বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৫ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বাঙালির মনের ক্ষোভ-অসন্তোষ একাত্তরের মার্চে রূপ নিয়েছিল

আওয়ামী লীগের সেই বিপুল বিজয়ে বাঙালি জাতি যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল করলেন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান। ৩ মার্চের পূর্বনির্ধারিত ওই অধিবেশন শুরু হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে তা বাতিল করায় সঙ্গে সঙ্গেই উত্তাল হয়ে উঠেছিল বাংলার জনপদ।

তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ২ মার্চ তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে উত্তোলন করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অকুতোভয় ছাত্রসমাজ ও জনতা সেদিন জানিয়ে দিয়েছিল বাঙালি কারও কাছে মাথা নত করবে না। কারফিউ ভেঙে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়।

সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে বটতলায় লাল-সবুজ পতাকা প্রথম উড়িয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) তখনকার সহসভাপতির নেতৃত্বে ছাত্রনেতারা। সেই পতাকা নিয়ে পরে রাজপথে মিছিল করে ছাত্র-জনতা। বঙ্গবন্ধু সেদিন এক বিবৃতিতে জনগণের প্রতি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকেও কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘বাংলার কণ্ঠ স্তব্ধ করা যাইবে না।’

পরদিন ঢাকার সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতায় চোখ বুলালেই এখনো টের পাওয়া যায় কেমন ছিল একাত্তরের ২ মার্চের চিত্র। দৈনিক ইত্তেফাকে ৩ মার্চ ব্যানার হেডলাইন ছিল ‘বিক্ষুব্ধ নগরীর ভয়াল গর্জন’। শিরোনামের নিচে পাঁচ কলামজুড়ে ছবি ছিল ঢাকার রাজপথে আগের দিনের ছাত্র-জনতার বিশাল বিক্ষোভ মিছিলের। ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল ‘মঙ্গলবারের ঢাকা নগরীর রাজপথে ছাত্র-শ্রমিক ও সরকারী-বেসরকারী চাকুরিয়াদের বিক্ষোভ মিছিল’। ছবির বাঁ দিকে ওপরে ছিল ‘আমি শেখ মুজিব বলছি—’ এবং এর নিচে ছিল ‘বাংলার কণ্ঠ স্তব্ধ করা যাইবে নাঃ শান্তি-শৃংখলার মধ্য দিয়া আন্দোলন চালাইয়া যান—জনগণের প্রতি প্রত্যয়-দৃঢ়-কণ্ঠ শেখ মুজিবের আহ্বান’।

ছবির নিচে শিরোনাম ছিল ‘দিনের ঢাকায় হরতালঃ রাত্রির রাজধানীতে কারফিউ ভঙ্গঃ ৬ই পর্যন্ত সারা প্রদেশে হরতাল’। প্রধান শিরোনামের নিচে বাঁ পাশে ছাপা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ছবি। ‘আমি শেখ মুজিব বলছি’ শিরোনামের খবরে ছিল তাঁর আহ্বান। ২ মার্চ এক বিবৃতিতে জনগণের উদ্দেশে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালন করার সেই আহ্বান তিনি জানিয়েছিলেন।

বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের এই মহানায়ক মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক, যে ভাষাতেই কথা বলুক, বাংলার প্রত্যেক বাসিন্দাই আমাদের দৃষ্টিতে বাঙালি। তাদের জান-মাল-ইজ্জত আমাদের কাছে পবিত্র আমানত এবং সেগুলো অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।’ ঢাকায় নিরস্ত্র জনগণের ওপর গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আওয়ামী লীগপ্রধান বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে আগুন জ্বালাবেন না। যদি জ্বালান, সেই দাবানল থেকে আপনারাও রেহাই পাবেন না।’

এখানে বলা দরকার, সেনাবাহিনীর গুলির মুখেই ২ মার্চ কারফিউ ভেঙেছিল ছাত্র-জনতা। ডিআইটি অ্যাভিনিউ মোড়, মর্নিং-নিউজ পত্রিকা অফিসের সামনে রাত সাড়ে ৯টায় জনতার ওপর গুলি চালায় সামরিক বাহিনী। বিপুলসংখ্যক মানুষ কারফিউ ভেঙে গভর্নর হাউসের দিকে এগিয়ে গেলে সেখানেও গুলি চালানো হয়। এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ ভঙ্গকারীদের ওপর বেপরোয়া গুলি চলে।

আগের দিন ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের ৩ মার্চের পূর্বনির্ধারিত অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করায় এর প্রতিবাদে ২ মার্চ পল্টনে বিশাল জনসভা করেছিল ন্যাপ। ৩ মার্চ সংবাদ-এ সেই খবর ফলাও করে প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্র-জনতার বিরাট সমাবেশের খবরও ছিল।

দৈনিক পূর্বদেশ ৩ মার্চ প্রথম পাতায় যেসব শিরোনাম করেছিল তার মধ্যে অন্যতম ‘দিনে রাতে মিছিল আর মিছিল এবং বিক্ষুব্ধ পূর্ব বাংলা’।

দৈনিক পাকিস্তানে আট কলামজুড়ে প্রধান শিরোনাম ছিল ‘বঙ্গবন্ধুর ডাক’। বঙ্গবন্ধুর ২ মার্চের বিবৃতিটি পরদিন প্রকাশ করেছিল লাহোর থেকে প্রকাশিত পাকিস্তান টাইমসও। এর শিরোনাম ছিল ‘Mujib Strongly Condemns Firing: Bangladesh Cannot Be Suppressed As Colony Any More’।

একাত্তরের ২ মার্চ লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলার বীজ বোনা হয়েছিল। সেদিন বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা স্লোগান দিয়েছিল—‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’।

একাত্তরের ২ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের প্রতি সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন—
‘১. ৩রা মার্চ থেকে ৬ই মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সমগ্র প্রদেশে হরতাল পালন করুন।
২. ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল। এই দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করতে হবে।
৩. রেডিও, টেলিভশন ও সংবাদপত্রে আমাদের কর্মতৎপরতার বিবরণী বা আমাদের বিবৃতি প্রকাশ করতে দেওয়া না হলে এসব প্রতিষ্ঠানের বাঙালি কর্মচারীদের বাংলাদেশের ৭ কোটি মানুষের কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা নাকচ করে দিতে হবে।
৪. আগামী ৭ই মার্চ বিকাল ২টায় রেসকোর্স ময়দানে আমি এক গণসমাবেশে ভাষণদান করবো। সেখানে আমি পরবর্তী নির্দেশ প্রদান করবো।
৫. সংগ্রাম সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে চালাতে হবে। উচ্ছৃঙ্খলতা আমাদের আন্দোলনের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করবে এবং গণবিরোধী শক্তি ও তাদের ভাড়াটিয়া চরদেরই স্বার্থোদ্ধার করবে।’

তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ২ মার্চ তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে উত্তোলন করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অকুতোভয় ছাত্রসমাজ ও জনতা সেদিন জানিয়ে দিয়েছিল বাঙালি কারও কাছে মাথা নত করবে না।

কারফিউ ভেঙে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে বটতলায় লাল-সবুজ পতাকা প্রথম উড়িয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) তখনকার সহসভাপতির নেতৃত্বে ছাত্রনেতারা। সেই পতাকা নিয়ে পরে রাজপথে মিছিল করে ছাত্র-জনতা। বঙ্গবন্ধু সেদিন এক বিবৃতিতে জনগণের প্রতি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকেও কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘বাংলার কণ্ঠ
স্তব্ধ করা যাইবে না।’

পরদিন ঢাকার সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতায় চোখ বুলালেই এখনো টের পাওয়া যায় কেমন ছিল একাত্তরের ২ মার্চের চিত্র। দৈনিক ইত্তেফাকে ৩ মার্চ ব্যানার হেডলাইন ছিল ‘বিক্ষুব্ধ নগরীর ভয়াল গর্জন’। শিরোনামের নিচে পাঁচ কলামজুড়ে ছবি ছিল ঢাকার রাজপথে আগের দিনের ছাত্র-জনতার বিশাল বিক্ষোভ মিছিলের। ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল ‘মঙ্গলবারের ঢাকা নগরীর রাজপথে ছাত্র-শ্রমিক ও সরকারী-বেসরকারী চাকুরিয়াদের বিক্ষোভ মিছিল’। ছবির বাঁ দিকে ওপরে ছিল ‘আমি শেখ মুজিব বলছি—’ এবং এর নিচে ছিল ‘বাংলার কণ্ঠ স্তব্ধ করা যাইবে নাঃ শান্তি-শৃংখলার মধ্য দিয়া আন্দোলন চালাইয়া যান—জনগণের প্রতি প্রত্যয়-দৃঢ়-কণ্ঠ শেখ মুজিবের আহ্বান’।

ছবির নিচে শিরোনাম ছিল ‘দিনের ঢাকায় হরতালঃ রাত্রির রাজধানীতে কারফিউ ভঙ্গঃ ৬ই পর্যন্ত সারা প্রদেশে হরতাল’। প্রধান শিরোনামের নিচে বাঁ পাশে ছাপা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ছবি। ‘আমি শেখ মুজিব বলছি’ শিরোনামের খবরে ছিল তাঁর আহ্বান। ২ মার্চ এক বিবৃতিতে জনগণের উদ্দেশে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালন করার সেই আহ্বান তিনি জানিয়েছিলেন।

বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের এই মহানায়ক মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক, যে ভাষাতেই কথা বলুক, বাংলার প্রত্যেক বাসিন্দাই আমাদের দৃষ্টিতে বাঙালি। তাদের জান-মাল-ইজ্জত আমাদের কাছে পবিত্র আমানত এবং সেগুলো অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।’ ঢাকায় নিরস্ত্র জনগণের ওপর গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আওয়ামী লীগপ্রধান বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে আগুন জ্বালাবেন না। যদি জ্বালান, সেই দাবানল থেকে আপনারাও রেহাই পাবেন না।’

এখানে বলা দরকার, সেনাবাহিনীর গুলির মুখেই ২ মার্চ কারফিউ ভেঙেছিল ছাত্র-জনতা। ডিআইটি অ্যাভিনিউ মোড়, মর্নিং-নিউজ পত্রিকা অফিসের সামনে রাত সাড়ে ৯টায় জনতার ওপর গুলি চালায় সামরিক বাহিনী। বিপুলসংখ্যক মানুষ কারফিউ ভেঙে গভর্নর হাউসের দিকে এগিয়ে গেলে সেখানেও গুলি চালানো হয়। এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ ভঙ্গকারীদের ওপর বেপরোয়া গুলি চলে।

আগের দিন ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের ৩ মার্চের পূর্বনির্ধারিত অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করায় এর প্রতিবাদে ২ মার্চ পল্টনে বিশাল জনসভা করেছিল ন্যাপ। ৩ মার্চ সংবাদ-এ সেই খবর ফলাও করে প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্র-জনতার বিরাট সমাবেশের খবরও ছিল।

দৈনিক পূর্বদেশ ৩ মার্চ প্রথম পাতায় যেসব শিরোনাম করেছিল তার মধ্যে অন্যতম ‘দিনে রাতে মিছিল আর মিছিল এবং বিক্ষুব্ধ পূর্ব বাংলা’।

দৈনিক পাকিস্তানে আট কলামজুড়ে প্রধান শিরোনাম ছিল ‘বঙ্গবন্ধুর ডাক’। বঙ্গবন্ধুর ২ মার্চের বিবৃতিটি পরদিন প্রকাশ করেছিল লাহোর থেকে প্রকাশিত পাকিস্তান টাইমসও। এর শিরোনাম ছিল ‘Mujib Strongly Condemns Firing: Bangladesh Cannot Be Suppressed As Colony Any More’।

একাত্তরের ২ মার্চ লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলার বীজ বোনা হয়েছিল। সেদিন বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা স্লোগান দিয়েছিল—‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’।

একাত্তরের ২ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের প্রতি সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন—
‘১. ৩রা মার্চ থেকে ৬ই মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সমগ্র প্রদেশে হরতাল পালন করুন।
২. ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল। এই দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করতে হবে।
৩. রেডিও, টেলিভশন ও সংবাদপত্রে আমাদের কর্মতৎপরতার বিবরণী বা আমাদের বিবৃতি প্রকাশ করতে দেওয়া না হলে এসব প্রতিষ্ঠানের বাঙালি কর্মচারীদের বাংলাদেশের ৭ কোটি মানুষের কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা নাকচ করে দিতে হবে।
৪. আগামী ৭ই মার্চ বিকাল ২টায় রেসকোর্স ময়দানে আমি এক গণসমাবেশে ভাষণদান করবো। সেখানে আমি পরবর্তী নির্দেশ
প্রদান করবো।
৫. সংগ্রাম সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে চালাতে হবে। উচ্ছৃঙ্খলতা আমাদের আন্দোলনের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করবে এবং গণবিরোধী শক্তি ও তাদের ভাড়াটিয়া চরদেরই স্বার্থোদ্ধার করবে।’

বাঙালির মনের ক্ষোভ-অসন্তোষ একাত্তরের মার্চে রূপ নিয়েছিল

প্রকাশের সময় : ১০:১৮:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২ মার্চ ২০২৪

আওয়ামী লীগের সেই বিপুল বিজয়ে বাঙালি জাতি যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল করলেন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান। ৩ মার্চের পূর্বনির্ধারিত ওই অধিবেশন শুরু হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে তা বাতিল করায় সঙ্গে সঙ্গেই উত্তাল হয়ে উঠেছিল বাংলার জনপদ।

তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ২ মার্চ তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে উত্তোলন করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অকুতোভয় ছাত্রসমাজ ও জনতা সেদিন জানিয়ে দিয়েছিল বাঙালি কারও কাছে মাথা নত করবে না। কারফিউ ভেঙে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়।

সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে বটতলায় লাল-সবুজ পতাকা প্রথম উড়িয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) তখনকার সহসভাপতির নেতৃত্বে ছাত্রনেতারা। সেই পতাকা নিয়ে পরে রাজপথে মিছিল করে ছাত্র-জনতা। বঙ্গবন্ধু সেদিন এক বিবৃতিতে জনগণের প্রতি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকেও কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘বাংলার কণ্ঠ স্তব্ধ করা যাইবে না।’

পরদিন ঢাকার সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতায় চোখ বুলালেই এখনো টের পাওয়া যায় কেমন ছিল একাত্তরের ২ মার্চের চিত্র। দৈনিক ইত্তেফাকে ৩ মার্চ ব্যানার হেডলাইন ছিল ‘বিক্ষুব্ধ নগরীর ভয়াল গর্জন’। শিরোনামের নিচে পাঁচ কলামজুড়ে ছবি ছিল ঢাকার রাজপথে আগের দিনের ছাত্র-জনতার বিশাল বিক্ষোভ মিছিলের। ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল ‘মঙ্গলবারের ঢাকা নগরীর রাজপথে ছাত্র-শ্রমিক ও সরকারী-বেসরকারী চাকুরিয়াদের বিক্ষোভ মিছিল’। ছবির বাঁ দিকে ওপরে ছিল ‘আমি শেখ মুজিব বলছি—’ এবং এর নিচে ছিল ‘বাংলার কণ্ঠ স্তব্ধ করা যাইবে নাঃ শান্তি-শৃংখলার মধ্য দিয়া আন্দোলন চালাইয়া যান—জনগণের প্রতি প্রত্যয়-দৃঢ়-কণ্ঠ শেখ মুজিবের আহ্বান’।

ছবির নিচে শিরোনাম ছিল ‘দিনের ঢাকায় হরতালঃ রাত্রির রাজধানীতে কারফিউ ভঙ্গঃ ৬ই পর্যন্ত সারা প্রদেশে হরতাল’। প্রধান শিরোনামের নিচে বাঁ পাশে ছাপা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ছবি। ‘আমি শেখ মুজিব বলছি’ শিরোনামের খবরে ছিল তাঁর আহ্বান। ২ মার্চ এক বিবৃতিতে জনগণের উদ্দেশে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালন করার সেই আহ্বান তিনি জানিয়েছিলেন।

বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের এই মহানায়ক মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক, যে ভাষাতেই কথা বলুক, বাংলার প্রত্যেক বাসিন্দাই আমাদের দৃষ্টিতে বাঙালি। তাদের জান-মাল-ইজ্জত আমাদের কাছে পবিত্র আমানত এবং সেগুলো অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।’ ঢাকায় নিরস্ত্র জনগণের ওপর গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আওয়ামী লীগপ্রধান বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে আগুন জ্বালাবেন না। যদি জ্বালান, সেই দাবানল থেকে আপনারাও রেহাই পাবেন না।’

এখানে বলা দরকার, সেনাবাহিনীর গুলির মুখেই ২ মার্চ কারফিউ ভেঙেছিল ছাত্র-জনতা। ডিআইটি অ্যাভিনিউ মোড়, মর্নিং-নিউজ পত্রিকা অফিসের সামনে রাত সাড়ে ৯টায় জনতার ওপর গুলি চালায় সামরিক বাহিনী। বিপুলসংখ্যক মানুষ কারফিউ ভেঙে গভর্নর হাউসের দিকে এগিয়ে গেলে সেখানেও গুলি চালানো হয়। এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ ভঙ্গকারীদের ওপর বেপরোয়া গুলি চলে।

আগের দিন ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের ৩ মার্চের পূর্বনির্ধারিত অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করায় এর প্রতিবাদে ২ মার্চ পল্টনে বিশাল জনসভা করেছিল ন্যাপ। ৩ মার্চ সংবাদ-এ সেই খবর ফলাও করে প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্র-জনতার বিরাট সমাবেশের খবরও ছিল।

দৈনিক পূর্বদেশ ৩ মার্চ প্রথম পাতায় যেসব শিরোনাম করেছিল তার মধ্যে অন্যতম ‘দিনে রাতে মিছিল আর মিছিল এবং বিক্ষুব্ধ পূর্ব বাংলা’।

দৈনিক পাকিস্তানে আট কলামজুড়ে প্রধান শিরোনাম ছিল ‘বঙ্গবন্ধুর ডাক’। বঙ্গবন্ধুর ২ মার্চের বিবৃতিটি পরদিন প্রকাশ করেছিল লাহোর থেকে প্রকাশিত পাকিস্তান টাইমসও। এর শিরোনাম ছিল ‘Mujib Strongly Condemns Firing: Bangladesh Cannot Be Suppressed As Colony Any More’।

একাত্তরের ২ মার্চ লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলার বীজ বোনা হয়েছিল। সেদিন বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা স্লোগান দিয়েছিল—‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’।

একাত্তরের ২ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের প্রতি সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন—
‘১. ৩রা মার্চ থেকে ৬ই মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সমগ্র প্রদেশে হরতাল পালন করুন।
২. ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল। এই দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করতে হবে।
৩. রেডিও, টেলিভশন ও সংবাদপত্রে আমাদের কর্মতৎপরতার বিবরণী বা আমাদের বিবৃতি প্রকাশ করতে দেওয়া না হলে এসব প্রতিষ্ঠানের বাঙালি কর্মচারীদের বাংলাদেশের ৭ কোটি মানুষের কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা নাকচ করে দিতে হবে।
৪. আগামী ৭ই মার্চ বিকাল ২টায় রেসকোর্স ময়দানে আমি এক গণসমাবেশে ভাষণদান করবো। সেখানে আমি পরবর্তী নির্দেশ প্রদান করবো।
৫. সংগ্রাম সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে চালাতে হবে। উচ্ছৃঙ্খলতা আমাদের আন্দোলনের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করবে এবং গণবিরোধী শক্তি ও তাদের ভাড়াটিয়া চরদেরই স্বার্থোদ্ধার করবে।’

তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ২ মার্চ তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে উত্তোলন করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অকুতোভয় ছাত্রসমাজ ও জনতা সেদিন জানিয়ে দিয়েছিল বাঙালি কারও কাছে মাথা নত করবে না।

কারফিউ ভেঙে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে বটতলায় লাল-সবুজ পতাকা প্রথম উড়িয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) তখনকার সহসভাপতির নেতৃত্বে ছাত্রনেতারা। সেই পতাকা নিয়ে পরে রাজপথে মিছিল করে ছাত্র-জনতা। বঙ্গবন্ধু সেদিন এক বিবৃতিতে জনগণের প্রতি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকেও কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘বাংলার কণ্ঠ
স্তব্ধ করা যাইবে না।’

পরদিন ঢাকার সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতায় চোখ বুলালেই এখনো টের পাওয়া যায় কেমন ছিল একাত্তরের ২ মার্চের চিত্র। দৈনিক ইত্তেফাকে ৩ মার্চ ব্যানার হেডলাইন ছিল ‘বিক্ষুব্ধ নগরীর ভয়াল গর্জন’। শিরোনামের নিচে পাঁচ কলামজুড়ে ছবি ছিল ঢাকার রাজপথে আগের দিনের ছাত্র-জনতার বিশাল বিক্ষোভ মিছিলের। ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল ‘মঙ্গলবারের ঢাকা নগরীর রাজপথে ছাত্র-শ্রমিক ও সরকারী-বেসরকারী চাকুরিয়াদের বিক্ষোভ মিছিল’। ছবির বাঁ দিকে ওপরে ছিল ‘আমি শেখ মুজিব বলছি—’ এবং এর নিচে ছিল ‘বাংলার কণ্ঠ স্তব্ধ করা যাইবে নাঃ শান্তি-শৃংখলার মধ্য দিয়া আন্দোলন চালাইয়া যান—জনগণের প্রতি প্রত্যয়-দৃঢ়-কণ্ঠ শেখ মুজিবের আহ্বান’।

ছবির নিচে শিরোনাম ছিল ‘দিনের ঢাকায় হরতালঃ রাত্রির রাজধানীতে কারফিউ ভঙ্গঃ ৬ই পর্যন্ত সারা প্রদেশে হরতাল’। প্রধান শিরোনামের নিচে বাঁ পাশে ছাপা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ছবি। ‘আমি শেখ মুজিব বলছি’ শিরোনামের খবরে ছিল তাঁর আহ্বান। ২ মার্চ এক বিবৃতিতে জনগণের উদ্দেশে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালন করার সেই আহ্বান তিনি জানিয়েছিলেন।

বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের এই মহানায়ক মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক, যে ভাষাতেই কথা বলুক, বাংলার প্রত্যেক বাসিন্দাই আমাদের দৃষ্টিতে বাঙালি। তাদের জান-মাল-ইজ্জত আমাদের কাছে পবিত্র আমানত এবং সেগুলো অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।’ ঢাকায় নিরস্ত্র জনগণের ওপর গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আওয়ামী লীগপ্রধান বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে আগুন জ্বালাবেন না। যদি জ্বালান, সেই দাবানল থেকে আপনারাও রেহাই পাবেন না।’

এখানে বলা দরকার, সেনাবাহিনীর গুলির মুখেই ২ মার্চ কারফিউ ভেঙেছিল ছাত্র-জনতা। ডিআইটি অ্যাভিনিউ মোড়, মর্নিং-নিউজ পত্রিকা অফিসের সামনে রাত সাড়ে ৯টায় জনতার ওপর গুলি চালায় সামরিক বাহিনী। বিপুলসংখ্যক মানুষ কারফিউ ভেঙে গভর্নর হাউসের দিকে এগিয়ে গেলে সেখানেও গুলি চালানো হয়। এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ ভঙ্গকারীদের ওপর বেপরোয়া গুলি চলে।

আগের দিন ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের ৩ মার্চের পূর্বনির্ধারিত অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করায় এর প্রতিবাদে ২ মার্চ পল্টনে বিশাল জনসভা করেছিল ন্যাপ। ৩ মার্চ সংবাদ-এ সেই খবর ফলাও করে প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্র-জনতার বিরাট সমাবেশের খবরও ছিল।

দৈনিক পূর্বদেশ ৩ মার্চ প্রথম পাতায় যেসব শিরোনাম করেছিল তার মধ্যে অন্যতম ‘দিনে রাতে মিছিল আর মিছিল এবং বিক্ষুব্ধ পূর্ব বাংলা’।

দৈনিক পাকিস্তানে আট কলামজুড়ে প্রধান শিরোনাম ছিল ‘বঙ্গবন্ধুর ডাক’। বঙ্গবন্ধুর ২ মার্চের বিবৃতিটি পরদিন প্রকাশ করেছিল লাহোর থেকে প্রকাশিত পাকিস্তান টাইমসও। এর শিরোনাম ছিল ‘Mujib Strongly Condemns Firing: Bangladesh Cannot Be Suppressed As Colony Any More’।

একাত্তরের ২ মার্চ লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলার বীজ বোনা হয়েছিল। সেদিন বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা স্লোগান দিয়েছিল—‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’।

একাত্তরের ২ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের প্রতি সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন—
‘১. ৩রা মার্চ থেকে ৬ই মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সমগ্র প্রদেশে হরতাল পালন করুন।
২. ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল। এই দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করতে হবে।
৩. রেডিও, টেলিভশন ও সংবাদপত্রে আমাদের কর্মতৎপরতার বিবরণী বা আমাদের বিবৃতি প্রকাশ করতে দেওয়া না হলে এসব প্রতিষ্ঠানের বাঙালি কর্মচারীদের বাংলাদেশের ৭ কোটি মানুষের কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা নাকচ করে দিতে হবে।
৪. আগামী ৭ই মার্চ বিকাল ২টায় রেসকোর্স ময়দানে আমি এক গণসমাবেশে ভাষণদান করবো। সেখানে আমি পরবর্তী নির্দেশ
প্রদান করবো।
৫. সংগ্রাম সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে চালাতে হবে। উচ্ছৃঙ্খলতা আমাদের আন্দোলনের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করবে এবং গণবিরোধী শক্তি ও তাদের ভাড়াটিয়া চরদেরই স্বার্থোদ্ধার করবে।’