বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইউক্রেন যুদ্ধে আরো দৃঢ় হচ্ছে ইরান-রাশিয়া সম্পর্ক

ছবি-সংগৃহীত

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে ইতিমধ্যে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সেইসাথে খরা ও পানি স্বল্পতার মতো মারাত্মক সমস্যায় পড়েছে ইরান। ইরানের সবচেয়ে বড় আমদানি বাজার হলো রাশিয়া। দেশটি থেকে তারা ব্যাপক পরিমাণে খাদ্যশস্য কিনে থাকে। কার্যত বৈশ্বিক বাস্তবতায় ইরানের অর্থনীতি অনেকটাই রাশিয়ানির্ভর।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা থাকা অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। সে সময় আর্থিক নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত ইরানের পাশে দাঁড়ায়নি ইউরোপীয় ইউনিয়নও। রাশিয়া ও চীনই ইরানকে তখন টিকে থাকার রসদ জুগিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সমর্থন জানিয়ে ইরান তার প্রতিদান দিয়েছে। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ দুটির সম্পর্ক আরো দৃঢ় হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে ইউক্রেন যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই রাশিয়া, চীন মধ্য প্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ায় মার্কিন প্রভাব নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে জোর দিয়েছে। গত বছরের ২৭ মার্চ ইরান ও চীনের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তির আওতায় রয়েছে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে এ চুক্তির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পাকিস্তানে চীনের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে। এতে ইরান ও তুরস্ককে যুক্ত করেছে চীন। ফলে ওই অঞ্চলের অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির ভিন্ন সমীকরণ দাঁড়াচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার বাইরে আঞ্চলিক প্রভাব বলয় বিস্তারে ইরান, পাকিস্তান, তরস্ক, রাশিয়া, চীন- সবারই একে-অপরের সহযোগিতা জরুরি। এ কারণেই এ দেশগুলোকে নিয়ে নতুন এক জোট গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে, যার উদ্দেশ্য হবে- সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ায় জোটে আধিপত্য বাড়িয়ে মার্কিন প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা। দুই পরাশক্তি চীন-রাশিয়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে একমত হওয়ায় এ দেশগুলোর জোট গঠন এখন সময়ের বিষয় বলে মনে করা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ এ ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

গত মাসে ইরানের কৃষিমন্ত্রী মস্কোর সাথে একটি আমদানি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া থেকে দুই কোটি টন মৌলিক খাদ্যদ্রব্য আমদানি করবে ইরান। গত বছর তিন কোটি টন খাদ্যদ্রব্য আমদানি করেছে ইরান, যার আনুমানিক মূল্য এক হাজার ৯০০ কোটি ডলার। আমদানি করা খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে ছিল- গম, ভুট্টা, বার্লি, তৈলবীজ ও ভোজ্য তেল। দেশটির মোট আমদানির বড় অংশজুড়ে এই খাদ্যদ্রব্যগুলো রয়েছে। ইরানে গমের প্রধান সরবরাহকারী রাশিয়া। এছাড়া তুরস্ক, মিশরও রাশিয়ার পণ্য আমদানির ওপর নির্ভর করে।

বিদেশি বাজারে অতি নির্ভরতার বিষয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতল্লাহ আলী খামেনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘দেশকে অবশ্যই মৌলিক খাদ্যপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া উচিত। গম, বার্লি, ভুট্টা, পশুখাদ্য ও তৈলবীজ উৎপাদনে ইরানকে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে।’ তেহরান একইসাথে তেল ও পশুখাদ্যের বিষয়েও মস্কোর সাথে চুক্তির পরিকল্পনা করছে। এতে করে দুই দশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো মজবুত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী গমের দাম বাড়ার সাথে সাথে ইরান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। তাদের এ মৌলিক পণ্য আমদানি করতে হবে পাঁচ গুণ বেশি দামে। ফলে আমদানি প্রক্রিয়া ব্যাহত, অভ্যন্তরীণ মূল্য নাগালের বাইরে চলে যাওয়াসহ জনসাধারণের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। কাজেই ইরানের জন্য রাশিয়াসহ অন্য নির্ভরযোগ্য আমদানি উৎসগুলো সুরক্ষিত করা প্রয়োজন।

এ দিকে রাশিয়া ইরানের সাথে আমদানি বাণিজ্যে ডলার দূর করতে চায়। এটি ইরানের জন্য রাশিয়ার সাথে কৃষি বাণিজ্য শক্তিশালী করার সুযোগ। মার্কিন ও ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞার প্রভাব থেকে বাঁচতে ইরান ও রাশিয়া দুই দেশই একসাথে বাণিজ্য ও অর্থনীতি বিনিময়ে কাজ করছে।

তেহরান এখনো মৌলিক কৃষিপণ্য উৎপাদনের স্বপ্ন দেখে এবং অতীতে তারা গম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পন্ন ছিল। সম্প্রতি রাইসি সরকার ইরানি কৃষকদের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে গম কেনার ঘোষণা দিয়েছেন। এ বছর দেশটিতে ৯০ লাখ টন গম উৎপাদনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ফলে আমদানি নির্ভরতা কিছুটা কমবে।

ইরানের ওপর অতীতে গ্যাসোলিন রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এতে দেশটি গ্যাসোলিন উৎপাদনে স্বয়ংসম্পন্ন হয়ে ওঠে। এছাড়া রাশিয়া বছরে বিলিয়ন ডলার মূল্যের খাদ্য পণ্য আমদানি করে। ইরানের জন্য রাশিয়ার আমদানি বাজারে প্রবেশের সুযোগও রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ২০১৪ সাল থেকে মার্কিন ও ইউরোপের খাদ্য আমদানি বন্ধ করে রাশিয়া। চলতি বছর ইউক্রেনে রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযান শুরুর পর দেওয়া নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে মস্কো খাদ্য আমদানিতে কয়েকবার ইরানকে আহ্বান জানিয়েছে। ইরান চার ঋতুর দেশ। দেশটির ফল, শাকসবজি ও দুগ্ধজাত পণ্য রাশিয়ার খাদ্য বাজারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করতে পারে।

সুইফট এড়িয়ে মির : ইউক্রেনে সামরিক অভিযান পরিচালনা করার কারণে বিশ্বের অন্যতম পেমেন্ট সিস্টেম সুইফট থেকে রাশিয়াকে বাদ দিয়েছে পশ্চিমা দেশগুলো। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত অর্থব্যবস্থা বাদ দিয়ে রুশ সিস্টেম ‘মির’ ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে ইরান ও রাশিয়া। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যেই উভয় দেশ আলোচনা শুরু করেছে। রাশিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘রাশিয়া ও ইরান সুইফট সিস্টেম বাদ দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে আলাদা একটি ফাইনান্সিয়াল মেসেজিং সিস্টেম চালু করার চিন্তা করছে। এ নিয়ে রাশিয়ার মিত্রদের সাথে আমরা আলোচনা করছি।’

সামরিক সহযোগিতায় চীন-ইরান-রাশিয়া: ইউক্রেন অভিযানে রাশিয়া ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ আরো সমরাস্ত্র ব্যবহার করছে বলে এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান। তবে পত্রিকাটির এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে লন্ডনস্থ ইরান দূতাবাস। গত ১২ এপ্রিল গার্ডিয়ান জানায়, ইরাক থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে রাশিয়ার কাছে অস্ত্র পৌঁছে দিচ্ছে ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলো এবং রাশিয়া সে অস্ত্র ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার করছে।

যুদ্ধের জেরে শিথিল হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা: আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ইরানের পরমাণু আলোচনায় নতুন গতি যোগ করেছে নিঃসন্দেহে। ইরানি কূটনীতিকরাও এতে দর কষাকষির নতুন শক্তি পেয়েছেন। ওয়াশিংটনও ইরানের তেল রপ্তানির গুরুত্ব অনুভব করছে।

জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছায়া। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া থেকে তেল সরবরাহ বন্ধের আশঙ্কা থেকেই এ অস্থিরতা। তাই বিকল্প খুঁজতে মার্কিন প্রশাসন দ্বারস্থ হয়েছে লাতিন আমেরিকার মার্কিন শত্রু- ভেনেজুয়েলা এবং ইরানের কাছে।

রাশিয়ার তেল-গ্যাস রপ্তানি থমকে গেলে বাজারে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হবে তা অপূরণীয়। কিছুটা সরবরাহ অন্য উৎস থেকে দরকার হবেই। দীর্ঘ দিন ধরে ইরানের তেল-গ্যাস রপ্তানি সীমিত, যুদ্ধের কারণে তেল রপ্তানিতে পশ্চিমারা ছাড় দিতে যাচ্ছে।

জ্বালানির বিশ্ববাজার এখন ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান সৃষ্ট ঝুঁকি এবং ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পরমাণু চুক্তি- এ দুয়ের আশা-নিরাশায় দুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে ফিরলে ইরানের জ্বালানির রপ্তানিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হবে-তাতে মূল্য কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসবে।

জনপ্রিয়

বকশীগঞ্জে খালেদা জিয়ার রূহের মাগফেরাত কামনায় ছাত্রদলের দোয়া মাহফিল

ইউক্রেন যুদ্ধে আরো দৃঢ় হচ্ছে ইরান-রাশিয়া সম্পর্ক

প্রকাশের সময় : ০৩:০৭:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২২

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে ইতিমধ্যে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সেইসাথে খরা ও পানি স্বল্পতার মতো মারাত্মক সমস্যায় পড়েছে ইরান। ইরানের সবচেয়ে বড় আমদানি বাজার হলো রাশিয়া। দেশটি থেকে তারা ব্যাপক পরিমাণে খাদ্যশস্য কিনে থাকে। কার্যত বৈশ্বিক বাস্তবতায় ইরানের অর্থনীতি অনেকটাই রাশিয়ানির্ভর।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা থাকা অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। সে সময় আর্থিক নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত ইরানের পাশে দাঁড়ায়নি ইউরোপীয় ইউনিয়নও। রাশিয়া ও চীনই ইরানকে তখন টিকে থাকার রসদ জুগিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সমর্থন জানিয়ে ইরান তার প্রতিদান দিয়েছে। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ দুটির সম্পর্ক আরো দৃঢ় হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে ইউক্রেন যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই রাশিয়া, চীন মধ্য প্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ায় মার্কিন প্রভাব নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে জোর দিয়েছে। গত বছরের ২৭ মার্চ ইরান ও চীনের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তির আওতায় রয়েছে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে এ চুক্তির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পাকিস্তানে চীনের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে। এতে ইরান ও তুরস্ককে যুক্ত করেছে চীন। ফলে ওই অঞ্চলের অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির ভিন্ন সমীকরণ দাঁড়াচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার বাইরে আঞ্চলিক প্রভাব বলয় বিস্তারে ইরান, পাকিস্তান, তরস্ক, রাশিয়া, চীন- সবারই একে-অপরের সহযোগিতা জরুরি। এ কারণেই এ দেশগুলোকে নিয়ে নতুন এক জোট গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে, যার উদ্দেশ্য হবে- সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ায় জোটে আধিপত্য বাড়িয়ে মার্কিন প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা। দুই পরাশক্তি চীন-রাশিয়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে একমত হওয়ায় এ দেশগুলোর জোট গঠন এখন সময়ের বিষয় বলে মনে করা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ এ ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

গত মাসে ইরানের কৃষিমন্ত্রী মস্কোর সাথে একটি আমদানি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া থেকে দুই কোটি টন মৌলিক খাদ্যদ্রব্য আমদানি করবে ইরান। গত বছর তিন কোটি টন খাদ্যদ্রব্য আমদানি করেছে ইরান, যার আনুমানিক মূল্য এক হাজার ৯০০ কোটি ডলার। আমদানি করা খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে ছিল- গম, ভুট্টা, বার্লি, তৈলবীজ ও ভোজ্য তেল। দেশটির মোট আমদানির বড় অংশজুড়ে এই খাদ্যদ্রব্যগুলো রয়েছে। ইরানে গমের প্রধান সরবরাহকারী রাশিয়া। এছাড়া তুরস্ক, মিশরও রাশিয়ার পণ্য আমদানির ওপর নির্ভর করে।

বিদেশি বাজারে অতি নির্ভরতার বিষয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতল্লাহ আলী খামেনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘দেশকে অবশ্যই মৌলিক খাদ্যপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া উচিত। গম, বার্লি, ভুট্টা, পশুখাদ্য ও তৈলবীজ উৎপাদনে ইরানকে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে।’ তেহরান একইসাথে তেল ও পশুখাদ্যের বিষয়েও মস্কোর সাথে চুক্তির পরিকল্পনা করছে। এতে করে দুই দশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো মজবুত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী গমের দাম বাড়ার সাথে সাথে ইরান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। তাদের এ মৌলিক পণ্য আমদানি করতে হবে পাঁচ গুণ বেশি দামে। ফলে আমদানি প্রক্রিয়া ব্যাহত, অভ্যন্তরীণ মূল্য নাগালের বাইরে চলে যাওয়াসহ জনসাধারণের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। কাজেই ইরানের জন্য রাশিয়াসহ অন্য নির্ভরযোগ্য আমদানি উৎসগুলো সুরক্ষিত করা প্রয়োজন।

এ দিকে রাশিয়া ইরানের সাথে আমদানি বাণিজ্যে ডলার দূর করতে চায়। এটি ইরানের জন্য রাশিয়ার সাথে কৃষি বাণিজ্য শক্তিশালী করার সুযোগ। মার্কিন ও ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞার প্রভাব থেকে বাঁচতে ইরান ও রাশিয়া দুই দেশই একসাথে বাণিজ্য ও অর্থনীতি বিনিময়ে কাজ করছে।

তেহরান এখনো মৌলিক কৃষিপণ্য উৎপাদনের স্বপ্ন দেখে এবং অতীতে তারা গম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পন্ন ছিল। সম্প্রতি রাইসি সরকার ইরানি কৃষকদের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে গম কেনার ঘোষণা দিয়েছেন। এ বছর দেশটিতে ৯০ লাখ টন গম উৎপাদনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ফলে আমদানি নির্ভরতা কিছুটা কমবে।

ইরানের ওপর অতীতে গ্যাসোলিন রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এতে দেশটি গ্যাসোলিন উৎপাদনে স্বয়ংসম্পন্ন হয়ে ওঠে। এছাড়া রাশিয়া বছরে বিলিয়ন ডলার মূল্যের খাদ্য পণ্য আমদানি করে। ইরানের জন্য রাশিয়ার আমদানি বাজারে প্রবেশের সুযোগও রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ২০১৪ সাল থেকে মার্কিন ও ইউরোপের খাদ্য আমদানি বন্ধ করে রাশিয়া। চলতি বছর ইউক্রেনে রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযান শুরুর পর দেওয়া নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে মস্কো খাদ্য আমদানিতে কয়েকবার ইরানকে আহ্বান জানিয়েছে। ইরান চার ঋতুর দেশ। দেশটির ফল, শাকসবজি ও দুগ্ধজাত পণ্য রাশিয়ার খাদ্য বাজারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করতে পারে।

সুইফট এড়িয়ে মির : ইউক্রেনে সামরিক অভিযান পরিচালনা করার কারণে বিশ্বের অন্যতম পেমেন্ট সিস্টেম সুইফট থেকে রাশিয়াকে বাদ দিয়েছে পশ্চিমা দেশগুলো। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত অর্থব্যবস্থা বাদ দিয়ে রুশ সিস্টেম ‘মির’ ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে ইরান ও রাশিয়া। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যেই উভয় দেশ আলোচনা শুরু করেছে। রাশিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘রাশিয়া ও ইরান সুইফট সিস্টেম বাদ দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে আলাদা একটি ফাইনান্সিয়াল মেসেজিং সিস্টেম চালু করার চিন্তা করছে। এ নিয়ে রাশিয়ার মিত্রদের সাথে আমরা আলোচনা করছি।’

সামরিক সহযোগিতায় চীন-ইরান-রাশিয়া: ইউক্রেন অভিযানে রাশিয়া ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ আরো সমরাস্ত্র ব্যবহার করছে বলে এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান। তবে পত্রিকাটির এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে লন্ডনস্থ ইরান দূতাবাস। গত ১২ এপ্রিল গার্ডিয়ান জানায়, ইরাক থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে রাশিয়ার কাছে অস্ত্র পৌঁছে দিচ্ছে ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলো এবং রাশিয়া সে অস্ত্র ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার করছে।

যুদ্ধের জেরে শিথিল হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা: আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ইরানের পরমাণু আলোচনায় নতুন গতি যোগ করেছে নিঃসন্দেহে। ইরানি কূটনীতিকরাও এতে দর কষাকষির নতুন শক্তি পেয়েছেন। ওয়াশিংটনও ইরানের তেল রপ্তানির গুরুত্ব অনুভব করছে।

জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছায়া। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া থেকে তেল সরবরাহ বন্ধের আশঙ্কা থেকেই এ অস্থিরতা। তাই বিকল্প খুঁজতে মার্কিন প্রশাসন দ্বারস্থ হয়েছে লাতিন আমেরিকার মার্কিন শত্রু- ভেনেজুয়েলা এবং ইরানের কাছে।

রাশিয়ার তেল-গ্যাস রপ্তানি থমকে গেলে বাজারে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হবে তা অপূরণীয়। কিছুটা সরবরাহ অন্য উৎস থেকে দরকার হবেই। দীর্ঘ দিন ধরে ইরানের তেল-গ্যাস রপ্তানি সীমিত, যুদ্ধের কারণে তেল রপ্তানিতে পশ্চিমারা ছাড় দিতে যাচ্ছে।

জ্বালানির বিশ্ববাজার এখন ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান সৃষ্ট ঝুঁকি এবং ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পরমাণু চুক্তি- এ দুয়ের আশা-নিরাশায় দুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে ফিরলে ইরানের জ্বালানির রপ্তানিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হবে-তাতে মূল্য কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসবে।