বিদায় সবসময় বেদনার হলেও কখনো কখনো তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে। এমন এক বিদায় সংবর্ধনা পেয়েছেন রাজবাড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র দুই শিক্ষক। শেষ কর্মদিবসে সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে অবসরে গেলেন রাজবাড়ী সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মোঃ মোশারফ হোসেন ও সিনিয়র শিক্ষক শিফট ইনচার্জ (দিবা) প্রাণ কৃষ্ণ সাহা। প্রিয় শিক্ষকের বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা দিয়েছেন রাজকীয় সংর্বধনা।
রবিবার (১৭ই আগস্ট) বিকালে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ব্যতিক্রমী আয়োজনে শিক্ষার্থী, সহকর্মীদের ভালোবাসায় শিক্ষকতার শেষ কর্মদিবসে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে অবসরের যান প্রতিষ্ঠানটির ঐ দুই সিনিয়র শিক্ষক। এ দৃশ্য ছুঁয়ে যায় সবার হৃদয়।
জানা যায়, সিনিয়র শিক্ষক মোঃ মোশারফ হোসেন ও সিনিয়র শিক্ষক শিফট ইনচার্জ (দিবা) প্রাণ কৃষ্ণ সাহার বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে বিদ্যালয়ের আয়োজনে বিদায় ও সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। পরে বিদ্যালয় থেকে দুই শিক্ষককে ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে একটি পদযাত্রা বের হয়। পদযাত্রাটি শহরের কোর্ট চত্বর প্রদক্ষিণ করে বিদ্যালয়ে এসে শেষ করে। এসময় শিক্ষকদের ফুল ছিটিয়ে সম্মান জানানো হয় এবং স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ঘোড়ার গাড়ির পেছনে পায়ে হেঁটে শ্রদ্ধা পদযাত্রা করে। বিদায় ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মচারীসহ শিক্ষার্থীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এসময় বিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষার্থীরা বলেন, শিক্ষক সর্বচ্চ মর্যাদার অধিকারী। একজন শিক্ষক সমাজ বিনির্মাণে মূল ভূমিকা পালন করে। শিক্ষকের বিদায় অনুষ্ঠানে আমরা র্যালি করেছি, তাদের জন্য কিছু গিফটের আয়োজন করেছি, আলোচনা সভা ও সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল। শিক্ষক হিসেবে আমাদের কাছে বেশ প্রিয় ছিলেন। বাবার মতো আমাদের পড়িয়েছেন।
বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক (বিদায়ী) মোঃ মোশারফ হোসেন বলেন, শিক্ষাগুরুর মর্যাদা যেভাবে দেওয়া উচিত আজ আমি সেভাবেই পেয়েছি। আজকে যে ব্যতিক্রমী আয়োজন, বিদায়ীতে কষ্ট হলেও এই আয়োজনে অনেক ভালো লাগছে। বাকি জিবনের কথায় তিনি বলেন, ক্লাস নিয়া যে আনন্দ, জ্ঞানের যে বিস্তরণ ঘটানো সেটা থেকে বঞ্চিত হব। ছাত্ররা আমাদের সম্পদ, ওরা আমাদের সন্তান তুল্য। ওদের যে স্নেহ ভালবাসা দিয়ে আগলে রেখেছিলাম সেই স্নেহ ভালবাসা এত কাছ থেকে তো আর দিতে পারব না। আমার ২৭ বছর এই স্কুলের সাথে রয়েছে। এই ইস্কুলের প্রতিটা ইট, প্রতিটা কাঠ, গাছপালা সবার সাথে একটি সম্পর্ক রয়েছে। এই ২৭ বছরের সম্পর্ক আজ বিছিন্ন হতে চলেছে। আজ খুব মনোবেদনায় আছি। ১২ টায় স্কুলে আসতে হবে, এসে দিবা শাখায় ক্লাস নিতে হবে নিতে হবে। সেই যে একটা প্রেরণা ছিল, সেই প্রেরণা এখন আর আমাকে জাগাবে না। এটি হচ্ছে একটি দুঃখের জায়গা। ওদের মুখটা প্রতিদিন দেখতাম, ওদের সাথে কথা হতো, ভাব বিনিময় হতো, গল্প হতো বিভিন্ন পাঠ্য বিষয় নিয়ে কথা হতো , বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা হতো, ওদের মুখ থেকে কিছু কথা শুনতাম, আমরা কিছু বলতাম এই যে পারস্পারিক মতবিনিময় সেটার সুযোগ তো এখন আর থাকলো না।
বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক( বিদায়ী) প্রাণ কৃষ্ণ সাহা বলেন, শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। আমি ৩০বছর ৯মাস ১৬দিন এই বিদ্যালয়ে চাকুরী করেছি। সেই যাইগাটিতে আমি দেখেছি সব শিক্ষক সফলতা পাই না। আবার সব শিক্ষক ব্যর্থতা হয় তাও না। আমি বলতে চাই আগামী দিনে যে শিক্ষক এই প্রতিষ্ঠানে আসবে, তাদেরকে এই বিদ্যালয়কে ভালবাসতে হবে। ছাত্রদেরকে ভালোবাসবেন, এই ক্যাম্পাসকে মুখরিত করে রাখবেন, তাহলে বিদ্যালয়ের মান মর্যাদা ঠিক থাকবে। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যারা বেরিয়েছে তারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত।
রাজবাড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, বিদায় বড় কষ্টের, তবুও মানতে হবে। আমাকে এভাবে একদিন বিদায় নিতে হবে। একজন শিক্ষকের বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে তাকে সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে রাজকীয়ভাবে তাদের বিদায় জানানো হয়েছে। আমার শিক্ষকরা অনেক ভালো মনের মানুষ। তারা আমার এ প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনে সর্বত্র সহযোগিতা করেছেন। সেজন্য তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।