
বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সীমান্ত বাণিজ্যে গতি আনতে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘোজাডাঙ্গা-ভোমরা স্থলবন্দরের আধুনিকায়নে কাজ শুরু করেছে ভারত। গত বুধবার থেকে এজন্য ভারতের ঘোজাডাঙ্গা সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতামত গ্রহণ শুরু করেছে ভারতের ল্যান্ডপোর্ট অথরিটি। জমি অধিগ্রহণের জটিলতা কাটাতে পারলে ২০২৪ সালের শুরুতেই মিলতে পারে প্রকল্পের আর্থিক অনুমোদন।
পরিকাঠামোগত দিক থেকে ভারতের ঘোজাডাঙ্গা স্থলবন্দরের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে বাংলাদেশের ভোমরা স্থলবন্দর। ইতোমধ্যে এই সীমান্তের পরিকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগী হয়েছে বাংলাদেশ। প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ভোমরা বুড়িমারী এবং বেনাপোল সীমান্তের পরিকাঠামো উন্নয়নে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ। ভোমরা সীমান্তে ইতোমধ্যে প্রায় ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ল্যান্ড পোর্ট অথরিটি। আরও প্রায় ৬০ একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াধীন পর্যায়ে আছে। এমন অবস্থায় কিছুটা দেরিতে শুরু করলেও পিছিয়ে থাকতে চায় না ভারত।
১৯৯৪ সালে ভারতের বসিরহাট ও বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার ঘোজাডাঙ্গা-ভোমরা সীমান্ত আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এরপর থেকে এই বন্দর ব্যবহার করে আমদানি-রপ্তানি থেকে যাত্রী পরিবহন সবকিছুই চলছে দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ ট্রাক পণ্য আমদানি-রপ্তানি এবং প্রায় এক হাজার যাত্রী এই স্থলবন্দরের মাধ্যমে দুই দেশে যাতায়াত করেন। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বছরে এই বন্দরের মাধ্যমে ভারত সরকার হাজার হাজার কোটি রুপি রাজস্ব আদায় করলেও বন্দরের ভারতের অংশের পরিকাঠামো পড়ে আছে তিন দশক অতীতেই। পর্যাপ্ত পরিকাঠামো না থাকায় ভারতের এই স্থলসীমান্ত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অধিকাংশ ব্যবসায়ী।
ঘোজাডাঙ্গা আমদানি-রপ্তানি সংগঠনের সম্পাদক সঞ্জিব মণ্ডল বলেন, ভারতের স্থলসীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় সেন্ট্রাল পার্কিংয়ের অস্তিত্ব নেই, কোনো সরকারি বড় গোডাউন নেই। পরিকাঠামো পরিকল্পনার অভাবে এই এলাকায় একটিও ভালো মানের হোটেল তৈরি হয়নি। ভারতের দূরদূরান্তের রাজ্য থেকে দীর্ঘ কয়েকদিনের যাত্রা করে ট্রাকচালকদের এই সীমান্তে এসে চূড়ান্ত হয়রানির শিকার হতে হয়। এই সীমান্তের মাধ্যমে ফল, পেঁয়াজ, সবজি, মাছসহ একাধিক কাঁচামাল বাংলাদেশে রপ্তানি করা হয়। রক্ষণাবেক্ষণের পরিকাঠামোর অভাবে অনেক সময় রপ্তানির আগেই সীমান্তে দাঁড়িয়ে নষ্ট হয় এসব পচনশীল পণ্য।
ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগ শুনে ভারতীয় ল্যান্ড পোর্ট অথরিটির চেয়ারম্যান আদিত্য মিশ্র বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের অভিযোগ সঠিক। এখানে অনেক সমস্যা আছে। পণ্যবাহী গাড়ি যেখানে-সেখানে পার্কিং করা হচ্ছে। স্টাফদের বসার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। কাস্টমস ইমিগ্রেশনের সঠিক সুযোগ-সুবিধা কিছুই নেই। আমরা এসব ব্যবস্থাই ঠিক করব। চেষ্টা করব ব্যবসায়ী, যাত্রী এবং আমাদের স্টাফদেরকে ভালো একটি পরিবেশ দেওয়ার। খুব দ্রুত আমরা পেট্রাপোল সীমান্তের মতো ঘোজাডাঙ্গা সীমান্তকে একটি আধুনিক রূপ দেব।’
অন্যদিকে, ভারতের এই নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশের সীমান্তের সঙ্গে যৌথ সীমান্ত পরিকল্পনা, রাস্তা, সীমান্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে সহযোগিতা ও সমন্বয় করতে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দলকেও আমন্ত্রণ জানায় ভারত।
প্রতিনিধি দলের তরফে ভোমরা স্থলবন্দরের উপ-পরিচালক রুহুল আমিন বলেন, ‘বাংলাদেশের তরফে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ অনেক আগেই শুরু করা হয়েছে। বর্তমানে আমাদের বন্দরের অধীনে ১৫ একর জায়গা রয়েছে। একসঙ্গে বেশি সংখ্যক ট্রাক চলে এলে আমরাও সমস্যার মুখে পড়ছি। তবে ইতোমধ্যে আমরা ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করেছি। আরও ৬০ একর জমি অধিগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। আমরা নতুন করে পার্কিং এরিয়া, পার্কিং শেড, গোডাউন, অফিসার্স কোয়ার্টারসহ একাধিক বিষয়ে কাজ শুরু করেছি। মাস্টারপ্ল্যানে কাঁচামালের জন্য আলাদা করে ট্রানশিপমেন্ট শেড প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বছরের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য হয় প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে বছরে প্রায় দুই বিলিয়ন বা ২০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ। বিপরীতে ভারত থেকে আমদানি করা হয় প্রায় ১৪ বিলিয়ন বা ১৪০০ কোটি ডলারের পণ্য।ইতোমধ্যে ভারতের সঙ্গে কম্প্রিহেন্সিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সেপা) চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সেপা স্বাক্ষরিত হলে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ১৯০ শতাংশ এবং বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানি ১৮৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বাংলাদেশ ও ভারতের জিডিপিতে যথাক্রমে ১.৭২ শতাংশ এবং ০.০৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে বলে ঢাকা-দিল্লির যৌথ সমীক্ষায় উঠে এসেছে। এমনটা হলে বাংলাদেশের তিনদিকে ঘিরে থাকা ভারতের পরিকাঠামোহীন স্থলসীমান্তগুলোর মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বাড়বে বলে মনে করছে ভারতের ল্যান্ড পোর্ট অথরিটি। তাই দ্রুতই ভোমরা, চ্যাংড়াবান্ধ্যা, মাহাদিপুর, সুতারকান্দিসহ একাধিক বন্দরের পরিকাঠামো উন্নয়নে কাজ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে তারা।
বানিজ্য ডেস্ক।। 





































