
অর্থনীতির গতি যে শ্লথ হয়ে গেছে রাজস্ব আহরণের চিত্র দেখলেই তা পরিষ্কার হয়ে যায়। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে রাজস্ব ঘাটতি বেড়েই চলছে। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি তথা প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম তিন মাস জুলাই-সেপ্টেম্বরে সার্বিকভাবে শুল্ক ও কর আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর কোনো মাসেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি এনবিআর।
এনবিআরের হিসাব অনুসারে, গত জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৭০ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। আর অর্থবছরের তিন মাসে রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।
সমাপ্ত হওয়া সেপ্টেম্বরে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। যেখানে গত অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২৮ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে আদায় হয়েছে ২৯ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীল থাকলে রাজস্ব আহরণ ভালো হয়। আর অর্থনীতি মন্দা থাকলে রাজস্ব আদায় কমে যায়। বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফ পূর্ভাবাসে বলেছে, বাংলাদেশে চলতি বছর জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার কমে দাঁড়াবে ৪ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলেছেন, জুলাই মাসের শুরু থেকে আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন হয়। তখন প্রায় সবকিছু বন্ধ ছিল বললেই চলে। সাধারণ ছুটির পাশাপাশি কারফিউও ছিল বেশ কয়েক দিন। এ সবের প্রভাব পড়েছে শুল্ক-কর আদায়ে। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে সরকার পরিবর্তনের পরও আবার ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। যে কারণে কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আদায় করা যায়নি বলে জানান এনবিআরের শুল্ক ও কর বিভাগের কর্মকর্তারা।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ের চেয়েও কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। গতবার জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সব মিলিয়ে ৭৪ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকার শুল্ক-কর আদায় হয়েছিল। এর চেয়ে ৪ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে এবার, অর্থাৎ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
তিন মাস ধরে লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে: চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পুরো প্রথম প্রান্তিকেই (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রাজস্ব আদায়ে মন্দাভাব চলছে। কোনো মাসেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি এনবিআর। জুলাই মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ২৫ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ২০ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম মাসেই রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
পরের মাস আগস্টেও একই অবস্থা দেখা গেছে। ওই মাসে ৩১ হাজার ৬০৭ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২১ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। ওই মাসে রাজস্ব আয়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হয়। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বর মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩৯ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ২ কোটি টাকা। এই মাসেও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও আয়কর-এই তিন খাতের কোনোটিতেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। তিন খাতেই আগের বছরের চেয়ে রাজস্ব আদায় কমেছে, অর্থাৎ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। তিন মাসে ঘাটতি হয় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার মতো। এই খাতে আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। এ সময়ে আদায় হয়েছে ২৩ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ কোটি টাকা কম।
আমদানি খাতে তিন মাসে ২৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ২২ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। এই খাতে ঘাটতি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে দেড় হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে।
গত জুলাই-সেপ্টেম্বরে ভ্যাট বা মূসক আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৮ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। ভ্যাট আদায় হয়েছে ২৫ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। এ সময়ে এই খাতের লক্ষ্য ছিল ৩৪ হাজার ১৮১ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে তিন হাজার কোটি টাকার মতো কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে এনবিআরের জন্য সব মিলিয়ে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার শুল্ক ও কর, অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এনবিআর কর্মকর্তারা মনে করেন, বছরের শেষের দিকে কর আদায়ে গতি বাড়বে।
আইএমএফর সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ কর্মসূচি চালু রয়েছে। এর মধ্যে তিন কিস্তিতে ২৩০ কোটি ডলার ছাড় পেয়েছে বাংলাদেশ। বাকি চার কিস্তি পাওয়ার কথা। প্রতি কিস্তির টাকা ছাড়ের আগে কিছু শর্ত দেয় সংস্থাটি। এর মধ্যে রাজস্ব আদায়ে শর্ত অন্যতম। এই খাতে বড় দুটি শর্ত হলো প্রতি বছর জিডিপির দেড় শতাংশ পরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে ২০২৭ সালের মধ্যে সব ধরনের করছাড় তুলে দিতে হবে এবং আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কৌশল ঠিক করতে হবে। সূত্র: খবরের কাগজ
নিজস্ব প্রতিবেদক 







































