
আন্তর্জাতিক ডেস্ক।। আফগানিস্তানে তালেবানের তীব্র হামলার মুখে একের পর এক পতন হচ্ছে প্রাদেশিক রাজধানীর। এই পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ছেন দেশটির ভারপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী খালিদ পায়েন্দা।
এদিকে তালেবানের হামলা মোকাবিলায় দেশটিতে নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যমতে, ৯০ দিনের মধ্যেই তালেবানের হাতে পতন ঘটতে পারে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের।
অর্থমন্ত্রী খালিদ পায়েন্দা মঙ্গলবার টুইট করে তার পদত্যাগের কথা জানান। টুইট বার্তায় তিনি ব্যক্তিগত কারণের কথা উল্লেখ করেন। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিবেচনায় তিনি পদত্যাগ করেছেন। অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে তিনি দেশ ছাড়ছেন। তবে কোন দেশে যাচ্ছেন, তা জানা যায়নি।
এদিকে আজ বুধবার জেনারেল ওয়ালি মোহাম্মদ আহমদজাইকে সরিয়ে আফগানিস্তানের নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল হায়বাতুল্লাহ আলিজাইকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত জুন মাসে নিয়োগ পেয়েছিলেন তিনি।
আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি আজ বুধবার তালেবানবিরোধী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত মাজার-ই শরিফ সফর করেন। তিনি সরকারপন্থী যোদ্ধাদের নিয়ে সমাবেশের চেষ্টা করেন। সেখানে আবদুল রশিদ দোস্তুম ও তাজিক নেতা আতা মোহাম্মদ নূরের সঙ্গে শহর রক্ষা নিয়ে আলোচনা করেন। এই দুই নেতার নিজস্ব বাহিনী রয়েছে। মাজার-ই শরিফের অবস্থান উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান সীমান্তের কাছে। এ শহরটির পতন হলে পুরো উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে তালেবানের হাতে।
আফগানিস্তানের মোট ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে নয়টি প্রদেশের রাজধানীর দখল নিয়েছে তালেবান যোদ্ধারা। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, তালেবান যোদ্ধারা গজনী শহরে ঢুকে পড়েছে। সেখানে তীব্র লড়াই চলছে। আরেক প্রাদেশিক রাজধানী কুন্দুজে শত শত সরকারি সেনা তালেবানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। এর আগে শহরটি রক্ষায় তারা বিমানবন্দর এলাকায় লড়াই করছিলেন।
সরকারি সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, কুন্দুজ বিমানবন্দরে তাদের লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করা হচ্ছিল। তাদের আত্মসমর্পণ করা ছাড়া উপায় ছিল না।
ওই সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘পাল্টা লড়াইয়ের কোনো পথ ছিল না। আমার ইউনিটের ২০ সেনা, তিনটি সাঁজোয়া যান, চারটি পিকআপ ট্রাকসহ আত্মসমর্পণ করি। আমরা এখন ক্ষমার চিঠি পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। এক বড় লাইন লেগে গেছে।’
মাজার-ই-শরিফের পতন হলে তা কাবুল সরকারের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসতে পারে। এর মধ্য দিয়ে তালেবানের হাতে দেশটির পুরো উত্তরাঞ্চল চলে যাবে। এ অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই তালেবানবিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিল।
এদিকে, কান্দাহার ও হেলমান্দে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তীব্র লড়াই চলছে তালেবান যোদ্ধাদের। তালেবান বাহিনী আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলে দখল করা এলাকাগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও মজবুত করেছে। উত্তরাঞ্চলের বড় শহর মাজার-ই-শরিফের কাছাকাছি চলে এসেছে তারা। আফগানিস্তানে তালেবান বাহিনী বুধবার উত্তরাঞ্চলের বাদাখসান প্রদেশের রাজধানী ফাইজাবাদ দখলে নিয়েছে। সব মিলে মাত্র ছয় দিনে নয়টি প্রাদেশিক রাজধানী দখল করে নিল তালেবান।
গত ছয় দিনে ফাইজাবাদ, ফারাহ, পুল-ই-খুমরি, জারাঞ্জ ছাড়াও প্রাদেশিক রাজধানী কুন্দুজ, তাকহার, সার-ই-পল, তালুকান ও সেবারঘানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তালেবান।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে গণমাধ্যম জানিয়েছে, আফগানিস্তানের মোট ভূখণ্ডের ৬৫ শতাংশে তালেবান তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ১১টি প্রাদেশিক রাজধানীর পতন ঘটতে পারে যেকোনো সময়।
আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সেনাদের পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। এ পরিস্থিতিতে পশ্চিমা দেশগুলো-সমর্থিত প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির সরকারকে হটিয়ে আফগানিস্তানে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া তালেবান। লক্ষ্য অর্জনে সরকারি সেনাদের বিরুদ্ধে তালেবান তাদের অভিযান জোরদার করেছে। তারা একের পর এক এলাকা দখল করে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। যেকোনো মুহূর্তে রাজধানী কাবুলের পতন ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে তালেবান। এ কারণে দেশটিতে চলমান লড়াই-সংঘাত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।
আফগানিস্তানজুড়ে দুই পক্ষের লড়াই ও সহিংসতায় হাজারো বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। পরিস্থিতি এতটাই বিপজ্জনক যে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের নাগরিকদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। ভারত তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে আনতে উড়োজাহাজ পাঠিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের যে সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন, সে জন্য তার কোনো অনুশোচনা নেই। আফগান নেতাদের ঐক্যবদ্ধ ও দেশের জন্য লড়াই করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে চলমান সহিংসতায় গত মাসে এক হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
সূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি, এএফপি,
নিজস্ব সংবাদদাতা 




































