বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংক খাত চরম ঝুঁকিতে-ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংক খাত চরম ঝুঁকিতে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। সোমবার (১০ জুন) সম্পাদক পরিষদ ও সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) যৌথভাবে আয়োজনে ‘অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৪-২৫’ শীর্ষক এ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে নোয়াব এবং সম্পাদক পরিষদের শীর্ষ নেতা ও বিশিষ্টজনেরা অংশগ্রহণ করেন। 

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরো বলেন, ‘বর্তমানে আর্থিক খাত সবচেয়ে অরক্ষিত অবস্থায় আছে। অথচ এ খাতটি অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল খাত। প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং ক্ষমতা চর্চার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন অনুগত স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে ব্যাংক থেকে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যার সঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতি সম্পৃক্ত। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ে, বিনিয়োগের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সৎ উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হন। তাই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হলে আর্থিক খাতসহ কিছু সংবেদনশীল খাতকে ক্ষমতার রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে।’

অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে প্রস্তাবিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটকে যূপকাষ্ঠে বাঁধা বলির পশুর সঙ্গে তুলনা করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘দীনতার সংস্কৃতি, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ এখন বোঝা। এ পরিস্থিতির মধ্যে এক হিসেবে বললে বলা যাবে বাস্তবসম্মত। এ ছাড়া আর উপায় নেই। অন্যভাবে বললে প্রস্তাবিত বাজেট হাত-পা বাঁধা, যূপকাষ্ঠে বাঁধা বলির পাঠা।’

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপির নিম্নতম হার বাংলাদেশে। এ রাজস্ব দিয়ে বাজেটের ন্যূনতম আকার পূরণ করা সম্ভব নয়। আবার মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক ঋণের ভারসাম্যে এটিকে বিবেচনা করা হয়, তাহলে ঘাটতি সীমিত রাখতে হবে। যার ফলে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন ব্যয় সামাল দেওয়া ছাড়াও থাকছে ভর্তুকির বোঝা। যা আমাদের কৃতকর্মের ফল।’

প্রস্তাবিত বাজেট বিবেচনাপ্রসূত হয়নি উল্লেখ করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়নি, যদিও দেশে অনেক দিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। কর নীতি দেখে মনে হয়, বাঘের হরিণ শিকার করার নীতিতে চলছে রাজস্ব ব্যবস্থা। অর্থাৎ ছোট ও ক্ষমতাহীনদের চাপে রাখা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার।’

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, সাবেক অর্থসচিব ও সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। স্বাগত বক্তব্য দেন নোয়াবের সভাপতি এ. কে. আজাদ এমপি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী বাজেটে তিন পক্ষের আশার প্রতিফলন দেখিয়েছেন। তবে জনকল্যাণে তেমন কিছু নেই। আইএমএফ, দ্বিতীয় অলিগার্ক তথা সরকারের আশ্রয়–প্রশ্রয়ে যারা ফুলেফেঁপে উঠেছে এবং আমলাতন্ত্র। তবে শোনা হয়নি পরিশ্রমি উদ্যোক্তা এবং অর্থনৈতিক কর্মী তথা সাধারণ মানুষের কথা।’

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতৃত্ব গতবছর পর্যন্ত অর্থনৈতিক সঙ্কট স্বীকারই করেননি। ধাক্কা খাওয়ার পর এখন কিছুটা সমস্যার কথা বলছেন। বেশিরভাগ দেশ যখন সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে আমরা নয়–ছয় সীমা আরোপ করেছি। দুর্নীতি এখন প্রাতিষ্ঠানিক রুপ নিয়েছে। সার্বিক নৈতিকতার ব্যাপক অধপতন হয়েছে। নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে না পারলে সঙ্কট আরও গভীর হবে। পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রশাসনিক সংস্কার, ব্যাংকিং কমিশন গঠন ও অর্থনীতিবদের নিয়ে প্রবৃদ্ধির অর্জনের কৌশল নির্ধারণে পুনঃমূল্যায়ন করা যেতে পারে।’

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান  আরো বলেন,‘ দরিদ্রদের পাশাপাশি এখন নিন্মবিত্ত, মধ্যবিত্তরাও মূল্যস্ফীতি নিয়ে সঙ্কটে আছেন। বাজেটে বলা হয়েছে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। তবে এজন্য যে কর্মকৌশল লাগে সেটা কোথায়। কর্মসংস্থানের সঙ্কটে থাকা যুবকদের জন্য বাজেটে কি উদ্যোগ রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে সাধারণ মানুষের জন্য করমুক্ত আয় সীমা বাড়ানো হয়নি। আবার মোবাইলে কথা বলার ওপর, মটর সাইকেলে নতুন করে কর বাড়ানো হয়েছে। নৈতিকতার সঙ্কটও তৈরি হয়েছে। সৎ করদাতাদের সর্বোচ্চ স্তরের আয় কর দিাতে হবে ৩০ শতাংশ। অথচ কালো টাকার মালিকরা ১৫ শতাংশ দিয়ে সাদা করতে পারবেন। এটা সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করা’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আপনি ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেন, আর ফেরত দেবেন না। দেশে এখন এ মডেল চলছে। খেলাপি ঋণের এ মডেলই এখন দেশের বিজনেস মডেল।’

প্রস্তাবিত বাজেটে কোনো নতুনত্ব নেই- এমন মন্তব্য করে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাজেটটা দেওয়া হয়েছে চ্যালেঞ্জিং সময়ে। এতে কোনো নতুনত্ব দেখছি না। আগের বাজেটের অঙ্ক শুধু এদিক-সেদিক করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, সংকোচনমূলক বাজেট, অথচ বাজেটের ঘাটতি দেখে তা সংকোচনমূলক মনে হয় না।’

বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে এবং এতে বেসরকারি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘সরকার যদি বেশি ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাত ঋণ পাবে কীভাবে? আর বেসরকারি খাত ঋণ না পেলে কর্মসংস্থান হবে কীভাবে।’প্রস্তাবিত বাজেটের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তিনি মনে করেন।

পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সুদহারের নয়ছয়ের (ঋণের সুদ ৯ শতাংশ ও আমানতের সুদ ৬ শতাংশ) বেড়াজাল নীতি দিয়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা আমরা নিজেরাই সৃষ্টি করেছি। সমস্যা এক দিনে তৈরি হয়নি, তাই সমাধানও এক দিনে হবে না।’

তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি কমানো মুদ্রানীতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিষয়। মূল্যস্ফীতি কমানো বাজেটের বিষয় নয়, যদিও বাজেট সেখানে সহযোগী ভূমিকা পালন করতে পারে। গত বছরের তুলনায় এ বাজেট সংকোচনমুখী হয়েছে; এখন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি কার্যকর হলে মূল্যস্ফীতি কমবে।’

সমাপনী বক্তব্য দেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহফুজ আনাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।

অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংক খাত চরম ঝুঁকিতে-ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

প্রকাশের সময় : ০৯:৫১:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ জুন ২০২৪

অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংক খাত চরম ঝুঁকিতে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। সোমবার (১০ জুন) সম্পাদক পরিষদ ও সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) যৌথভাবে আয়োজনে ‘অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৪-২৫’ শীর্ষক এ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে নোয়াব এবং সম্পাদক পরিষদের শীর্ষ নেতা ও বিশিষ্টজনেরা অংশগ্রহণ করেন। 

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরো বলেন, ‘বর্তমানে আর্থিক খাত সবচেয়ে অরক্ষিত অবস্থায় আছে। অথচ এ খাতটি অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল খাত। প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং ক্ষমতা চর্চার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন অনুগত স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে ব্যাংক থেকে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যার সঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতি সম্পৃক্ত। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ে, বিনিয়োগের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সৎ উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হন। তাই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হলে আর্থিক খাতসহ কিছু সংবেদনশীল খাতকে ক্ষমতার রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে।’

অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে প্রস্তাবিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটকে যূপকাষ্ঠে বাঁধা বলির পশুর সঙ্গে তুলনা করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘দীনতার সংস্কৃতি, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ এখন বোঝা। এ পরিস্থিতির মধ্যে এক হিসেবে বললে বলা যাবে বাস্তবসম্মত। এ ছাড়া আর উপায় নেই। অন্যভাবে বললে প্রস্তাবিত বাজেট হাত-পা বাঁধা, যূপকাষ্ঠে বাঁধা বলির পাঠা।’

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপির নিম্নতম হার বাংলাদেশে। এ রাজস্ব দিয়ে বাজেটের ন্যূনতম আকার পূরণ করা সম্ভব নয়। আবার মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক ঋণের ভারসাম্যে এটিকে বিবেচনা করা হয়, তাহলে ঘাটতি সীমিত রাখতে হবে। যার ফলে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন ব্যয় সামাল দেওয়া ছাড়াও থাকছে ভর্তুকির বোঝা। যা আমাদের কৃতকর্মের ফল।’

প্রস্তাবিত বাজেট বিবেচনাপ্রসূত হয়নি উল্লেখ করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়নি, যদিও দেশে অনেক দিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। কর নীতি দেখে মনে হয়, বাঘের হরিণ শিকার করার নীতিতে চলছে রাজস্ব ব্যবস্থা। অর্থাৎ ছোট ও ক্ষমতাহীনদের চাপে রাখা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার।’

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, সাবেক অর্থসচিব ও সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। স্বাগত বক্তব্য দেন নোয়াবের সভাপতি এ. কে. আজাদ এমপি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী বাজেটে তিন পক্ষের আশার প্রতিফলন দেখিয়েছেন। তবে জনকল্যাণে তেমন কিছু নেই। আইএমএফ, দ্বিতীয় অলিগার্ক তথা সরকারের আশ্রয়–প্রশ্রয়ে যারা ফুলেফেঁপে উঠেছে এবং আমলাতন্ত্র। তবে শোনা হয়নি পরিশ্রমি উদ্যোক্তা এবং অর্থনৈতিক কর্মী তথা সাধারণ মানুষের কথা।’

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতৃত্ব গতবছর পর্যন্ত অর্থনৈতিক সঙ্কট স্বীকারই করেননি। ধাক্কা খাওয়ার পর এখন কিছুটা সমস্যার কথা বলছেন। বেশিরভাগ দেশ যখন সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে আমরা নয়–ছয় সীমা আরোপ করেছি। দুর্নীতি এখন প্রাতিষ্ঠানিক রুপ নিয়েছে। সার্বিক নৈতিকতার ব্যাপক অধপতন হয়েছে। নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে না পারলে সঙ্কট আরও গভীর হবে। পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রশাসনিক সংস্কার, ব্যাংকিং কমিশন গঠন ও অর্থনীতিবদের নিয়ে প্রবৃদ্ধির অর্জনের কৌশল নির্ধারণে পুনঃমূল্যায়ন করা যেতে পারে।’

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান  আরো বলেন,‘ দরিদ্রদের পাশাপাশি এখন নিন্মবিত্ত, মধ্যবিত্তরাও মূল্যস্ফীতি নিয়ে সঙ্কটে আছেন। বাজেটে বলা হয়েছে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। তবে এজন্য যে কর্মকৌশল লাগে সেটা কোথায়। কর্মসংস্থানের সঙ্কটে থাকা যুবকদের জন্য বাজেটে কি উদ্যোগ রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে সাধারণ মানুষের জন্য করমুক্ত আয় সীমা বাড়ানো হয়নি। আবার মোবাইলে কথা বলার ওপর, মটর সাইকেলে নতুন করে কর বাড়ানো হয়েছে। নৈতিকতার সঙ্কটও তৈরি হয়েছে। সৎ করদাতাদের সর্বোচ্চ স্তরের আয় কর দিাতে হবে ৩০ শতাংশ। অথচ কালো টাকার মালিকরা ১৫ শতাংশ দিয়ে সাদা করতে পারবেন। এটা সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করা’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আপনি ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেন, আর ফেরত দেবেন না। দেশে এখন এ মডেল চলছে। খেলাপি ঋণের এ মডেলই এখন দেশের বিজনেস মডেল।’

প্রস্তাবিত বাজেটে কোনো নতুনত্ব নেই- এমন মন্তব্য করে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাজেটটা দেওয়া হয়েছে চ্যালেঞ্জিং সময়ে। এতে কোনো নতুনত্ব দেখছি না। আগের বাজেটের অঙ্ক শুধু এদিক-সেদিক করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, সংকোচনমূলক বাজেট, অথচ বাজেটের ঘাটতি দেখে তা সংকোচনমূলক মনে হয় না।’

বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে এবং এতে বেসরকারি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘সরকার যদি বেশি ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাত ঋণ পাবে কীভাবে? আর বেসরকারি খাত ঋণ না পেলে কর্মসংস্থান হবে কীভাবে।’প্রস্তাবিত বাজেটের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তিনি মনে করেন।

পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সুদহারের নয়ছয়ের (ঋণের সুদ ৯ শতাংশ ও আমানতের সুদ ৬ শতাংশ) বেড়াজাল নীতি দিয়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা আমরা নিজেরাই সৃষ্টি করেছি। সমস্যা এক দিনে তৈরি হয়নি, তাই সমাধানও এক দিনে হবে না।’

তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি কমানো মুদ্রানীতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিষয়। মূল্যস্ফীতি কমানো বাজেটের বিষয় নয়, যদিও বাজেট সেখানে সহযোগী ভূমিকা পালন করতে পারে। গত বছরের তুলনায় এ বাজেট সংকোচনমুখী হয়েছে; এখন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি কার্যকর হলে মূল্যস্ফীতি কমবে।’

সমাপনী বক্তব্য দেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহফুজ আনাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।