
কোটা সংস্কারের দাবিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর গুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ জন ও সরকারি কবি নজরুল কলেজের ১ জন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কয়েক হাজার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা লাঠিসোটা হাতে নিয়ে রায় সাহেব বাজার অতিক্রম করার সময় এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনকারীরা জানান, পুরান ঢাকার আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা এ গুলি বর্ষণ করেছে। গুলিবিদ্ধ হওয়া ৪ জন হলেন- জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ ব্যচের মার্কেটিং বিভাগের এর শিক্ষার্থী অনিক, ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী ফেরদৌস জামান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ১৬ ব্যাচের এইচ এম নাসিম ও কবি নজরুল কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী হাসিব। তাদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ছুরিকাঘাতে তায়াফ নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টটিং বিভাগের এক শিক্ষার্থী আহত হয়ে ন্যাশনাল মেডিকেলে ভর্তি রয়েছেন।
গুলিবিদ্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. আরিফ বলেন, চারজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ও ১ জনকে ছুরিকাঘাতে আহত অবস্থায় পেয়েছি। গুলিবিদ্ধ চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আর ছুরিকাঘাতের একজনকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
এবিষয়ে কোতয়ালী জোনের এএসপি নজরুল বলেন, গুলির খবর শুনেছি। তবে আমরা এক গ্রুপই মিছিল করতে দেখেছি। অন্য গ্রুপ দেখিনি।
এর আগে আজ মঙ্গলবার বিকেল ৩ টা ১০ মিনিটের দিকে স্ট্যাম্প, লাঠি নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সামনে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। পরে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় ঢাকা মহানগর সূত্রাপুর ও বংশাল থানার ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়া দেয়। আগে থেকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা জাতীয় কবি নজরুল কলেজের সামনে অবস্থান নিয়ে ছিলো। এসময় সেখানে শতাধিক চেয়ার ভাংচুর করেন আন্দোলনকারীরা।
পরে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে বিকাল ৪ টা ৪৫ মিনিটে তাঁতিবাজার মোড়ে অবস্থান নেয়। পরে ৫ টা ২৫ এর দিকে তাঁতিবাজার মোড় ত্যাগ করে জবি ক্যাম্পাসের সামনে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। পরে সন্ধ্যা ৭ টায় শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি শেষ করে চলে যায়।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী মাসুদ রানা বলেন, আমরা শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে যাচ্ছি। তবে আমাদের প্রথমে তেড়ে মারতে আসে মহানগর যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আমাদেরকে গুলি করা হয়েছে। চারজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, একের পর এক শিক্ষার্থীদের উপর গুলি করা হচ্ছে। আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যাবে না। এক দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলতে থাকবে। প্রয়োজনে আরো রক্ত দিব।
এসময় শিক্ষার্থীরা- ‘আন্দোলনে হামলা কেনো? প্রশাসন জবাব চাই’, ‘কোটা না মেধা, মেধা, মেধা’, ‘দালালী না রাজপথ, রাজপথ, রাজপথ’ ‘হই-হই রই-রই, ছাত্রলীগ গেলি কই,’ সহ নানা স্লোগান দিতে থাকে।
এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির উদ্দেশ্যে দুপুর ২ টা ৪৫ মিনিটের দিকে বাসে করে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যায়।
★জবি ছাত্রলীগের ৭ নেতার পদত্যাগ
এদিকব কোটা সংস্কার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার করা মন্তব্য ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে সংগঠনের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখা ছাত্রলীগের সাতজন নেতা। রোববার রাত থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত সময়ে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে পদত্যাগের এই ঘোষণা দেন।
পদত্যাগ করা ছাত্রলীগ নেতারা হলেন—জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বাংলা বিভাগের সহ সভাপতি মাহমুদুল হাসান সামি ও রসায়ন বিভাগ শাখার সহ সভাপতি তাওসিফ কবির, মনোবিজ্ঞান বিভাগ শাখার সহ সভাপতি রনি সরকার ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আশিকুর রহমান, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ শাখার সহ সভাপতি মাহমুদুল হাসান নোমান, বাংলা বিভাগের আফসানা মিমি এবং শিঞ্জন বসাক।
রনি সরকার ফেসবুকে লেখেন, আমি রনি সরকার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান শাখা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি পদ থেকে সজ্ঞানে পদত্যাগ করছি।
শিঞ্জক বসাক ফেসবুকে লেখেন, আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ শাখা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি পদ থেকে স্ব ইচ্ছায় ও সজ্ঞানে পদত্যাগ করছি। সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে বাকী দিন ট্যাগ লাইনে কাটাতে চাই।
★জবি উপাচার্যের সঙ্গে ছাত্র প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। এ দিন সন্ধ্যা ৭টায় উপাচার্যের সভাকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র প্রতিনিধিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী শাহিন আলম, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ইভান তাহসীব, লোকপ্রশাসন বিভাগের স্বর্ণা ও আব্দুল্লাহ রাফি।
এ সময় ছাত্র প্রতিনিধিরা ছাত্রলীগকে কেন এখনো প্রশাসন সাপোর্ট দিচ্ছে, বাস দিচ্ছে, গুলিবিদ্ধের ঘটনায় কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ মামলা করা হবে না, কেন আমাদের শিক্ষকরা আমাদের যৌক্তিক আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতি জানাচ্ছে না সহ ইত্যাদি প্রশ্ন করেন। এ ছাড়া ছাত্রী হলের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, এক দফা দাবির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ ও শিক্ষার্থীদের যাবতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটা র্যাপিড টিম গঠনের প্রস্তাব করেন প্রতিনিধিরা।
এ সময় উপাচার্য বলেন, আমাদের সেসব শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ ও আহত হয়েছে, তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। আমরা তোমাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। সহিংসতা দিয়ে আন্দোলন সফলতা অর্জন হয়না। সবার জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, আমার যতটুকু সামর্থ্য আছে, আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করবো। তার মানে এই নয় যে, তিনি আমাদের কথা মেনে নিবেন? আহত শিক্ষার্থীদের সকল চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নারী হলের সকল শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো। কেউ তাদের কিছু বলবে না। হল প্রভোস্টকে আমরা নির্দেশনা দিয়ে দিব। ####
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
জবি প্রতিনিধি।। 





































