সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬, ২৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অবাঙালি সামি আহম্মেদ খানের অবদান 

সামি আহম্মেদ খান

১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাঙালি পেয়ছে একটি লাল সবুজের পতাকা। সৃষ্টি হয়েছে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের। মাহান স্বাধীনতা যুদ্ধে রনাঙ্গনে অংশগ্রহন না করলেও তিনি ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন বাঙালির এই স্বাধীনতা সংগ্রামে। বলছি ভারতের বিহারি সামি আহম্মেদ খানের কথা। তিনি জন্মগ্রহন করেন ১৯৫৪ সালের ১৫ অক্টোবর ভারতের.  বিহার প্রদেশের বর্তমান বাইশালি জেলার পোখড়ায়রা  গ্রামে পিতা নবী হোসেন খানের ঘরে। পিতার মৃত্যুর পরে মায়ের হাত ধরে সামি আহম্মেদ খান তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান বর্তমান বাংলাদেশে আসেন এবং রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার  ইলিশকোল গ্রামে বসবাস শুরু করেন।  তথ্য মতে ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশে  বিভক্ত হয় ও ১৯৫৫ সালে এই পূর্ববাংলার নাম পরিবর্তন করে পূর্বপাকিস্তান করা হয় এবং ১৯৭১ সালে এটি বাংলাদেশে রুপান্তরিত হয়।
‘৭১ এর ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানি মিলিটারিরা নির্বিচারে নিরীহ বাঙালিদের হত্যা করতে শুরু করে।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে মুক্তিকামী মানুষ। রাজবাড়ী  বালিয়াকান্দি এলাকায় পাকিস্তান মিলিটারি মানুষের ওপর  হামলা চালায়  তখন সামি আহম্মেদ খান তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসেন। অবাঙালি বিহারী হয়েও তিনি এই দেশ ও দেশের মানুষ কে ভালবেসেছিল এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে এই এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে তিনি কাজ করেছেন। ভূমিকা রেখেছেন বাঙালির এই স্বাধীনতা যুদ্ধে। ইতিমধ্যে তার চোখে দেখা ও তার মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কাজ করার গল্প  মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে জ-৩৮২৩৮ নম্বরে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
অশ্রুশিক্ত নয়নে সামি আহম্মেদ খান আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে এদেশের পক্ষে কাজ করেছি। পাকবাহিনী থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষা করেছি। কোন মানুষ যেন হামলা নির্যাতনের স্বীকার না হয় সে চেষ্টা করেছি। এতো কিছু করার পরেও পাইনি সরকারী স্বীকৃতি। শেষ বয়সে আমার চাওয়া নিজের জন্য না, আমরা সন্তানরা যাতে সমাজে মাথা উচু করে বাঁচতে পারে স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের পিতার অবদান গর্ভকরে বলতে পারে। এ জন্য চাই সরকারীভাবে স্বীকৃতি।
ব্যক্তিজীবনে দুই ছেলে রয়েছে তার। বড় ছেলে গিয়াস উদ্দিন খান (৪৩) একটি সিমেন্ট কোম্পানীতে মাগুরা জেলায় চাকরি করেন। ছোট ছেলে মো. শরিফ খান সে প্রতিবন্ধী। সেই  বাড়ী দেখাশোনা করে।
ইলিশকোল গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা মোতালেব আলী শেখ (৭৭) ও মোঃ আকবর আলী শেখ (৮০) ‘৭১ এর সেই পরিস্থিতির বর্ননা দিয়ে বলেন, এই আড়কান্দি রেলস্টেশন থেকে মিলিটারি  ইলিশকোল গ্রামে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের জন্য যখন আসে  গ্রামের সকল মানুষ আতঙ্কিত হয়ে সামি আহম্মেদের বাড়িতে গেলে সামি আহম্মেদ পাকিস্তানি মিলিটারির সাথে কথা বলে তাদের ফিরিয়ে দেয় এবং অগ্নিসংযোগ লুটপাট থেকে এই গ্রাম রক্ষা করেন।
পাক হানাদারবাহিনী বহরপুরের তেঁতুলিয়া গ্রাম আগুনে জালিয়ে দেয় এবং প্রায় ২৫-৩০ জনকে আটক করে রেলগেটে নিয়ে যায়।  সামি আহম্মেদ খান খবর পেয়ে সেখানে পৌছে  তাদের বুঝিয়ে আটককৃতদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। সামি আহম্মেদ খান ও তার মা জহুরা বেগম পাক হানাদারবাহিনী থেকে আমাদের এই এলাকা রক্ষা করেছে। ওই সময় প্রতি মুহূর্তে আমাদের আতঙ্ক কাজ করেছে কখন কি হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে স্থানীয় সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য অশোক লাহিড়ী বলেন, সামী আহম্মেদ খান অ-বাঙালি বিহারী হলেও স্বাধীনতার স্বপক্ষে কাজ করেছেন। তিনি এই এলাকায় বসবাস করে যুদ্ধকালীন সময় এরো আগে থেকেই। আমাদের এলাকায় যাতে কোন বিহারী ও পাক-হানাদারবাহিনী আসতে না পারে সেই ব্যবস্থাও তিনি করেছেন। অপর ঘটনার বর্ননা দিয়ে বালিয়াকান্দি ইউনিয়নের যাবরকোল এলাকার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল খালেক মোল্লা (৭৪) বলেন, তৎকালীন চন্দনা নদীর খেয়া ঘাটে ছোট নৌকা নিয়ে যাচ্ছিলাম তখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আমাকে গুলি করার উদ্দেশ্যে বন্দুক তাক করে, তখন সামি আহম্মেদ তাদের থেকে আমাকে রক্ষা করে। স্থানীয় ডা.  সেলিম এর ভাই আবজাল ডাক্তারকে বালিয়াকান্দি থেকে মিলিটারি ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে, পরে সে খোঁজ পেয়ে চলে আসে এবং মিলিটারি হাত থেকে তাকেও রক্ষা করে। শুধু তিনি না তার মা’ও আমাদের জন্য কাজ করেছেন। পাক-হানাদারবাহিনীর গাড়ি আসলে তার মা তাদের ভুল বুঝিয়ে ফিরিয়ে দিতেন। সামী অনেক সময় আমাদের সাথে থেকেছে। তিনি পাক হানাদারবাহিনীর তথ্য আমাদেন দিতেন। সামি আহম্মেদ ও তার মা পাক হানাদারবাহিনীর লুটপাট অগ্নিসংযোগ থেকে স্থানীয়দের রক্ষা করেছে। তার সাথে আমার এখনো যোগাযোগ আছে। সামি আহম্মেদ সশস্ত্র যুদ্ধ অংশ গ্রহন না করলেও তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তার স্বীকৃতি পাওয়া উচিত বলে মনে করেন সুধিজনরা।
জনপ্রিয়

প্রতিদিন ৪টি ডিম খেলে শরীরে কী হতে পারে?

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অবাঙালি সামি আহম্মেদ খানের অবদান 

প্রকাশের সময় : ০২:১৮:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০২৪
১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাঙালি পেয়ছে একটি লাল সবুজের পতাকা। সৃষ্টি হয়েছে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের। মাহান স্বাধীনতা যুদ্ধে রনাঙ্গনে অংশগ্রহন না করলেও তিনি ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন বাঙালির এই স্বাধীনতা সংগ্রামে। বলছি ভারতের বিহারি সামি আহম্মেদ খানের কথা। তিনি জন্মগ্রহন করেন ১৯৫৪ সালের ১৫ অক্টোবর ভারতের.  বিহার প্রদেশের বর্তমান বাইশালি জেলার পোখড়ায়রা  গ্রামে পিতা নবী হোসেন খানের ঘরে। পিতার মৃত্যুর পরে মায়ের হাত ধরে সামি আহম্মেদ খান তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান বর্তমান বাংলাদেশে আসেন এবং রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার  ইলিশকোল গ্রামে বসবাস শুরু করেন।  তথ্য মতে ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশে  বিভক্ত হয় ও ১৯৫৫ সালে এই পূর্ববাংলার নাম পরিবর্তন করে পূর্বপাকিস্তান করা হয় এবং ১৯৭১ সালে এটি বাংলাদেশে রুপান্তরিত হয়।
‘৭১ এর ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানি মিলিটারিরা নির্বিচারে নিরীহ বাঙালিদের হত্যা করতে শুরু করে।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে মুক্তিকামী মানুষ। রাজবাড়ী  বালিয়াকান্দি এলাকায় পাকিস্তান মিলিটারি মানুষের ওপর  হামলা চালায়  তখন সামি আহম্মেদ খান তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসেন। অবাঙালি বিহারী হয়েও তিনি এই দেশ ও দেশের মানুষ কে ভালবেসেছিল এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে এই এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে তিনি কাজ করেছেন। ভূমিকা রেখেছেন বাঙালির এই স্বাধীনতা যুদ্ধে। ইতিমধ্যে তার চোখে দেখা ও তার মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কাজ করার গল্প  মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে জ-৩৮২৩৮ নম্বরে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
অশ্রুশিক্ত নয়নে সামি আহম্মেদ খান আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে এদেশের পক্ষে কাজ করেছি। পাকবাহিনী থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষা করেছি। কোন মানুষ যেন হামলা নির্যাতনের স্বীকার না হয় সে চেষ্টা করেছি। এতো কিছু করার পরেও পাইনি সরকারী স্বীকৃতি। শেষ বয়সে আমার চাওয়া নিজের জন্য না, আমরা সন্তানরা যাতে সমাজে মাথা উচু করে বাঁচতে পারে স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের পিতার অবদান গর্ভকরে বলতে পারে। এ জন্য চাই সরকারীভাবে স্বীকৃতি।
ব্যক্তিজীবনে দুই ছেলে রয়েছে তার। বড় ছেলে গিয়াস উদ্দিন খান (৪৩) একটি সিমেন্ট কোম্পানীতে মাগুরা জেলায় চাকরি করেন। ছোট ছেলে মো. শরিফ খান সে প্রতিবন্ধী। সেই  বাড়ী দেখাশোনা করে।
ইলিশকোল গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা মোতালেব আলী শেখ (৭৭) ও মোঃ আকবর আলী শেখ (৮০) ‘৭১ এর সেই পরিস্থিতির বর্ননা দিয়ে বলেন, এই আড়কান্দি রেলস্টেশন থেকে মিলিটারি  ইলিশকোল গ্রামে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের জন্য যখন আসে  গ্রামের সকল মানুষ আতঙ্কিত হয়ে সামি আহম্মেদের বাড়িতে গেলে সামি আহম্মেদ পাকিস্তানি মিলিটারির সাথে কথা বলে তাদের ফিরিয়ে দেয় এবং অগ্নিসংযোগ লুটপাট থেকে এই গ্রাম রক্ষা করেন।
পাক হানাদারবাহিনী বহরপুরের তেঁতুলিয়া গ্রাম আগুনে জালিয়ে দেয় এবং প্রায় ২৫-৩০ জনকে আটক করে রেলগেটে নিয়ে যায়।  সামি আহম্মেদ খান খবর পেয়ে সেখানে পৌছে  তাদের বুঝিয়ে আটককৃতদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। সামি আহম্মেদ খান ও তার মা জহুরা বেগম পাক হানাদারবাহিনী থেকে আমাদের এই এলাকা রক্ষা করেছে। ওই সময় প্রতি মুহূর্তে আমাদের আতঙ্ক কাজ করেছে কখন কি হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে স্থানীয় সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য অশোক লাহিড়ী বলেন, সামী আহম্মেদ খান অ-বাঙালি বিহারী হলেও স্বাধীনতার স্বপক্ষে কাজ করেছেন। তিনি এই এলাকায় বসবাস করে যুদ্ধকালীন সময় এরো আগে থেকেই। আমাদের এলাকায় যাতে কোন বিহারী ও পাক-হানাদারবাহিনী আসতে না পারে সেই ব্যবস্থাও তিনি করেছেন। অপর ঘটনার বর্ননা দিয়ে বালিয়াকান্দি ইউনিয়নের যাবরকোল এলাকার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল খালেক মোল্লা (৭৪) বলেন, তৎকালীন চন্দনা নদীর খেয়া ঘাটে ছোট নৌকা নিয়ে যাচ্ছিলাম তখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আমাকে গুলি করার উদ্দেশ্যে বন্দুক তাক করে, তখন সামি আহম্মেদ তাদের থেকে আমাকে রক্ষা করে। স্থানীয় ডা.  সেলিম এর ভাই আবজাল ডাক্তারকে বালিয়াকান্দি থেকে মিলিটারি ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে, পরে সে খোঁজ পেয়ে চলে আসে এবং মিলিটারি হাত থেকে তাকেও রক্ষা করে। শুধু তিনি না তার মা’ও আমাদের জন্য কাজ করেছেন। পাক-হানাদারবাহিনীর গাড়ি আসলে তার মা তাদের ভুল বুঝিয়ে ফিরিয়ে দিতেন। সামী অনেক সময় আমাদের সাথে থেকেছে। তিনি পাক হানাদারবাহিনীর তথ্য আমাদেন দিতেন। সামি আহম্মেদ ও তার মা পাক হানাদারবাহিনীর লুটপাট অগ্নিসংযোগ থেকে স্থানীয়দের রক্ষা করেছে। তার সাথে আমার এখনো যোগাযোগ আছে। সামি আহম্মেদ সশস্ত্র যুদ্ধ অংশ গ্রহন না করলেও তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তার স্বীকৃতি পাওয়া উচিত বলে মনে করেন সুধিজনরা।