বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

এসি রুমে বসে ধূমপান! কতটা ভয়ানক হতে পারে জানলে আঁতকে উঠবেন

ছবি-সংগৃহীত

গরমে এসি ছাড়া থাকা মুশকিল। বার বার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে সিগারেটে সুখটান দিতে গিয়ে গলদঘর্ম হতে হয়। তাই এসি চলাকালীনই ঘরে বসে ধূমপান করেন অনেকে। যে ঘরে এসি চলছে, সেই ঘরে কোনও রকমভাবে ধূমপান করা উচিত নয়। সেখান থেকে দু’ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমত, আগুনের ফুলকি ছুটে গিয়ে যে কোনও সময়ে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যের জন্যেও তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, একটি জ্বলন্ত সিগারেট থেকে প্রায় ১২ হাজার বিভিন্ন ধরনের রসায়নিক পদার্থ নির্গত হয়, যার কোনোটিই আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী নয়। বরং সবই ক্ষতিকর। তামাক পাতায় থাকে নিকোটিন, টার, ক্যাডমিয়াম, জৈব অ্যাসিড ও নাইট্রোজেন জাতীয় পদার্থ। এছাড়া সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকে মরণ বিষ কার্বন মনোক্সাইড ও ক্যানসার উদ্রেককারী নানারকম কার্সিনোজেন। যেমন-বেনজোপাইরিন, ডাইমিথাইল নাইট্রোসোমাইন, ডাই ইথাইন নাইট্রোসোমাইন, এন নাইট্রোসোনর নিকোটিন, নাইট্রোসোপাইরেলেডিন, কুইনলোন প্রভৃতি।

একখন্ড পরিচ্ছন্ন কাগজে মোড়ানো সিগারেট আকর্ষণীয় হলেও আসলে তা উগ্র নিকোটিনের বিষে ভরা। নিকোটিন এত মারাত্মক যে, দুটো সিগারেটে যে পরিমাণ নিকোটিন আছে, তা ইঞ্জেকশন দ্বারা কোনো সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করালে তার মৃত্যু অনিবার্য।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে ধূমপান করলে শরীর ঠান্ডা করার নিজস্ব যে ‘কুলিং প্রসেস’, তা নষ্ট হয়। ফলে সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে নির্গত তাপ শরীরের ভিতর থেকে যায়। তা হার্ট, মস্তিষ্ক,ফুসফুস এবং কিডনিতে প্রভাব ফেলে। ফলে ‘হিট স্ট্রোক’ সংক্রান্ত জটিলতা বেড়ে যেতে পারে। যাঁরা পরোক্ষ ভাবে সিগারেটের ধোঁয়া খাচ্ছেন, তাঁদের জন্যেও এই অভ্যাস একই রকম ভাবে মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। চিকিৎসকেরা বলছেন, অতিরিক্ত ধূমপান করলে এমনিতেই ফুসফুস, গলা এবং মুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। হার্টের সমস্যা থাকলে তা আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

এসি চলাকালীন বদ্ধ ঘরের মধ্যে ধূমপান করলে সেই ধোঁয়া শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করার যন্ত্রের মাধ্যমে নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যেই আবর্তিত হতে থাকে। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সিগারেটের ধোঁয়া যেমন শরীরে প্রবেশ করে, তেমন ঘরের অশুদ্ধ বায়ুও ফুসফুসে যায়। ফলে শ্বাসযন্ত্রের ক্ষতির পরিমাণও বৃদ্ধি পেতে পারে।

এছাড়া বদ্ধ ঘর বা গাড়ির মধ্যে ধূমপান করলে, সেই বাতাসে মিশে যায় ধূমপানের ফলে তৈরি হওয়া নানা রাসায়নিক। যা বাতাসে ভেসে থাকা ধূলিকণা, দূষিত পদার্থের সঙ্গে বিক্রিয়া করে আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ধরুন, কেউ ঘরে বসে ধূমপান করে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। সেই ঘরে পরবর্তী সময়ে অন্য কেউ ঢুকলে, তিনি হয়তো খালি চোখে ধোঁয়া দেখতে পান না, কিন্তু ধূমপানের ফলে তৈরি হওয়া ক্ষতিকারক রাসায়নিক তাঁর শরীরে ঢুকতে থাকে। ঘরের দেওয়াল, কার্পেট, সোফা, মেঝে, আসবাবপত্রের উপর নিকোটিনের আস্তরণ তৈরি হয়। বাতাসে অন্যান্য দূষিত কণার সঙ্গে মিশে গিয়ে সেই নিকোটিনের আস্তরণ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে শরীরের উপর। একেই বলা হচ্ছে তৃতীয় স্তরের ধূমপান।

পরোক্ষ ধূমপানের সময়ে নিজে ধূমপান না করলেও অন্যের ধূমপানের ধোঁয়া মানুষের শরীরে ঢোকে। ধূমপায়ীর যা যা ক্ষতি হয়, পরোক্ষ ধূমপানেও তার সমপরিমাণ ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু তৃতীয় স্তরের ধূমপানে ক্ষতি বেশি হতে পারে। এমনই আশঙ্কার কথা বলছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ ধূমপানের ধোঁয়ার চাইতে বিক্রিয়ার ফলে তৈরি হওয়া ভাসমান কণাগুলো আরও ক্ষতিকারক বলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা। তৃতীয় স্তরের ধূমপান ক্যানসার, হৃদ্‌রোগের মতো অসুখের আশঙ্কা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

চিকিৎসকদের পরামর্শ, বাড়িতে শিশু, অন্তঃসত্ত্বা মহিলা বা ধূমপায়ী নন এমন সদস্য থাকলে, যে সব ঘরে তাদের যাতায়াত, সেখানে ধূমপান করবেন না। খোলা জায়গায় ধূমপান করুন। তাদের বিপদের আশঙ্কা আরও বেশি। হাঁপানি, কানের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

যখন কেউ এসি ঘরে ধূমপান করছেন, ঘরের অন্যান্য লোকেরা দ্বিতীয় হাতের ধোঁয়াতে আক্রান্ত হন। ধোঁয়ায় থাকা রাসায়নিক যৌগগুলো ফুসফুসের ক্যানসার এবং অন্যান্য রোগের কারণ হতে পারে। সেই হিসাবে, এসি ঘরে ধূমপান নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

এসি কোনও ঘরে দৃশ্যমান ধোঁয়া অপসারণ করতে পারে তবে সিগারেটের ধোঁয়া থেকে এটি বেশিরভাগ ক্ষতিকারক কণাকে ফিল্টার করতে সক্ষম হয় না। এই কণা বা রাসায়নিকগুলো শ্বাসকষ্টের সময় আমাদের দেহের ক্ষতি করে কক্ষটি আবদ্ধ থাকায় ধূমপায়ী ঘরের মধ্যে আরও ধূমপান ছড়িয়ে দেওয়ার সাথে সাথে এই ক্ষতিকারক রাসায়নিক বা কণাগুলির ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। এর অর্থ ঘরের অভ্যন্তরের লোকেরা আরও বেশি করে রাসায়নিক এবং কণাগুলি নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। ক্ষতিকারক রাসায়নিক এবং কণার পাশাপাশি সিগারেটের ধোঁয়া থেকে আসা গন্ধগুলো আপনার আসবাব, কার্পেট, দেয়াল ইত্যাদির পৃষ্ঠের বাইরেও প্রবেশ করবে। গন্ধটি সহজেই মুছে যাবে না। ফলে মাথা-ব্যাথা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ঠাণ্ডা এবং এলার্জি জনিত রোগ হতে পারে।

এসি রুমে বসে ধূমপান! কতটা ভয়ানক হতে পারে জানলে আঁতকে উঠবেন

প্রকাশের সময় : ১০:৩২:১২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ জুন ২০২৪

গরমে এসি ছাড়া থাকা মুশকিল। বার বার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে সিগারেটে সুখটান দিতে গিয়ে গলদঘর্ম হতে হয়। তাই এসি চলাকালীনই ঘরে বসে ধূমপান করেন অনেকে। যে ঘরে এসি চলছে, সেই ঘরে কোনও রকমভাবে ধূমপান করা উচিত নয়। সেখান থেকে দু’ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমত, আগুনের ফুলকি ছুটে গিয়ে যে কোনও সময়ে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যের জন্যেও তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, একটি জ্বলন্ত সিগারেট থেকে প্রায় ১২ হাজার বিভিন্ন ধরনের রসায়নিক পদার্থ নির্গত হয়, যার কোনোটিই আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী নয়। বরং সবই ক্ষতিকর। তামাক পাতায় থাকে নিকোটিন, টার, ক্যাডমিয়াম, জৈব অ্যাসিড ও নাইট্রোজেন জাতীয় পদার্থ। এছাড়া সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকে মরণ বিষ কার্বন মনোক্সাইড ও ক্যানসার উদ্রেককারী নানারকম কার্সিনোজেন। যেমন-বেনজোপাইরিন, ডাইমিথাইল নাইট্রোসোমাইন, ডাই ইথাইন নাইট্রোসোমাইন, এন নাইট্রোসোনর নিকোটিন, নাইট্রোসোপাইরেলেডিন, কুইনলোন প্রভৃতি।

একখন্ড পরিচ্ছন্ন কাগজে মোড়ানো সিগারেট আকর্ষণীয় হলেও আসলে তা উগ্র নিকোটিনের বিষে ভরা। নিকোটিন এত মারাত্মক যে, দুটো সিগারেটে যে পরিমাণ নিকোটিন আছে, তা ইঞ্জেকশন দ্বারা কোনো সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করালে তার মৃত্যু অনিবার্য।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে ধূমপান করলে শরীর ঠান্ডা করার নিজস্ব যে ‘কুলিং প্রসেস’, তা নষ্ট হয়। ফলে সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে নির্গত তাপ শরীরের ভিতর থেকে যায়। তা হার্ট, মস্তিষ্ক,ফুসফুস এবং কিডনিতে প্রভাব ফেলে। ফলে ‘হিট স্ট্রোক’ সংক্রান্ত জটিলতা বেড়ে যেতে পারে। যাঁরা পরোক্ষ ভাবে সিগারেটের ধোঁয়া খাচ্ছেন, তাঁদের জন্যেও এই অভ্যাস একই রকম ভাবে মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। চিকিৎসকেরা বলছেন, অতিরিক্ত ধূমপান করলে এমনিতেই ফুসফুস, গলা এবং মুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। হার্টের সমস্যা থাকলে তা আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

এসি চলাকালীন বদ্ধ ঘরের মধ্যে ধূমপান করলে সেই ধোঁয়া শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করার যন্ত্রের মাধ্যমে নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যেই আবর্তিত হতে থাকে। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সিগারেটের ধোঁয়া যেমন শরীরে প্রবেশ করে, তেমন ঘরের অশুদ্ধ বায়ুও ফুসফুসে যায়। ফলে শ্বাসযন্ত্রের ক্ষতির পরিমাণও বৃদ্ধি পেতে পারে।

এছাড়া বদ্ধ ঘর বা গাড়ির মধ্যে ধূমপান করলে, সেই বাতাসে মিশে যায় ধূমপানের ফলে তৈরি হওয়া নানা রাসায়নিক। যা বাতাসে ভেসে থাকা ধূলিকণা, দূষিত পদার্থের সঙ্গে বিক্রিয়া করে আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ধরুন, কেউ ঘরে বসে ধূমপান করে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। সেই ঘরে পরবর্তী সময়ে অন্য কেউ ঢুকলে, তিনি হয়তো খালি চোখে ধোঁয়া দেখতে পান না, কিন্তু ধূমপানের ফলে তৈরি হওয়া ক্ষতিকারক রাসায়নিক তাঁর শরীরে ঢুকতে থাকে। ঘরের দেওয়াল, কার্পেট, সোফা, মেঝে, আসবাবপত্রের উপর নিকোটিনের আস্তরণ তৈরি হয়। বাতাসে অন্যান্য দূষিত কণার সঙ্গে মিশে গিয়ে সেই নিকোটিনের আস্তরণ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে শরীরের উপর। একেই বলা হচ্ছে তৃতীয় স্তরের ধূমপান।

পরোক্ষ ধূমপানের সময়ে নিজে ধূমপান না করলেও অন্যের ধূমপানের ধোঁয়া মানুষের শরীরে ঢোকে। ধূমপায়ীর যা যা ক্ষতি হয়, পরোক্ষ ধূমপানেও তার সমপরিমাণ ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু তৃতীয় স্তরের ধূমপানে ক্ষতি বেশি হতে পারে। এমনই আশঙ্কার কথা বলছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ ধূমপানের ধোঁয়ার চাইতে বিক্রিয়ার ফলে তৈরি হওয়া ভাসমান কণাগুলো আরও ক্ষতিকারক বলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা। তৃতীয় স্তরের ধূমপান ক্যানসার, হৃদ্‌রোগের মতো অসুখের আশঙ্কা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

চিকিৎসকদের পরামর্শ, বাড়িতে শিশু, অন্তঃসত্ত্বা মহিলা বা ধূমপায়ী নন এমন সদস্য থাকলে, যে সব ঘরে তাদের যাতায়াত, সেখানে ধূমপান করবেন না। খোলা জায়গায় ধূমপান করুন। তাদের বিপদের আশঙ্কা আরও বেশি। হাঁপানি, কানের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

যখন কেউ এসি ঘরে ধূমপান করছেন, ঘরের অন্যান্য লোকেরা দ্বিতীয় হাতের ধোঁয়াতে আক্রান্ত হন। ধোঁয়ায় থাকা রাসায়নিক যৌগগুলো ফুসফুসের ক্যানসার এবং অন্যান্য রোগের কারণ হতে পারে। সেই হিসাবে, এসি ঘরে ধূমপান নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

এসি কোনও ঘরে দৃশ্যমান ধোঁয়া অপসারণ করতে পারে তবে সিগারেটের ধোঁয়া থেকে এটি বেশিরভাগ ক্ষতিকারক কণাকে ফিল্টার করতে সক্ষম হয় না। এই কণা বা রাসায়নিকগুলো শ্বাসকষ্টের সময় আমাদের দেহের ক্ষতি করে কক্ষটি আবদ্ধ থাকায় ধূমপায়ী ঘরের মধ্যে আরও ধূমপান ছড়িয়ে দেওয়ার সাথে সাথে এই ক্ষতিকারক রাসায়নিক বা কণাগুলির ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। এর অর্থ ঘরের অভ্যন্তরের লোকেরা আরও বেশি করে রাসায়নিক এবং কণাগুলি নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। ক্ষতিকারক রাসায়নিক এবং কণার পাশাপাশি সিগারেটের ধোঁয়া থেকে আসা গন্ধগুলো আপনার আসবাব, কার্পেট, দেয়াল ইত্যাদির পৃষ্ঠের বাইরেও প্রবেশ করবে। গন্ধটি সহজেই মুছে যাবে না। ফলে মাথা-ব্যাথা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ঠাণ্ডা এবং এলার্জি জনিত রোগ হতে পারে।