শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শহীদ সাংবাদিক শামছুর রহমান হত্যা মামলার শেষ কোথায় ?

তানভীর মহসিন।। যশোরের শহীদ সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবল হত্যাকাণ্ডের পর ২১ বছর পার হলেও ঘাতকদের বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। গত ১৬ বছর ধরে আইনের মারপ্যাঁচে আটকে রয়েছে এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় ক্ষুব্ধ নিহতের পরিবার ও যশোরের সাংবাদিক সমাজ। যদিও সরকার চাইলেই এ হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব বলে মন্তব্য আইনজীবীদের। এরই মধ্যে দিয়ে আজ (১৬ জুলাই) নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের ২১তম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। প্রথিতযশা সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবল ২০০০ সালের ১৬ জুলাই রাতে জনকন্ঠ যশোর অফিসে কর্মরত অবস্থায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।

শামছুর রহমানের ২১তম হত্যাবার্ষিকী উপলক্ষে হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে বৃহস্পতিবার যশোরের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন (জেইউজে)। এছাড়াও জেইউজে দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে এবারও সংক্ষিপ্ত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কালো ব্যাজ ধারণ, শোক র‌্যালি ও শহীদের কবর শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন ও দোয়া প্রার্থনা।

দীর্ঘদিনেও চাঞ্চল্যকর এ মামলাটির বিচার না হওয়ায় নিহতের পরিবার ও সাংবাদিক সমাজে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর নিহতের পরিবার ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয় পুরনো বিতর্কিত তদন্ত বাতিলপূর্বক মামলাটি পুনঃতদন্তের।

শামছুর রহমান কেবলের ভাই সাজেদ রহমান বকুল তার ফেসবুক পেইজে লিখেছেন “সব অর্জনে আনন্দ আছে। দু’হাজার সালকে স্পর্শ করতে পারা আমার কাছে অর্জন। মৃত্যু যেখানে বার বার দরজায় উঁকি দিচ্ছে, সন্ত্রাসীদের উদ্যত সঙ্গীন যেখানে তাক করা, সেখানে বিংশ শতাব্দীকে অতিক্রম করা কি আমার জন্য পরম পাওয়া ?… এ প্রশ্নের জবাব আমার জানা নেই। কিন্তু আমার অনুভূতিতে কি শতাব্দীকে আলিঙ্গন করা, নতুন সূর্যোদয়কে প্রত্যক্ষ করা-এসবই যেন নিত্যদিনের ঘটনা। মহাকালের কাছে আমার অস্তিত্ব ধুলিকণার চেয়েও ক্ষুদ্র। যতক্ষন বেঁচে আছি, ততক্ষণই আমার অস্তিত্ব। হয়তো এই স্বার্থকতা আর স্বপ্ন মিলে মিশেই আগামী কালের জন্য অপেক্ষা।…..তাঁকে হত্যার আগে ডায়েরির পাতায় ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি এই কথা গুলো লিখে রেখে গিয়েছিলেন। ওপারে তুমি ভাল থাক ভাই। ২১ বছর বিচার পাইনি। তোমার কথা প্রতিক্ষণে স্মরণকরি।

আদালত সূত্র জানায়, ২০০০ সালের ১৬ জুলাই রাতে সাংবাদিক শামছুর রহমান খুন হবার পর ২০০১ সালে সিআইডি পুলিশ এই মামলায় ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। সেসময় বিগত চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর কয়েক আসামির আগ্রহে মামলার বর্ধিত তদন্ত করে শামছুর রহমানের ঘনিষ্ট বন্ধু সাংবাদিক নেতা ফারাজী আজমল হোসেনকে নতুন করে আসামি করা হয়।

একইসাথে মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে বাদ দিয়ে সাক্ষী করা হয় আসামিদের ঘনিষ্টজনদেরকে। এতে একদিকে মামলার বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়; অন্যদিকে দুর্বল হয়ে যায় চার্জশিট। এরপর বিতর্কিত ওই বর্ধিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর ২০০৫ সালের জুন মাসে যশোরের স্পেশাল জজ আদালতে এই মামলার চার্জ গঠন হয়। ওই বছরের জুলাই মাসে বাদীর মতামত ছাড়াই মামলাটি খুলনার দ্রুত বিচার আদালতে স্থানান্তর করা হয়। এ অবস্থায় মামলার বাদী শহীদ শামছুর রহমানের সহধর্মিনী সেলিনা আকতার লাকি বিচারিক আদালত পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টে আপিল করেন।

আপিল আবেদনে তিনি বলেন, মামলার অন্যতম আসামি খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী হিরক পলাতক রয়েছে। হিরকসহ সংশ্লিষ্ট মামলার অন্যান্য আসামিদের সাথে খুলনার সন্ত্রাসীদের সখ্যতা রয়েছে। ফলে তার (বাদী’র) পক্ষে খুলনায় গিয়ে সাক্ষী দেয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বাদীর এই আপিল আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মামলাটি কেন যশোরে ফিরিয়ে দেয়া হবে না তার জন্য সরকারের উপর রুলনিশি জারী করেন। এরপর মামলায় বর্ধিত তদন্তে সংযুক্ত আসামি ফারাজী আজমল হোসেন উচ্চ আদালতে একটি রীট করেন। সেই রীটের নিষ্পত্তি না হওয়ায় মামলার সমস্ত কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।

নিহতের সহোদর ও যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন জেইউজে’র সাবেক সভাপতি সাজেদ রহমান জানান, একাধিক বার প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতকালে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে শামছুর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিটি গুরুত্বের সাথে তোলা হয়। এছাড়া তারা একই দাবিতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছেন। কিন্তু এ নিয়ে কোন অগ্রগতি হয়নি।

উচ্চ আদালতের নির্দেশের কারণে শামছুর রহমান হত্যা মামলার বিচারকাজ বন্ধ হয়ে আছে উল্লেখ করে যশোরের পাবলিক প্রসিকিউটর এম ইদ্রিস আলী জানান, তাদেরও প্রত্যাশা আপিলের দ্রæত নিষ্পত্তি হয়ে মামলার কার্যক্রম আবার শুরু হবে।

প্রসঙ্গত: এ মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৬ জনের মধ্যে খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী মুশফিকুর রহমান হিরক পুলিশের খাতায় পলাতক রয়েছে। আরেক আসামি খুলনার ওয়ার্ড কমিশনার আসাদুজ্জামান লিটু র‌্যাবের ক্রসফায়ারে, কোটচাঁদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন কালু হৃদরোগে এবং যশোর সদরের চুড়ামনকাটির আনারুল প্রতিপক্ষের হামলায় মারা গেছেন। বাকী আসামিরা জামিনে রয়েছেন।

জনপ্রিয়

কুষ্টিয়ায় হেযবুত তওহীদের জনসভা অনুষ্ঠিত

শহীদ সাংবাদিক শামছুর রহমান হত্যা মামলার শেষ কোথায় ?

প্রকাশের সময় : ০৬:৪৬:৪৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জুলাই ২০২১

তানভীর মহসিন।। যশোরের শহীদ সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবল হত্যাকাণ্ডের পর ২১ বছর পার হলেও ঘাতকদের বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। গত ১৬ বছর ধরে আইনের মারপ্যাঁচে আটকে রয়েছে এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় ক্ষুব্ধ নিহতের পরিবার ও যশোরের সাংবাদিক সমাজ। যদিও সরকার চাইলেই এ হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব বলে মন্তব্য আইনজীবীদের। এরই মধ্যে দিয়ে আজ (১৬ জুলাই) নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের ২১তম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। প্রথিতযশা সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবল ২০০০ সালের ১৬ জুলাই রাতে জনকন্ঠ যশোর অফিসে কর্মরত অবস্থায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।

শামছুর রহমানের ২১তম হত্যাবার্ষিকী উপলক্ষে হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে বৃহস্পতিবার যশোরের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন (জেইউজে)। এছাড়াও জেইউজে দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে এবারও সংক্ষিপ্ত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কালো ব্যাজ ধারণ, শোক র‌্যালি ও শহীদের কবর শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন ও দোয়া প্রার্থনা।

দীর্ঘদিনেও চাঞ্চল্যকর এ মামলাটির বিচার না হওয়ায় নিহতের পরিবার ও সাংবাদিক সমাজে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর নিহতের পরিবার ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয় পুরনো বিতর্কিত তদন্ত বাতিলপূর্বক মামলাটি পুনঃতদন্তের।

শামছুর রহমান কেবলের ভাই সাজেদ রহমান বকুল তার ফেসবুক পেইজে লিখেছেন “সব অর্জনে আনন্দ আছে। দু’হাজার সালকে স্পর্শ করতে পারা আমার কাছে অর্জন। মৃত্যু যেখানে বার বার দরজায় উঁকি দিচ্ছে, সন্ত্রাসীদের উদ্যত সঙ্গীন যেখানে তাক করা, সেখানে বিংশ শতাব্দীকে অতিক্রম করা কি আমার জন্য পরম পাওয়া ?… এ প্রশ্নের জবাব আমার জানা নেই। কিন্তু আমার অনুভূতিতে কি শতাব্দীকে আলিঙ্গন করা, নতুন সূর্যোদয়কে প্রত্যক্ষ করা-এসবই যেন নিত্যদিনের ঘটনা। মহাকালের কাছে আমার অস্তিত্ব ধুলিকণার চেয়েও ক্ষুদ্র। যতক্ষন বেঁচে আছি, ততক্ষণই আমার অস্তিত্ব। হয়তো এই স্বার্থকতা আর স্বপ্ন মিলে মিশেই আগামী কালের জন্য অপেক্ষা।…..তাঁকে হত্যার আগে ডায়েরির পাতায় ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি এই কথা গুলো লিখে রেখে গিয়েছিলেন। ওপারে তুমি ভাল থাক ভাই। ২১ বছর বিচার পাইনি। তোমার কথা প্রতিক্ষণে স্মরণকরি।

আদালত সূত্র জানায়, ২০০০ সালের ১৬ জুলাই রাতে সাংবাদিক শামছুর রহমান খুন হবার পর ২০০১ সালে সিআইডি পুলিশ এই মামলায় ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। সেসময় বিগত চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর কয়েক আসামির আগ্রহে মামলার বর্ধিত তদন্ত করে শামছুর রহমানের ঘনিষ্ট বন্ধু সাংবাদিক নেতা ফারাজী আজমল হোসেনকে নতুন করে আসামি করা হয়।

একইসাথে মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে বাদ দিয়ে সাক্ষী করা হয় আসামিদের ঘনিষ্টজনদেরকে। এতে একদিকে মামলার বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়; অন্যদিকে দুর্বল হয়ে যায় চার্জশিট। এরপর বিতর্কিত ওই বর্ধিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর ২০০৫ সালের জুন মাসে যশোরের স্পেশাল জজ আদালতে এই মামলার চার্জ গঠন হয়। ওই বছরের জুলাই মাসে বাদীর মতামত ছাড়াই মামলাটি খুলনার দ্রুত বিচার আদালতে স্থানান্তর করা হয়। এ অবস্থায় মামলার বাদী শহীদ শামছুর রহমানের সহধর্মিনী সেলিনা আকতার লাকি বিচারিক আদালত পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টে আপিল করেন।

আপিল আবেদনে তিনি বলেন, মামলার অন্যতম আসামি খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী হিরক পলাতক রয়েছে। হিরকসহ সংশ্লিষ্ট মামলার অন্যান্য আসামিদের সাথে খুলনার সন্ত্রাসীদের সখ্যতা রয়েছে। ফলে তার (বাদী’র) পক্ষে খুলনায় গিয়ে সাক্ষী দেয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বাদীর এই আপিল আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মামলাটি কেন যশোরে ফিরিয়ে দেয়া হবে না তার জন্য সরকারের উপর রুলনিশি জারী করেন। এরপর মামলায় বর্ধিত তদন্তে সংযুক্ত আসামি ফারাজী আজমল হোসেন উচ্চ আদালতে একটি রীট করেন। সেই রীটের নিষ্পত্তি না হওয়ায় মামলার সমস্ত কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।

নিহতের সহোদর ও যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন জেইউজে’র সাবেক সভাপতি সাজেদ রহমান জানান, একাধিক বার প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতকালে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে শামছুর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিটি গুরুত্বের সাথে তোলা হয়। এছাড়া তারা একই দাবিতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছেন। কিন্তু এ নিয়ে কোন অগ্রগতি হয়নি।

উচ্চ আদালতের নির্দেশের কারণে শামছুর রহমান হত্যা মামলার বিচারকাজ বন্ধ হয়ে আছে উল্লেখ করে যশোরের পাবলিক প্রসিকিউটর এম ইদ্রিস আলী জানান, তাদেরও প্রত্যাশা আপিলের দ্রæত নিষ্পত্তি হয়ে মামলার কার্যক্রম আবার শুরু হবে।

প্রসঙ্গত: এ মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৬ জনের মধ্যে খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী মুশফিকুর রহমান হিরক পুলিশের খাতায় পলাতক রয়েছে। আরেক আসামি খুলনার ওয়ার্ড কমিশনার আসাদুজ্জামান লিটু র‌্যাবের ক্রসফায়ারে, কোটচাঁদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন কালু হৃদরোগে এবং যশোর সদরের চুড়ামনকাটির আনারুল প্রতিপক্ষের হামলায় মারা গেছেন। বাকী আসামিরা জামিনে রয়েছেন।