
চলতি বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের। গতকাল মৃত্যুশূন্য দিনে নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৭ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি মাসের চেয়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে দ্বিগুণ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বছরের শুরুতে যে পরিসংখ্যান প্রকাশ পাচ্ছে তাতে গত বছরের তুলনায় সামনের বর্ষায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি ‘ভয়ঙ্কর’ রূপ নিতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন মোট ১ হাজার ২৩১ জন। অন্যদিকে, চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছেন ১ হাজার ১৩০ জন। বর্তমানে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৮৫ জন রোগী।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে ১ হাজার ৫৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ১৪ জন। আর ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৬৯ জন, যার মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে গত বছরের জানুয়ারিতে ৫৬৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। মারা গেছে ছয়জন। আর ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭৮ জন নতুন করে শনাক্ত হয় এবং দুজনের মৃত্যু হয়।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান পরামর্শক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ মানুষের আয়ত্তের মধ্যে। জলবায়ুর পরিবর্তনে পরিস্থিতি কিছুটা প্রভাবিত হচ্ছে। তবে অন্যান্য বিষয়ের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। অনেক দেশে রোগী বেশি থাকলেও আমাদের দেশের মতো এত মৃত্যু নেই।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগ ও রোগী ব্যবস্থাপনার কোনো কার্যক্রমই বিজ্ঞানসম্মতভাবে হচ্ছে না। সব কার্যক্রম হাসপাতালভিত্তিক। প্রয়োজনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ডেঙ্গু শনাক্তের ব্যবস্থা রাখতে হবে। রোগী শনাক্ত হওয়া মানেই তাকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে, এ ধারণা ভুল। যাদের অবস্থা সংকটাপন্ন তাদেরই টারশিয়ারি পর্যায়ের হাসপাতালে আনতে হবে। বাকিদের সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দিতে হবে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রথম ২০০০ সালে ডেঙ্গুকে গুরুত্ব দেয় সরকার। বিশ্বে ১৭৮০ সালে প্রথম ডেঙ্গু দেখা দেয়। এরপর ১৯৫০ সালে এশিয়ার থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে ডেঙ্গু সংক্রমণ ছড়ায়। ১৯৬৩ সালে কলকাতা ও ১৯৬৪ সালে ঢাকায় সংক্রমণ ঘটায় ডেঙ্গু। সে সময় ডেঙ্গুকে ঢাকা ফিভার নামে অভিহিত করা হয়। ২০০০ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত সাড়ে পাঁচ হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর মধ্যে ৯৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০২২ সালে ৬১ হাজার রোগীর মধ্যে ২৮১ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালে এক লাখের বেশি ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায় আর মারা যায় ১৬৪ জন। ২০০০ থেকে ২০২২ সাল- এ ২৩ বছরে ডেঙ্গু রোগীর মোট সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৪৪ হাজার ২৪৬। এর মধ্যে মারা গেছে ৮৫০ রোগী। ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল সর্বোচ্চ। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হয় ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি রোগী। এর মধ্যে ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়।
জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার বলেন, ২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে যে-সংখ্যক ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি শনাক্ত হয়েছে ২০২৩ সালে। এ বছর আগের বছরের চেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত বছর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা একটি সার্ভে করেছিল। এতে যে ভয়াবহতা উঠে এসেছিল, তার রেশ জানুয়ারিতেও চলছে। এডিস মশা এখন শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ নয়, ৬৪টি জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দেখা যাচ্ছে। ডেঙ্গু ভাইরাস এডিস মশার শরীরে ভার্টিক্যাল ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে পরবর্তী বংশধরের মধ্যে সফল ট্রান্সমিশন হচ্ছে। গ্রামে যেসব মশা অসংক্রমিত ছিল তারা এখন সংক্রমিত হয়েছে। রোগী কমাতে হলে মশা কমাতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কমিটির সদস্য ও পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, দ্রুত ছড়িয়ে পড়া একটি সংক্রামক রোগের বিষয়ে কর্মকৌশলে আমাদের ঘাটতি রয়েছে। গত কয়েক দশকে দেশে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। এ নিয়ে এখনো দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে যে পরিস্থিতি রয়েছে তাতে গত বছরের তুলনায় ডেঙ্গু যে আরো ভয়াবহ হবে না, তার নিশ্চয়তা নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানায়, ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগে প্রতি বছর ৪০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ুতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি। এসব অঞ্চলের বেশির ভাগই শহর ও উপশহর। ডেঙ্গু অনেক ক্ষেত্রে উপ-সর্গবিহীন বা হালকা অসুস্থতা তৈরি করে। তবে প্রায়ই এ ভাইরাসে সৃষ্ট জ্বর মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে। ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। প্রাথমিকভাবে শনাক্তকরণ ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা রোগীকে সুস্থ করে ও মৃত্যুহার কমায়।
দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, রোগটি নিয়ন্ত্রণে আমরা স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বিত কাজ করছি। আমরা যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। মনে রাখতে হবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। এ জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। –দিন পরিবর্তন
ঢাকা ব্যুরো।। 







































