বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

পরচুলা তৈরি করে ভাগ্যবদল আড়াই শতাধিক নারীর

পরচুলা তৈরি করে ভাগ্যবদল করেছেন পাবনার আড়াই শতাধিক নারী। তাদের এই পণ্য রপ্তানি হচ্ছে চীন, জাপান, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে। জেলার সাঁথিয়া উপজেলার কাশিনাথপুর, টাংবাড়ি ও বেড়া উপজেলার রাকশা, চকপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামে পরচুলা বানানোর কারখানা রয়েছে। কারখানাগুলোতে স্কুল-কলেজের ছাত্রীসহ আড়াই শতাধিক নারী এ কাজে জড়িত। দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখছেন তারা।

সরেজমিন রাকশা গ্রামে সোহেল রানা ও চকপাড়ার রহিমা খাতুনের পরচুলার কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে, দুটি ঘরে স্থানীয় শতাধিক নারী ও স্কুল-কলেজের ছাত্রীরা গভীর মনোযোগে পরচুলা তৈরি করছেন। পরচুলা তৈরি করে প্রতি মাসে প্রত্যেকে ৮-১০ হাজার টাকা আয় করছেন বলে জানান।

সোহেলের কারখানার কারিগর সোহানা খাতুন বলেন, ‘প্রায় দুই বছর ধরে আমি এ কাজ করি। সোহেল ভাই কারখানা দেওয়ার পর এখান থেকে কাজ শিখে মাসে ১০-১২ হাজার টাকা আয় করছি। আমার মতো অনেকে পরচুলা তৈরি করে সচ্ছলতা এনেছেন তাদের পরিবারে।’

মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি পরচুলা বানাতে সময় লাগে দুই থেকে তিন দিন। একজন মাসে ৮ থেকে ১০টি টুপি বানাতে পারেন। এতে প্রকারভেদে ৫০০ থেকে ১৩০০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়। প্রতিটি টুপিতে ২০ থেকে ৫০ গ্রাম পর্যন্ত চুল লাগে। টুপি তৈরিতে লাগে মাথার ডামি, চুল, নেট, সুচ, সুতা, চক ও পিন। প্রতিটি টেবিলে স্ক্রুর সাহায্যে আটকানো আছে প্লাস্টিকের ডামি মাথা। ডামি মাথার ওপর রয়েছে নেট। নেটের ফাঁকে ফাঁকে সুচের ফোঁড়ে খুব মনোযোগ দিয়ে আটকানো হচ্ছে একেকটি চুল। ডামির পুরো মাথায় সূক্ষ্মভাবে চুল আটকানো হয়। প্রতিটি টেবিলে মুখোমুখি হয়ে চার থেকে ছয়জন কারিগর কাজ করছেন। অনেকেই আবার বাড়িতে বসে কাজ করেন। মনোযোগ আর দৃষ্টিনন্দন শৈল্পিক ভাবনা থেকে তৈরি হচ্ছে মনোরম চুলটুপি। এসব পণ্য চলে যায় ঢাকার বড় বড় কোম্পানিতে। সেখান থেকে যায় দেশের বাইরে।

রহিমা খাতুনের কারিগর অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী রেশমা আক্তার বলে, ‘পড়ালেখার পাশাপাশি রহিমা আপার কারখানায় কাজ করি। স্কুল থেকে ফিরে প্রতিদিন বিকালে তিন-চার ঘণ্টা কাজ করি। একটা কাজ শেষ করতে দুই-তিন দিন সময় লাগে। স্কুল ছুটি থাকলে এক-দেড় দিনেই একটা কাজ শেষ করতে পারি। একটা কাজের মজুরি হিসেবে ১ হাজার ২০০ টাকা পাই। এখানে যারা কাজ করেন, তাদের বেশিরভাগই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। তারা পড়ালেখার পাশাপাশি অর্থ উপার্জন করে নিজেদের স্কুল-কলেজের খরচ মিটিয়ে পরিবারকেও সহায়তা করতে পারছে।’

গাজীপুরের এসএস হেয়ার উইগ বিডি কোম্পানির মালিক শাহ আলম জানান, তার কোম্পানি থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় পরচুলা তৈরির সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে পাবনার সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলাও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘কারিগররা পরচুলা তৈরি করে আমাদের কাছে পাঠায়। এরপর আমাদের কারখানায় সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে ফিডেক্স কুরিয়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন কুরিয়ারের মাধ্যমে বিমানযোগে দেশের বাইরে রপ্তানি করে থাকি। আমাদের দেশে পরচুলার বেশি চাহিদা না থাকলেও চীন, জাপান, ভারত, দুবাই, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের ২০-২৫টি দেশে রপ্তানি করে থাকি। খরচ বাদে আমার বছরে ৬-৭ লাখ টাকা আয় হয়। আমার চেয়ে বড় কোম্পানিগুলো আরও বেশি করে থাকে। বিভিন্ন নামের ও মানের পরচুলা রয়েছে, যেমন মিরাজ পরচুলা বিক্রি হয় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায়, মনো ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। সরকার আমাদের এ শিল্পের দিকে একটু সুদৃষ্টি দিলে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।’

পরচুলা তৈরিতে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন বেড়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রেবেকা সুলতানা। তিনি বলেন, তার উপজেলায় পরচুলার পাঁচটি কাখানায় স্কুল-কলেজের ছাত্রীসহ আড়াই শতাধিক নারী কাজ করছেন। তাদের হাতে তৈরি পরচুলা দেশ ছাড়াও রপ্তানি হচ্ছে দেশের বাইরে।

মৌলভীবাজারে প্রতিপক্ষের হামলার শিকার শিশু মিনহাজ বাদ পড়েনি 

পরচুলা তৈরি করে ভাগ্যবদল আড়াই শতাধিক নারীর

প্রকাশের সময় : ০৪:২৯:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৪

পরচুলা তৈরি করে ভাগ্যবদল করেছেন পাবনার আড়াই শতাধিক নারী। তাদের এই পণ্য রপ্তানি হচ্ছে চীন, জাপান, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে। জেলার সাঁথিয়া উপজেলার কাশিনাথপুর, টাংবাড়ি ও বেড়া উপজেলার রাকশা, চকপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামে পরচুলা বানানোর কারখানা রয়েছে। কারখানাগুলোতে স্কুল-কলেজের ছাত্রীসহ আড়াই শতাধিক নারী এ কাজে জড়িত। দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখছেন তারা।

সরেজমিন রাকশা গ্রামে সোহেল রানা ও চকপাড়ার রহিমা খাতুনের পরচুলার কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে, দুটি ঘরে স্থানীয় শতাধিক নারী ও স্কুল-কলেজের ছাত্রীরা গভীর মনোযোগে পরচুলা তৈরি করছেন। পরচুলা তৈরি করে প্রতি মাসে প্রত্যেকে ৮-১০ হাজার টাকা আয় করছেন বলে জানান।

সোহেলের কারখানার কারিগর সোহানা খাতুন বলেন, ‘প্রায় দুই বছর ধরে আমি এ কাজ করি। সোহেল ভাই কারখানা দেওয়ার পর এখান থেকে কাজ শিখে মাসে ১০-১২ হাজার টাকা আয় করছি। আমার মতো অনেকে পরচুলা তৈরি করে সচ্ছলতা এনেছেন তাদের পরিবারে।’

মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি পরচুলা বানাতে সময় লাগে দুই থেকে তিন দিন। একজন মাসে ৮ থেকে ১০টি টুপি বানাতে পারেন। এতে প্রকারভেদে ৫০০ থেকে ১৩০০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়। প্রতিটি টুপিতে ২০ থেকে ৫০ গ্রাম পর্যন্ত চুল লাগে। টুপি তৈরিতে লাগে মাথার ডামি, চুল, নেট, সুচ, সুতা, চক ও পিন। প্রতিটি টেবিলে স্ক্রুর সাহায্যে আটকানো আছে প্লাস্টিকের ডামি মাথা। ডামি মাথার ওপর রয়েছে নেট। নেটের ফাঁকে ফাঁকে সুচের ফোঁড়ে খুব মনোযোগ দিয়ে আটকানো হচ্ছে একেকটি চুল। ডামির পুরো মাথায় সূক্ষ্মভাবে চুল আটকানো হয়। প্রতিটি টেবিলে মুখোমুখি হয়ে চার থেকে ছয়জন কারিগর কাজ করছেন। অনেকেই আবার বাড়িতে বসে কাজ করেন। মনোযোগ আর দৃষ্টিনন্দন শৈল্পিক ভাবনা থেকে তৈরি হচ্ছে মনোরম চুলটুপি। এসব পণ্য চলে যায় ঢাকার বড় বড় কোম্পানিতে। সেখান থেকে যায় দেশের বাইরে।

রহিমা খাতুনের কারিগর অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী রেশমা আক্তার বলে, ‘পড়ালেখার পাশাপাশি রহিমা আপার কারখানায় কাজ করি। স্কুল থেকে ফিরে প্রতিদিন বিকালে তিন-চার ঘণ্টা কাজ করি। একটা কাজ শেষ করতে দুই-তিন দিন সময় লাগে। স্কুল ছুটি থাকলে এক-দেড় দিনেই একটা কাজ শেষ করতে পারি। একটা কাজের মজুরি হিসেবে ১ হাজার ২০০ টাকা পাই। এখানে যারা কাজ করেন, তাদের বেশিরভাগই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। তারা পড়ালেখার পাশাপাশি অর্থ উপার্জন করে নিজেদের স্কুল-কলেজের খরচ মিটিয়ে পরিবারকেও সহায়তা করতে পারছে।’

গাজীপুরের এসএস হেয়ার উইগ বিডি কোম্পানির মালিক শাহ আলম জানান, তার কোম্পানি থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় পরচুলা তৈরির সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে পাবনার সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলাও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘কারিগররা পরচুলা তৈরি করে আমাদের কাছে পাঠায়। এরপর আমাদের কারখানায় সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে ফিডেক্স কুরিয়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন কুরিয়ারের মাধ্যমে বিমানযোগে দেশের বাইরে রপ্তানি করে থাকি। আমাদের দেশে পরচুলার বেশি চাহিদা না থাকলেও চীন, জাপান, ভারত, দুবাই, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের ২০-২৫টি দেশে রপ্তানি করে থাকি। খরচ বাদে আমার বছরে ৬-৭ লাখ টাকা আয় হয়। আমার চেয়ে বড় কোম্পানিগুলো আরও বেশি করে থাকে। বিভিন্ন নামের ও মানের পরচুলা রয়েছে, যেমন মিরাজ পরচুলা বিক্রি হয় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায়, মনো ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। সরকার আমাদের এ শিল্পের দিকে একটু সুদৃষ্টি দিলে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।’

পরচুলা তৈরিতে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন বেড়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রেবেকা সুলতানা। তিনি বলেন, তার উপজেলায় পরচুলার পাঁচটি কাখানায় স্কুল-কলেজের ছাত্রীসহ আড়াই শতাধিক নারী কাজ করছেন। তাদের হাতে তৈরি পরচুলা দেশ ছাড়াও রপ্তানি হচ্ছে দেশের বাইরে।