনি গোপনে উপস্থাপন করতেন।
যশোর শত্রু মুক্ত হলে ১১ই ডিসেম্বর’৭১ যশোর টাউন হল ময়দানে প্রবাসী সরকারের প্রথম ঐতিহাসিক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই জনসভায় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দীন আহম্মদ সহ প্রবাসী সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। ঐ জনসভায় ইকবাল হোসেনও উপস্থিত ছিলেন। তিনি ১৬ই জানুয়ারী’৭২ এ যশোর থেকে ‘সোনার দেশ’ নামে আরও একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। দেশ স্বাধীনের পর ‘সোনার দেশ’ই ছিল ঝিকরগাছা থেকে ছাপানো প্রথম পত্রিকা।
ব্যক্তিগত জীবনে ইকবাল হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে অনার্স ও মাষ্টার ডিগ্রী লাভ করেন। পরবর্তীকালে ইংরেজী সাহিত্যেও এম,এ পাশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালিখি এবং সাংবাদিকতা করেছেন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত ডেইলী সান, ডেইলী অবজারভার, ডেইলী ইনডিপেনডেন্ট, সপ্তাহিক ঢাকা কুরিয়ার সহ বিভিন্ন পত্রিকায় ইকবাল হোসেনের অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি একজন সরকারী চাকুরীজীবি হিসাবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উপ-পরিচালক পদ থেকে অবসর গ্রহন করেছেন। বর্তমানে ইকবাল হোসেন যশোর থেকে প্রকাশিত ইংরেজী সাপ্তাহিক ভিউ পয়েন্ট সম্পাদনা করেন।
আলাপচারিতার এক পর্যায়ে ইকবাল হোসেন বলেন অস্তিত্বের সংকটে বাঙ্গালীরা যার যা কাজ ফেলে রেখে জীবন বাজি রেখে বঙ্গবন্ধুর আহবানে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। দেশকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধরা। তারপর যার যে কাজ ছিল সে কাজে আবার ফিরে গেছে। মুক্তিযোদ্ধারা শুধু দিতে জানে তার বিনিময়ে কিছুই পেতে চায় না, তারা দেখতে চায় সুখি সমৃিদ্ধ বাংলাদেশ। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের অনেক সংকট আসবে, বিপদ আসবে, মনে হবে এই বুঝি দেশটাকে আর বাঁচানো গেলো না, কিন্তু তখনও সেই সংকট মুহুর্তেও বঙ্গবন্ধু থাকবেন সবার উপরে। এতটুকু ক্ষুন্ন বা ম্লান হবে না তার অবদানের। বরং তাকে বেশি করে মনে পড়বে বাঙ্গালীর এই ভেবে যে, আজ বঙ্গবন্ধু থাকলে হয়তো আমাদের এই সংকটে পড়তে হতো না।
লেখক:, আশরাফুজ জামান বাবু, শিক্ষক- দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা, ঝিকরগাছা, যশোর।
বার্তা/এন

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।