প্রিন্ট এর তারিখঃ জানুয়ারী ১৪, ২০২৬, ৯:৪৫ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ অগাস্ট ৩০, ২০২৫, ৪:২১ পি.এম

মক্কার বুকে তখনো ইসলামের সোনালি সূর্যের আলো উদিত হয়নি। চারপাশে বিস্তৃত মরুর বালুকাবেলায় বাণিজ্যের কোলাহল, কাবার ছায়াতলে বসবাসরত অসংখ্য অভিজাত, রাজপুরুষ ও ব্যবসায়ী,কেউই তখনো আঁচ করতে পারেনি, ইতিহাসের বুকে এক নতুন অধ্যায় রচিত হতে চলেছে।
মানুষের সেই ভিড়ে ছিলেন এক যুবক,মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ। তাঁর হৃদয় ছিল নির্মল, চরিত্র ছিল নিখুঁত, আর মুখে সদা জ্বলজ্বল করত সততার আলো। মক্কার প্রতিটি পথ, প্রতিটি বাজার, প্রতিটি হৃদয় তার সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততার সাক্ষ্য দিত। তাই তো মক্কার মানুষ তাঁকে স্নেহভরে ডাকত আল-আমিন।
কিন্তু সেই শান্ত, স্নিগ্ধ জীবনের এক অবিস্মরণীয় মোড় এলো তখন, যখন মক্কার অন্যতম ধনাঢ্য, জ্ঞানী ও গুণবতী নারী খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রা. তাঁর হাতে তুলে দিলেন নিজের বাণিজ্য কাফেলার নেতৃত্ব। এটি ছিল না শুধু একটি ব্যবসায়িক সফর; বরং এটি ছিল দুটি অনন্য আত্মার প্রথম সাক্ষাৎ, যা ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন ভোরের সূচনা করে দিল।
এই সফরের সাথেই শুরু হয়েছিল এমন এক সম্পর্কের গল্প, যা শুধু ভালোবাসা নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও আত্মিক সৌন্দর্যের এক অনন্য সমন্বয়। ইতিহাসের পাতা সাক্ষী হয়ে রইল সেই প্রথম সাক্ষাৎ, যা পরবর্তী কালে নবুওয়তের আলোর পথে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
খাদিজা রা. মক্কার শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী নারী
খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রা. ছিলেন কুরাইশের সম্ভ্রান্ত ও প্রজ্ঞাবান নারী। বুদ্ধিমত্তা, সততা, উদারতা এবং নেতৃত্বগুণের জন্য তিনি তাহিরা (পবিত্রা) উপাধি লাভ করেছিলেন। তাঁর বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য মক্কার বাণিজ্যে বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছিল। তিনি নিজে কাফেলায় অংশগ্রহণ করতেন না; বরং বিশ্বস্ত লোকদের মাধ্যমে তাঁর পণ্য দূরদূরান্তের বাজারে পাঠাতেন।
ইবনু সাদ বর্ণনা করেছেন, খাদিজার কাফেলা ছিল মক্কার মধ্যে সবচেয়ে বড় ও সমৃদ্ধ। কুরাইশদের মধ্যে তাঁর সম্মান, ধনসম্পদ ও প্রজ্ঞার তুলনা ছিল না। (তাবাকাতুল কুবরা: ১/ ১৩০)
যুবক মুহাম্মাদ, সততার উজ্জ্বল নক্ষত্র
যুবক মুহাম্মাদ তখনো নবুয়তের দায়িত্ব পাননি। কিন্তু মক্কার প্রতিটি মানুষই জানত,তিনি সত্যবাদী, সৎ ও বিশ্বস্ত। মানুষ তাঁকে ডাকত আল-আমিন, কারণ তিনি কখনও মিথ্যা বলতেন না, প্রতারণা করতেন না, কারও হক নষ্ট করতেন না।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁর চরিত্রের প্রশংসা করে বলেছেন,
وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ আর নিশ্চয়ই আপনি (হে মুহাম্মাদ) মহৎ চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত। (সুরা কলম:68:4) এই সততা ও বিশ্বস্ততার খ্যাতি পৌঁছেছিল খাদিজা রা.-এর কানে।
প্রথম প্রস্তাব: খাদিজার আমন্ত্রণ
হজরত খাদিজা রা. তাঁর দাস মাইসারা-কে প্রেরণ করলেন যুবক মুহাম্মাদ- এর কাছে। তিনি প্রস্তাব দিলেন, তাঁর পণ্য নিয়ে সিরিয়ার বুসরা বাজারে সফরে যাবেন। লাভের ভাগ অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ দেওয়া হবে।
ইবনু হিশাম বর্ণনা করেন, খাদিজা নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন একটি প্রস্তাব দিলেন, যেখানে তাঁর সততা ও দক্ষতা বিবেচনায় অন্যদের চেয়ে দ্বিগুণ লাভের অংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। (সিরাতু ইবনি হিশাম: ১/ ১৮৬) রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রস্তাব গ্রহণ করেন, এবং এভাবেই শুরু হয় সেই ঐতিহাসিক সফর।
বাণিজ্য কাফেলার যাত্রা
সিরিয়ার পথে বেরিয়ে পড়ল খাদিজার কাফেলা। রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর সঙ্গে ছিলেন দাস মাইসারা। এই যাত্রা শুধু বাণিজ্যের ছিল না; বরং ইতিহাসের জন্য এটি ছিল এক নতুন মোড়।
মাইসারার বিস্ময়
মাইসারা পরে খাদিজাকে জানালেন, আমি নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ভেতরে এমন সততা, ধৈর্য ও বিনয় দেখেছি, যা আগে কখনও দেখিনি। তিনি কখনও প্রতারণা করেননি, কখনও মিথ্যা বলেননি। ব্যবসায় তিনি সর্বদা ন্যায্য আচরণ করেছেন। (সিরাতু ইবনি হিশাম: ১/ ১৮৮) তিনি আরেকটি অলৌকিক ঘটনা লক্ষ্য করেন। তীব্র রোদের মাঝে যাত্রাপথে দুটি সাদা মেঘ সারাক্ষণ নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাথার ওপরে ছায়া দিচ্ছিল। এই দৃশ্য মাইসারাকে অভিভূত করেছিল।
প্রথম সাক্ষাৎ ও গভীর শ্রদ্ধা
কাফেলা ফিরে এলে খাদিজা রা.রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর সততা, বিশ্বস্ততা ও বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হন। মাইসারার বর্ণনা শুনে তাঁর অন্তরে এক নতুন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও বিশ্বাস জন্ম নেয়। এই সাক্ষাতেই খাদিজা বুঝলেন,এই যুবক সাধারণ মানুষ নন, বরং মহান চরিত্রের অধিকারী।
বিয়ের প্রস্তাব: এক অনন্য সূচনা
খাদিজা রা. তাঁর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নাফিসা-কে পাঠালেন নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে। নাফিসা নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করলেন, যদি খাদিজা রা.আপনাকে বিবাহ করতে চান, আপনি কি সম্মত হবেন? নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাচাদের সাথে পরামর্শ করেন এবং পরে প্রস্তাব গ্রহণ করেন। এভাবেই শুরু হয় এক অনন্য দাম্পত্য জীবন, যা ইসলামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
খাদিজার বাণিজ্য কাফেলা ও প্রথম সাক্ষাতের এই ঘটনা ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সততা, বিশ্বস্ততা ও অনন্য চরিত্র শুধুমাত্র মক্কার নয়, সমগ্র মানবতার জন্য এক আলোকবর্তিকা। তাঁর এই সফর শুধু অর্থনৈতিক সফলতার গল্প নয়, বরং এক দাম্পত্য, এক স্বপ্ন, এক ইতিহাসের সূচনা। وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ আর নিশ্চয়ই আপনি (হে মুহাম্মাদ) মহান চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত। (সুরা কলম: ৪) ---সময় সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মহসিন মিলন
সম্পাদকীয় পরিষদ
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: নুরুজ্জামান লিটন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: রোকনুজ্জামান রিপন, নির্বাহী সম্পাদক: আব্দুল লতিফ, যুগ্ন নির্বাহী সম্পাদক: আলহাজ্ব মতিয়ার রহমান, সহকারী সম্পাদক: সাজ্জাদুল ইসলাম সৌরভ, মামুন বাবু, বার্তা সম্পাদক: নজরুল ইসলাম
সম্পাদকীয় কার্যালয়
বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়: গাজীপুর আবাসিক এলাকা, বেনাপোল, যশোর। ইমেইল: mohsin.milon@gmail.com, bartakontho@gmail.com ফোন: ৭৫২৮৯, ৭৫৬৯৫ মোবা: ০১৭১১৮২০৩৯৪
All Rights Reserved © Barta Kontho