
নুরুজ্জামান লিটন ।।
এটা শরৎকাল। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা থাকবে…রোদ্দুরে চাঁপা ফুলের রং লাগবে…হাওয়া উঠবে শিশিরে শিরশিরিয়ে…অথচ সব অনুষঙ্গ উধাও। বাস্তবে কেবল মেঘ আর বৃষ্টি। উপমহাদেশ জুড়েই। বিহারে বন্যা। করাচিতে প্রবল বৃষ্টির কারণে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে পরিত্যক্ত। ২৪ সেপ্টেম্বর মিরপুরে ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের ফাইনাল ভেসে গেছে প্রবল বৃষ্টিতে। ফলে বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তানকে যৌথভাবে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়। আফগানদের বিপক্ষে কিছু দিন আগে হওয়া চট্টগ্রাম টেস্টটাও বৃষ্টির কারণে ভেসে যেতে বসেছিল। উপমহাদেশের বাইরেও একই অবস্থা। ইংল্যান্ডে জুন-জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের কয়েকটি ম্যাচ বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হয়। সে সময় মজা করে কেউ কেউ লিখছিলেন, ‘কোনো দল বা তারকা নয়, এবার বিশ্বকাপে বেশি সময় ব্যাট করেছে বৃষ্টি।’ এরপর অ্যাশেজ সিরিজেও বৃষ্টি বিঘ্ন ঘটিয়েছে। মোট কথা অকাল বৃষ্টিতে বারবার থমকে যাচ্ছে ক্রিকেট। আর কে না জানে অকাল বৃষ্টির আসল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন।
সারা পৃথিবীতেই জলবায়ু পরিবর্তন এখন ইস্যু। সদ্য শেষ হওয়া জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রাষ্ট্রনেতাদের বক্তব্যেও বারবার উঠে এসেছে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জের’ ফলে আসন্ন বিপদের কথা। সারা পৃথিবীই যখন বিপদের সম্মুখীন তখন ক্রিকেট কি আর বাইরে থাকতে পারে। তাই ‘জলবাযূ পরিবর্তনের’ ফলে ক্রিকেটও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইয়ান চ্যাপেলের মতো কেউ কেউ বলছেন জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল থেকে ক্রিকেটকে সুরক্ষিত করার জন্য সুচিন্তিত ভাবনার সময় এসে গেছে। সাবেক এই অধিনায়কের চ্যাপেলের মতে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে টেস্ট’। ক্রিকইনফেতে প্রকাশিত নিজের নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘টেস্ট ক্রিকেটকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে দুটি জিনিসÑ একটা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট। অন্যটা অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তন। আমাদের চোখের সামনেই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট কীভাবে ক্রিকেটের প্রাচীনতম সংস্করণে প্রভাবিত করছে তা বোঝা সম্ভব। এখন টেস্ট দেখতে মাঠে দর্শক আসে না। উপমহাদেশে দর্শক অনুপস্থির সংকট আরও গভীর। অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের মাঠগুলোতে তবু দর্শক হয়। উপমহাদেশে প্রায় কিছু হয় না। দর্শক না এলে ক্রিকেটের প্রাচীনতম সংস্করণকে বাঁচিয়ে রাখা সত্যিকার অর্থেই চ্যালেঞ্জিং। তাছাড়া টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ব্যাটসম্যানদের মানসিকতাই পাল্টে দিয়েছে। উইকেটে টিকে থাকার ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে তারা। স্টিভেন স্মিথ, বিরাট কোহলি, জো রুট, শেন উইলিয়ামসনরা অবশ্য ব্যতিক্রম। বাকিরা টি-টোয়েন্টির মার-মার-কাট-কাট টাইপের চটুল মানসিকতায় আক্রান্ত। তবে এটা অভিযোজনের সংকট। একসময় মিটে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রিকেটের আকাশে যে আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়ে আসছে তা কিন্তু সহসা কাটবে বলে মনে হয় না। কেমন সেই আশঙ্কার মেঘ? ইয়ান চ্যাপেল লিখেছেন, ‘বৃষ্টির কারণে ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ার চেয়ে হতাশার কিছু হতে পারে না, কিন্তু কল্পনা করুন প্রচ- সূর্যতাপের কারণে ক্রিকেটাররা মাঠে ফিল্ডিং করতে পারছেন না, এটা কি আরও মারাত্মক নয়। তাছাড়া প্রচন্ড তাপে সানস্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। স্কিন ক্যানসার হতে পারে।’
পরিবেশকে উপেক্ষা করে লাগামহীন শিল্পোন্নয়ন পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। কীভাবে ক্রিকেট পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেবে তা নিয়ে ভেবেছে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা আইসিসি। শুরু হয়েছে গোলাপি বলের দিবা-নিশি টেস্ট ক্রিকেট। কিন্তু রাতে টেস্ট ক্রিকেট হলেও বৃষ্টির কারণে খেলা বিঘœ হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। এখন যেহেতু সারা বছর ক্রিকেট হয়। তাই বৃষ্টির উপদ্রব থেকে ক্রিকেটকে বাঁচানোর জন্য বিকল্প ভাবনা জরুরি। কারণ এখন কেবল বর্ষাকালেই বৃষ্টি হয় না, শরৎ-হেমন্তে-শীতেও তার আনাগোনা লেগেই থাকে। আবহাওয়াবিদদের দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে ভারতে এবার সেপ্টেম্বর মাসে গত ১০২ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। গ্রীষ্ম বা বর্ষাকালে অতিরিক্ত ঝড়-বৃষ্টি এবং তাপপ্রবাহের কারণও একই।
যদি প্রশ্ন করা হয় জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কোন খেলা? অবশ্যই ক্রিকেট। ২০১৮ সালে ক্লাইমেট কোয়ালিশনে গেম চেঞ্জার নামে একটি প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ‘বিশ্বের অন্য সব প্রধান খেলাগুলোর চেয়ে ক্রিকেট জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বারা বেশি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ অতএব সময় থাকতেই আইসিসির সাবধান হওয়া উচিত। যদিও ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ রোধে নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের বেশি কিছু করার নেই। এটা পুরোপুরি বিশ্ব নেতৃত্বের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তবে ক্রিকেটকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে হলে আইসিসির কিছু একটা তো করতেই হবে। সেটা কী তা ভাবার এটাই প্রকৃষ্ট সময়।
নিজস্ব সংবাদদাতা 











































