সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তালিকা হচ্ছে বিতর্কিত মন্ত্রী-এমপিদের

সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন সামনে রেখে ভেতরে-বাইরে বহুমুখী চাপে জর্জরিত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি একাট্টা। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক শক্তি মিলে সরকারের ওপর যে চাপ তৈরি করেছে, তাতে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে গেলে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে আওয়ামী লীগকে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দলের অভ্যন্তরে চরম দ্বন্দ্ব-কোন্দল। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে এটিই ভাবাচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

হাইকমান্ডের মতে, ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ অনেক শক্তিশালী। ঐক্যবদ্ধ থাকলে আওয়ামী লীগকে কেউ হারাতে পারবে না। কিন্তু গত পনেরো বছরে ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় বিভিন্ন নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য, নিজের অবস্থান শক্ত করতে অন্য দলের লোক ভেড়ানো এবং তাদের দলীয় পদ-পদবি পাইয়ে দেওয়ার মতো ছোটখাটো অনেক ঘটনায় আওয়ামী লীগ মনোনীত এমপি ও স্থানীয় নেতাদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব-গ্রুপিং তৈরি হয়েছে তাতে শতাধিক নির্বাচনী আসনে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।  এর মধ্যে ঢাকার একজন মন্ত্রীও রয়েছেন। যার বিরুদ্ধে রয়েছে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্যাতন এবং ভূমিদস্যুতার অভিযোগ। এই অনিয়মের কথা জানাতে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়েছেন তার আসনের দলীয় নেতাকর্মীরা। বিতর্কীত এবং জনবিচ্ছিন্ন এমপির তালিকায় সারাদেশে রয়েছেন কমপক্ষে ৫ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী। যাদের আসনে বিএনপি কিংবা অন্য কোনো বিরোধী দল নয়, আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ এখন আওয়ামী লীগ।

বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও সংশ্লিষ্ট তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার বেশিরভাগেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে। এ নিয়ে প্রায়ই সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। ঘটেছে প্রাণহানিও। এসব দ্বন্দ্বের পেছনে রয়েছে জেলা, উপজেলা ও মহানগরের নেতাদের সঙ্গে স্থানীয় এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র- এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বিভেদ। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় মনোনয়ন ঘিরে বিভেদ আরও চরম আকার ধারণ করেছে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে হাইকমান্ডের। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে শুরু হয়েছে শেষ মুহূর্তের জরিপ। তালিকা হচ্ছে বিতর্কিত ও জনবিচ্ছিন্ন মন্ত্রী-এমপিদের।

মুখ দেখে নয়, এলাকায় অবস্থান ও জনপ্রিয়তা দেখে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে- এমন কথা দলের এমপি-মন্ত্রী ও দলীয় নেতাদের আগেই জানিয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগের দুই নির্বাচনের মতো হবে না, এই নির্বাচন চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে এবং সব দল এতে অংশগ্রহণ করবে এমন আভাস দিয়ে সবার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে, এমন কথা জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। এমপিদের ওপর চালানো জরিপে যাদের অবস্থান ভালো শুধু তাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে অন্য কিছু বিবেচনায় আনা হবে না। এ ছাড়া দলের বিরুদ্ধে অবস্থান ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকলে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে না বলেও দলীয় এমপি-মন্ত্রীদের জানিয়ে দিয়েছেন দলীয় সভাপতি। এ অবস্থায় স্থানীয় রাজনীতিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য দলের মধ্যে গ্রুপিং সৃষ্টিকারী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতাকারী ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ইন্ধনদাতা এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করানো এমন অনেকেই দলীয় মনোনয়ন থেকে ছিটকে যেতে পারেন।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জরিপ চালানো হচ্ছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এসব জরিপের মাধ্যমে এমপি-মন্ত্রীরা কে কী করছেন, এলাকায় কার কেমন অবস্থান তা তুলে আনা হচ্ছে। প্রত্যেক এমপি-মন্ত্রীর এলাকায় জরিপ চালিয়ে প্রতি ছয় মাস পরপর এলাকার প্রকৃত চিত্র প্রতিবেদন আকারে দলীয় সভাপতির কাছে জমা দেওয়া হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ অবশ্য প্রতিদিনের বংলাদেশকে বলছেন, সিটি নির্বাচনকেন্দ্রিক কোন্দলের ঘটনা দিয়ে জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা যাবে না। জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে বিভেদ থাকবে না বলেও মনে করেন তিনি। বর্ষীয়ান এ নেতার মতে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের সঙ্গে সরকার পরিবর্তনের সম্পর্ক নেই। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বিজয়ী না হলে সরকার গঠন করা যাবে না- এ সমীকরণ সব পর্যায়ের নেতাকর্মীই বোঝেন।

আ.লীগের প্রতিপক্ষ আ.লীগ

মাঠের চিত্র ভিন্ন। সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ততই প্রকট হচ্ছে। এর সর্বশেষ নজির দেখা গেল গত ১৭ মার্চ পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলা আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে। জাতির পিতার ১০৩তম জন্মবার্ষিকী পালন করা নিয়ে স্থানীয় এমপি আ স ম ফিরোজ ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান মোতালেব হাওলাদারের গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ওসিসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন। ওই সংঘর্ষে মোতালেব হাওলাদার গুরুতর আহত হন। প্রথমে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে প্রায়ই সংঘাতের ঘটনা ঘটে এই নির্বাচনী আসনটিতে। শুধু বাউফল নয়, একশর বেশি সংসদীয় আসনের চিত্র একই।

টাঙ্গাইল-২ আসনের এমপি তানভীর হাসান ওরফে ছোট মনিরের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ। তৃণমূলের কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে না থেকে দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর পর বিদেশ থেকে এসে হঠাৎ করেই তিনি এমপি বনে যান। যে কারণে দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলে পোড় খাওয়া নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে হাইব্রিডদের সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। ভূঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সভাপতি (২০০৩ থেকে বর্তমান পর্যন্ত), বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করে কারাবরণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুদুল হক মাসুদ ত্রাণ দিতে যাবার সময় গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ ওঠে ছোট মনিরের বিরুদ্ধে। এ ছাড়াও গোপালপুর উপজেলার দীর্ঘদিনের সভাপতি (২০০৩ থেকে ২০২২) হালিম, গোপালপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ইউনুস আলী তালুকদার ঠান্ডু, গোপালপুর পৌরসভার মেয়র ছানাসহ অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীর সঙ্গেই ছোট মনিরের বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক।

দ্বিতীয়ত, নিজের প্রভাব বিস্তার এবং দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পুলিশ প্রশাসন ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে এদের মধ্যে অনেককেই জেল খাটানোর অভিযোগ রয়েছে এমপি ছোট মনিরের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ নেতা নিক্সন হত্যার পরিকল্পনাকারী এবং নির্দেশদাতা হিসেবেও তার নাম এসেছে আসামির জবানবন্দিতে। ছোট মনিরের কারণে ভুক্তভোগীদের মধ্যে ভূঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও গোবিন্দদাসী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম আমিন (জিএস), গোবিন্দদাসী ৭ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. কাইয়ুম, গোবিন্দদাসী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রফিক, নিকরাইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. মালেক তালুকদার, নিকরাইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. জুরান মণ্ডল , ভূঞাপুর উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আক্তারুজ্জামান সেলিম, ইব্‌রাহীম খাঁ সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মো. হৃদয় মণ্ডল, নিকরাইল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আল-আমিন, উপজেলা যুবলীগ নেতা মো. নুহু মেম্বার, মো. হাকিমসহ শতাধিক নেতাকর্মীর নামে মিথ্যা মামলা করা হয় এবং এদের মধ্যে অনেকেই মাসের পর মাস জেলে ছিলেন। এ ছাড়াও মাদক ব্যবসায়ীদের দলে টেনে এনে তাদের মদদ দেওয়ার অভিযোগসহ চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে ছোট মনিরের বিরুদ্ধে। এমপি ছোট মনিরের ভাই বড় মনির ১৭ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ করার পর সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে সেই মামলায় বড় মনির জেলহাজতে রয়েছেন।

গত বছরের ১৬ জুলাই জাতীয় সংসদের পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের সঙ্গে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। রাজী উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আর উপজেলা চেয়ারম্যান সাংগঠনিক সম্পাদকের পদে রয়েছেন। ঢাকায় হাতাহাতির পর এলাকায় দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানে উত্তেজনা ছড়ায়। পরে দুজনের বিরোধ সামলাতে নামতে হয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের। স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগামী সংসদ নির্বাচনে রাজী ফখরুলের পাশাপাশি আবুল কালামও নৌকা প্রতীকে প্রার্থী হতে চাইছেন। আর সে কারণেই তাদের বিরোধ এখন প্রকাশ্যে।

মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগে বিভক্তি প্রকট হচ্ছে। ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে স্থানীয় দুই এমপি শাজাহান খান ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম একে অন্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন। পরে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা পরিস্থিতি শান্ত করেন। চাঁদপুরের আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে চাঁদপুর-৩ (সদর ও হাইমচর) আসনের এমপি শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির দূরত্ব রয়েছে। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গত বছরের ২ ও ৩ মার্চ বৈঠক ডেকে মিলেমিশে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও সংকট কাটেনি।

নাটোর সদর আসনের এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুলের সঙ্গে জেলার আরেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল কুদ্দুসের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব এখন চরম পর্যায়ে। নোয়াখালী-৪ আসনের (সদর) এমপি একরামুল করিম চৌধুরীর সঙ্গেও জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির দ্বন্দ্বও মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মাঝেমধ্যে ফেসবুক লাইভে এসে তিনি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে নিয়েও বিষোদগার করেন।

আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহর সঙ্গে ফরিদপুর-৫ আসনের এমপি মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনের প্রকাশ্য বিরোধ এক যুগ ধরে। গত দুইটি নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী  প্রার্থী নিক্সনের কাছে তাকে হারতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য নিক্সন চৌধুরী কখনও দলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন না। তবে যুবলীগের সর্বশেষ সম্মেলেনে তাকে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য করা হয়।

সুনামগঞ্জ-১ (তাহিরপুর-ধর্মপাশা) আসনের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের সঙ্গে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশের বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। কেন্দ্রীয় নেতাদেরও এ বিষয়ে অবিহিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

টাঙ্গাইল-৮ আসনের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জোয়াহেরুল ইসলামের সঙ্গে সখীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ অনেক নেতার বিরোধ এখন প্রকাশ্যে। সম্প্রতি সখীপুরে এক সমাবেশ করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এমপির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তৃতা করেন। এ ছাড়া বাসাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজী অলিদ ইসলামের সঙ্গে তার বিরোধ রয়েছে। নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খানকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয় স্থানীয় এমপি জহিরুল হক মোহন ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল হকের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এমপি ম ম আমজাদ হোসেন মিলনের বিরুদ্ধে। ছাত্রলীগের কর্মী হত্যার পর সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। অভিযোগ আছে, স্থানীয় আওয়ামী লীগে যে বিভক্তি ও কোন্দল তার নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমপি ডা. হাবিবে মিল্লাত মুন্না।

বরিশাল-৪ (হিজলা মেহেন্দীগঞ্জ) আসনের এমপি পঙ্কজ দেবনাথের বিরুদ্ধে স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এমপির কর্মকাণ্ডে খোদ উপজেলা আওয়ামী লীগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ তিনি প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন ও তাদের মধ্যে বেশ কিছু প্রার্থীকে জিতিয়ে এনেছেন। এ ছাড়া স্থানীয় মেয়রকে কোপানোর হুমকি দিয়ে পুলিশের ওসির সঙ্গে তার কথোপকথন সম্প্রতি ভাইরাল হয়। এই দ্বন্দ্বের জেরে এমপিবিরোধী গ্রুপের সঙ্গে এমপি পক্ষের গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় আটজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে এমপি পক্ষের লোকজন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে প্রতিপক্ষের পাঁচজনকে কোপানোর অভিযোগ ওঠে। পরে তাদের বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমপি পঙ্কজ দেবনাথকে আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এদিকে রাজশাহী-১ আসনের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছেন। ফলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। সারা দেশে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে এমন দ্বন্দ্ব চলছে পটুয়াখালী-৩ আসনের এমপি এস এম শাহজাদা, পটুয়াখালী-৪ আসনের এমপি মুহিবুর রহমান, ময়মনসিংহ-১ আসনের এমপি জুয়েল আরেং, বরগুনা-১ আসনের এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর এলাকায়।

জরিপ চলছে, হোতারা বাদ পড়বেন 

দলের পাশাপাশি একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও চালানো হচ্ছে জরিপ। এসব জরিপে দলের এমপি-মন্ত্রীদের কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। জরিপে মূলত এমপি-মন্ত্রীদের এলাকায় অবস্থান কেমন, নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন, দলের ত্যাগী ও পোড় খাওয়া নেতাদের সঠিক মূল্যায়ন করছেন কি না, নিজস্ব বলয় তৈরি করতে গিয়ে দলের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টিতে কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না, দলের জন্য ভূমিকা (স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে কী ধরনের ভূমিকা) কী ছিল, দখল ও অনিয়মের মতো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কি না, দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মতো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত আছেন কি না এমন বিষয়গুলো তুলে আনা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিটি আসনে সাম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে এসব জরিপে। এরই মধ্যে তিনটি জরিপ চালানো হয়েছে। এসব জরিপের রিপোর্ট দলীয় সভাপতির কাছে জমাও পড়েছে। আরও একটি জরিপের কাজ চলমান রয়েছে।

সম্পন্ন হওয়া জরিপের অনেকের বিষয়ে খুব ভালো ফল আসেনি বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে দলের মধ্যে গ্রপিং ও কোন্দল সৃষ্টিকারী, নিজ দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি, নানা ধরনের অপকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বেশ কিছু এমপি ও মন্ত্রী ঝুঁকির তালিকাতে পড়ে গেছেন। জরিপে মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যসহ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এমপির রিপোর্ট সন্তোষজনক নয় বলে জানা গেছে। এদের অনেকের কপালে দলীয় মনোনয়ন না-ও জুটতে পারে। এলাকার মানুষের মধ্যে ভালো অবস্থান না থাকা ও দলীয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করার কারণে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন থেকে ছিটকে পড়েছেন এক প্রভাবশালী প্রার্থী। এই ধারাবাহিকতা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যাবে বলে দলটির একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

৫ জুন গণভবনে কয়েকটি জেলা ও উপজেলার নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় মনোনয়নের প্রসঙ্গে বলেছেন, জরিপে যাদের রিপোর্ট ভালো আসবে কেবল তাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হবে।

এর আগে গত ৭ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের সংসদীয় কমিটির সপ্তম সভায় দলীয় এমপিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচনে কারও মুখ দেখে নয়, জরিপ কিংবা অতীতের আমলনামা দেখে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। আপনাদের সবার আমলনামা আমার হাতে আছে, অন্যান্য নির্বাচনে আমরা কেন্দ্র থেকে বিভিন্নভাবে সাপোর্ট দিয়ে তুলে এনেছি। আপনারা যেমন সাপোর্ট চেয়েছেন দিয়েছি, কিন্তু এবার কোনো রকম সাপোর্ট দেওয়া হবে না। নিজের যোগ্যতায় নিজেই জিতে আসতে হবে। আর আপনাদের আমলনামা দেখে মনোনয়ন দেওয়া হবে।’

জরিপের মাধ্যমে আমলনামা তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩০ মার্চ গণভবনে বিভিন্ন জেলা ও মহানগরের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে একই কথা স্মরণ করিয়ে দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে সবার খবর রয়েছে। মন্ত্রী-এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে কে কোথায় কী করছেন সবার আমলনামা তার কাছে রয়েছে। দলীয় মাধ্যমের পাশাপাশি নিজস্ব সোর্স থেকে তিনি নিয়মিত এসব তথ্য পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া দলীয় ও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও জরিপ চালিয়ে মাঠের চিত্র তুলে আনছেন। শুধু নিজ দলের বর্তমান প্রার্থীর বিষয়েই নয়, সাম্ভাব্য প্রার্থী ও অন্য দলের প্রার্থীদের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিটি আসন সম্পর্কে একটা ধারণা নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের দলীয় সভাপতি জরিপের যে কথা বলেছেন, তা চলমান রয়েছে। প্রতিবারই দলীয় প্রার্থীদের ওপর এই জরিপ করা হয়। এই জরিপের মাধ্যমে যে বিষয়গুলো দেখা হয় তা হচ্ছে- দলীয় এমপিদের এলাকায় জনপ্রিয়তার অবস্থা কেমন। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেমন। দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা। কোনো ধরনের অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত কি না, বা এলাকায় কোনো ধরনের বদনাম আছে কি না। কোভিডের সময় কীভাবে জনগণের পাশে ছিল, দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছিল কি না। এর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় থাকলে জরিপের রিপোর্টে তা উল্লেখ করা থাকে। অতীতের স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন সময় দলীয় এমপিদের কার কী ভূমিকা ছিল, সেটা রিপোর্টের মধ্যে উল্লেখ করা থাকে।’

দলের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত আসতে যাচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ বিষয়ে নেত্রী (শেখ হাসিনা) নিজেই বারবার বলেছেন- যারা দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না। তিনি এই কথা এমপিদের সামনে পার্লামেন্টারি পার্টির মিটিংয়েও বলেছেন। তিনি এমপিদের বলেছেন- এই ধরনের কর্মকাণ্ড করবা না, যদি কেউ করো তাহলে মনোনয়ন বঞ্চিত হবা। আর এটা সব এমপি জানেন।’ -সুত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশ।

জনপ্রিয়

গোগার গোপালপুরে খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তালিকা হচ্ছে বিতর্কিত মন্ত্রী-এমপিদের

প্রকাশের সময় : ০২:৩৪:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জুন ২০২৩

সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন সামনে রেখে ভেতরে-বাইরে বহুমুখী চাপে জর্জরিত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি একাট্টা। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক শক্তি মিলে সরকারের ওপর যে চাপ তৈরি করেছে, তাতে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে গেলে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে আওয়ামী লীগকে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দলের অভ্যন্তরে চরম দ্বন্দ্ব-কোন্দল। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে এটিই ভাবাচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

হাইকমান্ডের মতে, ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ অনেক শক্তিশালী। ঐক্যবদ্ধ থাকলে আওয়ামী লীগকে কেউ হারাতে পারবে না। কিন্তু গত পনেরো বছরে ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় বিভিন্ন নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য, নিজের অবস্থান শক্ত করতে অন্য দলের লোক ভেড়ানো এবং তাদের দলীয় পদ-পদবি পাইয়ে দেওয়ার মতো ছোটখাটো অনেক ঘটনায় আওয়ামী লীগ মনোনীত এমপি ও স্থানীয় নেতাদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব-গ্রুপিং তৈরি হয়েছে তাতে শতাধিক নির্বাচনী আসনে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।  এর মধ্যে ঢাকার একজন মন্ত্রীও রয়েছেন। যার বিরুদ্ধে রয়েছে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্যাতন এবং ভূমিদস্যুতার অভিযোগ। এই অনিয়মের কথা জানাতে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়েছেন তার আসনের দলীয় নেতাকর্মীরা। বিতর্কীত এবং জনবিচ্ছিন্ন এমপির তালিকায় সারাদেশে রয়েছেন কমপক্ষে ৫ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী। যাদের আসনে বিএনপি কিংবা অন্য কোনো বিরোধী দল নয়, আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ এখন আওয়ামী লীগ।

বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও সংশ্লিষ্ট তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার বেশিরভাগেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে। এ নিয়ে প্রায়ই সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। ঘটেছে প্রাণহানিও। এসব দ্বন্দ্বের পেছনে রয়েছে জেলা, উপজেলা ও মহানগরের নেতাদের সঙ্গে স্থানীয় এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র- এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বিভেদ। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় মনোনয়ন ঘিরে বিভেদ আরও চরম আকার ধারণ করেছে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে হাইকমান্ডের। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে শুরু হয়েছে শেষ মুহূর্তের জরিপ। তালিকা হচ্ছে বিতর্কিত ও জনবিচ্ছিন্ন মন্ত্রী-এমপিদের।

মুখ দেখে নয়, এলাকায় অবস্থান ও জনপ্রিয়তা দেখে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে- এমন কথা দলের এমপি-মন্ত্রী ও দলীয় নেতাদের আগেই জানিয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগের দুই নির্বাচনের মতো হবে না, এই নির্বাচন চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে এবং সব দল এতে অংশগ্রহণ করবে এমন আভাস দিয়ে সবার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে, এমন কথা জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। এমপিদের ওপর চালানো জরিপে যাদের অবস্থান ভালো শুধু তাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে অন্য কিছু বিবেচনায় আনা হবে না। এ ছাড়া দলের বিরুদ্ধে অবস্থান ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকলে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে না বলেও দলীয় এমপি-মন্ত্রীদের জানিয়ে দিয়েছেন দলীয় সভাপতি। এ অবস্থায় স্থানীয় রাজনীতিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য দলের মধ্যে গ্রুপিং সৃষ্টিকারী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতাকারী ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ইন্ধনদাতা এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করানো এমন অনেকেই দলীয় মনোনয়ন থেকে ছিটকে যেতে পারেন।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জরিপ চালানো হচ্ছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এসব জরিপের মাধ্যমে এমপি-মন্ত্রীরা কে কী করছেন, এলাকায় কার কেমন অবস্থান তা তুলে আনা হচ্ছে। প্রত্যেক এমপি-মন্ত্রীর এলাকায় জরিপ চালিয়ে প্রতি ছয় মাস পরপর এলাকার প্রকৃত চিত্র প্রতিবেদন আকারে দলীয় সভাপতির কাছে জমা দেওয়া হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ অবশ্য প্রতিদিনের বংলাদেশকে বলছেন, সিটি নির্বাচনকেন্দ্রিক কোন্দলের ঘটনা দিয়ে জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা যাবে না। জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে বিভেদ থাকবে না বলেও মনে করেন তিনি। বর্ষীয়ান এ নেতার মতে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের সঙ্গে সরকার পরিবর্তনের সম্পর্ক নেই। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বিজয়ী না হলে সরকার গঠন করা যাবে না- এ সমীকরণ সব পর্যায়ের নেতাকর্মীই বোঝেন।

আ.লীগের প্রতিপক্ষ আ.লীগ

মাঠের চিত্র ভিন্ন। সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ততই প্রকট হচ্ছে। এর সর্বশেষ নজির দেখা গেল গত ১৭ মার্চ পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলা আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে। জাতির পিতার ১০৩তম জন্মবার্ষিকী পালন করা নিয়ে স্থানীয় এমপি আ স ম ফিরোজ ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান মোতালেব হাওলাদারের গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ওসিসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন। ওই সংঘর্ষে মোতালেব হাওলাদার গুরুতর আহত হন। প্রথমে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে প্রায়ই সংঘাতের ঘটনা ঘটে এই নির্বাচনী আসনটিতে। শুধু বাউফল নয়, একশর বেশি সংসদীয় আসনের চিত্র একই।

টাঙ্গাইল-২ আসনের এমপি তানভীর হাসান ওরফে ছোট মনিরের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ। তৃণমূলের কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে না থেকে দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর পর বিদেশ থেকে এসে হঠাৎ করেই তিনি এমপি বনে যান। যে কারণে দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলে পোড় খাওয়া নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে হাইব্রিডদের সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। ভূঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সভাপতি (২০০৩ থেকে বর্তমান পর্যন্ত), বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করে কারাবরণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুদুল হক মাসুদ ত্রাণ দিতে যাবার সময় গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ ওঠে ছোট মনিরের বিরুদ্ধে। এ ছাড়াও গোপালপুর উপজেলার দীর্ঘদিনের সভাপতি (২০০৩ থেকে ২০২২) হালিম, গোপালপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ইউনুস আলী তালুকদার ঠান্ডু, গোপালপুর পৌরসভার মেয়র ছানাসহ অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীর সঙ্গেই ছোট মনিরের বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক।

দ্বিতীয়ত, নিজের প্রভাব বিস্তার এবং দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পুলিশ প্রশাসন ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে এদের মধ্যে অনেককেই জেল খাটানোর অভিযোগ রয়েছে এমপি ছোট মনিরের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ নেতা নিক্সন হত্যার পরিকল্পনাকারী এবং নির্দেশদাতা হিসেবেও তার নাম এসেছে আসামির জবানবন্দিতে। ছোট মনিরের কারণে ভুক্তভোগীদের মধ্যে ভূঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও গোবিন্দদাসী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম আমিন (জিএস), গোবিন্দদাসী ৭ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. কাইয়ুম, গোবিন্দদাসী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রফিক, নিকরাইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. মালেক তালুকদার, নিকরাইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. জুরান মণ্ডল , ভূঞাপুর উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আক্তারুজ্জামান সেলিম, ইব্‌রাহীম খাঁ সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মো. হৃদয় মণ্ডল, নিকরাইল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আল-আমিন, উপজেলা যুবলীগ নেতা মো. নুহু মেম্বার, মো. হাকিমসহ শতাধিক নেতাকর্মীর নামে মিথ্যা মামলা করা হয় এবং এদের মধ্যে অনেকেই মাসের পর মাস জেলে ছিলেন। এ ছাড়াও মাদক ব্যবসায়ীদের দলে টেনে এনে তাদের মদদ দেওয়ার অভিযোগসহ চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে ছোট মনিরের বিরুদ্ধে। এমপি ছোট মনিরের ভাই বড় মনির ১৭ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ করার পর সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে সেই মামলায় বড় মনির জেলহাজতে রয়েছেন।

গত বছরের ১৬ জুলাই জাতীয় সংসদের পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের সঙ্গে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। রাজী উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আর উপজেলা চেয়ারম্যান সাংগঠনিক সম্পাদকের পদে রয়েছেন। ঢাকায় হাতাহাতির পর এলাকায় দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানে উত্তেজনা ছড়ায়। পরে দুজনের বিরোধ সামলাতে নামতে হয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের। স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগামী সংসদ নির্বাচনে রাজী ফখরুলের পাশাপাশি আবুল কালামও নৌকা প্রতীকে প্রার্থী হতে চাইছেন। আর সে কারণেই তাদের বিরোধ এখন প্রকাশ্যে।

মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগে বিভক্তি প্রকট হচ্ছে। ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে স্থানীয় দুই এমপি শাজাহান খান ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম একে অন্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন। পরে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা পরিস্থিতি শান্ত করেন। চাঁদপুরের আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে চাঁদপুর-৩ (সদর ও হাইমচর) আসনের এমপি শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির দূরত্ব রয়েছে। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গত বছরের ২ ও ৩ মার্চ বৈঠক ডেকে মিলেমিশে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও সংকট কাটেনি।

নাটোর সদর আসনের এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুলের সঙ্গে জেলার আরেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল কুদ্দুসের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব এখন চরম পর্যায়ে। নোয়াখালী-৪ আসনের (সদর) এমপি একরামুল করিম চৌধুরীর সঙ্গেও জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির দ্বন্দ্বও মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মাঝেমধ্যে ফেসবুক লাইভে এসে তিনি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে নিয়েও বিষোদগার করেন।

আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহর সঙ্গে ফরিদপুর-৫ আসনের এমপি মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনের প্রকাশ্য বিরোধ এক যুগ ধরে। গত দুইটি নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী  প্রার্থী নিক্সনের কাছে তাকে হারতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য নিক্সন চৌধুরী কখনও দলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন না। তবে যুবলীগের সর্বশেষ সম্মেলেনে তাকে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য করা হয়।

সুনামগঞ্জ-১ (তাহিরপুর-ধর্মপাশা) আসনের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের সঙ্গে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশের বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। কেন্দ্রীয় নেতাদেরও এ বিষয়ে অবিহিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

টাঙ্গাইল-৮ আসনের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জোয়াহেরুল ইসলামের সঙ্গে সখীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ অনেক নেতার বিরোধ এখন প্রকাশ্যে। সম্প্রতি সখীপুরে এক সমাবেশ করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এমপির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তৃতা করেন। এ ছাড়া বাসাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজী অলিদ ইসলামের সঙ্গে তার বিরোধ রয়েছে। নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খানকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয় স্থানীয় এমপি জহিরুল হক মোহন ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল হকের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এমপি ম ম আমজাদ হোসেন মিলনের বিরুদ্ধে। ছাত্রলীগের কর্মী হত্যার পর সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। অভিযোগ আছে, স্থানীয় আওয়ামী লীগে যে বিভক্তি ও কোন্দল তার নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমপি ডা. হাবিবে মিল্লাত মুন্না।

বরিশাল-৪ (হিজলা মেহেন্দীগঞ্জ) আসনের এমপি পঙ্কজ দেবনাথের বিরুদ্ধে স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এমপির কর্মকাণ্ডে খোদ উপজেলা আওয়ামী লীগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ তিনি প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন ও তাদের মধ্যে বেশ কিছু প্রার্থীকে জিতিয়ে এনেছেন। এ ছাড়া স্থানীয় মেয়রকে কোপানোর হুমকি দিয়ে পুলিশের ওসির সঙ্গে তার কথোপকথন সম্প্রতি ভাইরাল হয়। এই দ্বন্দ্বের জেরে এমপিবিরোধী গ্রুপের সঙ্গে এমপি পক্ষের গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় আটজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে এমপি পক্ষের লোকজন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে প্রতিপক্ষের পাঁচজনকে কোপানোর অভিযোগ ওঠে। পরে তাদের বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমপি পঙ্কজ দেবনাথকে আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এদিকে রাজশাহী-১ আসনের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছেন। ফলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। সারা দেশে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে এমন দ্বন্দ্ব চলছে পটুয়াখালী-৩ আসনের এমপি এস এম শাহজাদা, পটুয়াখালী-৪ আসনের এমপি মুহিবুর রহমান, ময়মনসিংহ-১ আসনের এমপি জুয়েল আরেং, বরগুনা-১ আসনের এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর এলাকায়।

জরিপ চলছে, হোতারা বাদ পড়বেন 

দলের পাশাপাশি একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও চালানো হচ্ছে জরিপ। এসব জরিপে দলের এমপি-মন্ত্রীদের কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। জরিপে মূলত এমপি-মন্ত্রীদের এলাকায় অবস্থান কেমন, নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন, দলের ত্যাগী ও পোড় খাওয়া নেতাদের সঠিক মূল্যায়ন করছেন কি না, নিজস্ব বলয় তৈরি করতে গিয়ে দলের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টিতে কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না, দলের জন্য ভূমিকা (স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে কী ধরনের ভূমিকা) কী ছিল, দখল ও অনিয়মের মতো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কি না, দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মতো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত আছেন কি না এমন বিষয়গুলো তুলে আনা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিটি আসনে সাম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে এসব জরিপে। এরই মধ্যে তিনটি জরিপ চালানো হয়েছে। এসব জরিপের রিপোর্ট দলীয় সভাপতির কাছে জমাও পড়েছে। আরও একটি জরিপের কাজ চলমান রয়েছে।

সম্পন্ন হওয়া জরিপের অনেকের বিষয়ে খুব ভালো ফল আসেনি বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে দলের মধ্যে গ্রপিং ও কোন্দল সৃষ্টিকারী, নিজ দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি, নানা ধরনের অপকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বেশ কিছু এমপি ও মন্ত্রী ঝুঁকির তালিকাতে পড়ে গেছেন। জরিপে মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যসহ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এমপির রিপোর্ট সন্তোষজনক নয় বলে জানা গেছে। এদের অনেকের কপালে দলীয় মনোনয়ন না-ও জুটতে পারে। এলাকার মানুষের মধ্যে ভালো অবস্থান না থাকা ও দলীয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করার কারণে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন থেকে ছিটকে পড়েছেন এক প্রভাবশালী প্রার্থী। এই ধারাবাহিকতা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যাবে বলে দলটির একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

৫ জুন গণভবনে কয়েকটি জেলা ও উপজেলার নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় মনোনয়নের প্রসঙ্গে বলেছেন, জরিপে যাদের রিপোর্ট ভালো আসবে কেবল তাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হবে।

এর আগে গত ৭ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের সংসদীয় কমিটির সপ্তম সভায় দলীয় এমপিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচনে কারও মুখ দেখে নয়, জরিপ কিংবা অতীতের আমলনামা দেখে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। আপনাদের সবার আমলনামা আমার হাতে আছে, অন্যান্য নির্বাচনে আমরা কেন্দ্র থেকে বিভিন্নভাবে সাপোর্ট দিয়ে তুলে এনেছি। আপনারা যেমন সাপোর্ট চেয়েছেন দিয়েছি, কিন্তু এবার কোনো রকম সাপোর্ট দেওয়া হবে না। নিজের যোগ্যতায় নিজেই জিতে আসতে হবে। আর আপনাদের আমলনামা দেখে মনোনয়ন দেওয়া হবে।’

জরিপের মাধ্যমে আমলনামা তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩০ মার্চ গণভবনে বিভিন্ন জেলা ও মহানগরের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে একই কথা স্মরণ করিয়ে দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে সবার খবর রয়েছে। মন্ত্রী-এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে কে কোথায় কী করছেন সবার আমলনামা তার কাছে রয়েছে। দলীয় মাধ্যমের পাশাপাশি নিজস্ব সোর্স থেকে তিনি নিয়মিত এসব তথ্য পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া দলীয় ও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও জরিপ চালিয়ে মাঠের চিত্র তুলে আনছেন। শুধু নিজ দলের বর্তমান প্রার্থীর বিষয়েই নয়, সাম্ভাব্য প্রার্থী ও অন্য দলের প্রার্থীদের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিটি আসন সম্পর্কে একটা ধারণা নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের দলীয় সভাপতি জরিপের যে কথা বলেছেন, তা চলমান রয়েছে। প্রতিবারই দলীয় প্রার্থীদের ওপর এই জরিপ করা হয়। এই জরিপের মাধ্যমে যে বিষয়গুলো দেখা হয় তা হচ্ছে- দলীয় এমপিদের এলাকায় জনপ্রিয়তার অবস্থা কেমন। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেমন। দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা। কোনো ধরনের অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত কি না, বা এলাকায় কোনো ধরনের বদনাম আছে কি না। কোভিডের সময় কীভাবে জনগণের পাশে ছিল, দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছিল কি না। এর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় থাকলে জরিপের রিপোর্টে তা উল্লেখ করা থাকে। অতীতের স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন সময় দলীয় এমপিদের কার কী ভূমিকা ছিল, সেটা রিপোর্টের মধ্যে উল্লেখ করা থাকে।’

দলের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত আসতে যাচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ বিষয়ে নেত্রী (শেখ হাসিনা) নিজেই বারবার বলেছেন- যারা দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না। তিনি এই কথা এমপিদের সামনে পার্লামেন্টারি পার্টির মিটিংয়েও বলেছেন। তিনি এমপিদের বলেছেন- এই ধরনের কর্মকাণ্ড করবা না, যদি কেউ করো তাহলে মনোনয়ন বঞ্চিত হবা। আর এটা সব এমপি জানেন।’ -সুত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশ।