
বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায় যুক্তরাজ্য। নির্বাচনে যেন সহিংস কোনো ঘটনা না ঘটে। এ ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশকে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত দেশটি। বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য কৌশলগত সংলাপে এমনটাই জানানো হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে পঞ্চম কৌশলগত ওই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে যোগ দিতে সোমবার ঢাকায় আসেন যুক্তরাজ্যের পার্মানেন্ট আন্ডার সেক্রেটারি ফিলিপ বার্টন। সংলাপে দেশটির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন।
সংলাপ শেষে ফিলিপ বার্টন জানান, তাঁর বাংলাদেশ সফর গঠনমূলক ও কৌশলগত আলোচনা বেশ ভালো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করেছি, যা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। সামনে এই সম্পর্ক অংশীদারিত্বের চেয়েও বেশি কিছু হবে।’ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা বিষয় সংলাপে উঠে এসেছে জানিয়ে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল (আইপিএস), ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, সাইবার নিরাপত্তা, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, মানবাধিকার ও নির্বাচন নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। আমরা প্রতিটি বিষয় ব্যাখ্যা করেছি।’ আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘দীর্ঘদিনের অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাজ্যের আগ্রহ রয়েছে। তারা অবাধ, সুষ্ঠু ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচন দেখতে চায়, সবাই যেন এতে অংশ নেয়। আমরাও এমন নির্বাচন বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নানা উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিষয়ে কাজ চলছে– এটি তাদের জানিয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বছরের শুরুর দিকে লন্ডন সফরের সময় কমনওয়েলথ মহাসচিবকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য অনুরোধ করেন। ফিলিপ বার্টন এ নিয়ে কমনওয়েলথ মহাসচিবের সঙ্গে আলাপ করবেন বলে জানিয়েছেন।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘‘অংশগ্রহণমূলক’ শব্দটির অনেক মানে হতে পারে। একটি হতে পারে, জনগণ ভোট দেবে– এটিই অংশগ্রহণ। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে অথবা করবে না, সেটি সেই দলের বিষয়। জনগণ যাতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করবে সরকার বা ইসি।’’ তবে সংলাপে অংশ নেওয়া যুক্তরাজ্যের এক কূটনীতিক জানান, অংশগ্রহণমূলক বলতে তারা এমন একটি সহায়ক পরিবেশের কথা বলেছেন, যেখানে সব রাজনৈতিক দল অংশ নিতে উৎসাহ বোধ করবে।
নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাজ্য কি কোনো পরামর্শ দিয়েছে– উত্তরে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘বাংলাদেশ সুনির্দিষ্ট কোনো সহযোগিতা চাইলে যুক্তরাজ্য তা দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। আমরা বলেছি, নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। স্বাধীন ইসি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে যথেষ্ট সক্ষম।’ মধ্যস্থতার প্রস্তাব নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানান তিনি। তবে যুক্তরাজ্য নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাতে চাইলে বাংলাদেশ স্বাগত জানাবে, সেটি তাদের জানানো হয়েছে।
সংলাপে মানবাধিকার পরিস্থিতি ও সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) নিয়েও কথা হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব। এ ক্ষেত্রে তারা সহযোগিতা করতে চেয়েছে। সিএসএ নিয়ে যুক্তরাজ্যের কোনো উদ্বেগ নেই; উল্লেখ করেন তিনি। বিএনপির দণ্ডপ্রাপ্ত নেতা তারেক রহমানের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘আমাদের জানা অনুযায়ী, তারেক রহমান রাজনৈতিক আশ্রয়ে যুক্তরাজ্যে আছেন। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের আইনি যে কাঠামো রয়েছে, সেখানে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’
পররাষ্ট্র সচিব জানান, বন্দি বিনিময় ও মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (এমএলএ) নিয়ে যুক্তরাজ্য কাজ করছে। তবে এখনও সই হওয়ার মতো পর্যায়ে আসেনি। মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘সম্প্রতি তাদের কাছ থেকে আমরা সি-১৩০ উড়োজাহাজ কিনেছি। আমাদের নৌবাহিনীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে।’ বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা ক্রয়ের উৎসে আরও বৈচিত্র্য চায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘আমরা শিগগির স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) সই করব, যাতে যুক্তরাজ্যে ভিসার বাইরে যেসব বাংলাদেশি থাকছেন, যারা অবৈধ হয়ে পড়েছেন, তাদের ফেরত আনতে পারি।’ বাংলাদেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী ও শ্রমিক যুক্তরাজ্য যাচ্ছেন। এটি কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, তা নিয়েও অনুষ্ঠানে আলোচনা হয়। তা ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যুক্তরাজ্য কীভাবে আরও সহযোগিতা করতে পারে, বিশেষ করে সরকারের আয় ও সক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাজ্য। সেই সঙ্গে বিনিয়োগ পরিবেশ কীভাবে আরও ভালো করা যায়, তা নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী তারা। পররাষ্ট্র সচিব জানান, বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি, যা ৬০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি ৯-১০ শতাংশ। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পরও জিএসপি সুবিধা বহাল রাখার জন্য যুক্তরাজ্যকে বলা হয়েছে। বিষয়টি তারা বিবেচনা করবে বলে জানান তিনি।
এদিকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে যুক্তরাজ্য। এ সংকট বাংলাদেশের জন্য বোঝায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করে দেশটি। তারা রোহিঙ্গাদের জন্য আরও ৩০ লাখ পাউন্ড সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
ঢাকা ব্যুরো।। 







































