সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাজবাড়ীতে খেজুর গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত গাছিরা

মেহেদী হাসান,  রাজবাড়ী 
গ্রাম বাংলায় ঐতিহ্যবাহী খেজুর রস নিয়ে অনেক গীতিকার লিখেছেন রিনোদনমুলক গান। ঋিনাইদহ অঞ্চলের আঞ্চলিক গান “ঠিলে ধুয়ে দে বউ গাছ কাটতি যাবো, রস, গুড়, পাটালি বেঁচে গয়না গড়ে দেবো, সাঁজে নস পাইরে আনে জাও নান্দে খাবো।” ফরিদপুর অঞ্চলের খেজুর রস নিয়ে রচিত হয়েছে “আইলো টালের কাল, ধরে কম্পো হাল, বিয়ান বেলা খাজুর গাছে রস পারিতে ব্যাস্ত তাহে গাছি রে, সেই রসেতে পিঠে পায়েস হয় যে মজার খাজুর গুড়, ওভাই খাবার চালি চলে আসো আমাগের বাড়ী ফরেদপুর।” এমন সব গানের কথায়, শীতের আভাস আসতে না আসতেই রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার গাছিরা আগাম খেজুর গাছ পরিচর্জায় ব্যস্ত সময় পার করছে। দিনে কিছুটা গরম হলেও সন্ধ্যা হলেই শীতের আগমন বার্তা চলে এসেছে। সকালে শিশির ভেজা পথ, যা শীতের আগমনের বার্তা জানান দিচ্ছে।
খেজুর গাছ থেকে বিশেষ ভাবে রস সংগ্রহ করতে পারদর্শি তাদেরকে গাছি বলা হয়। আগাম রস পাবার আশায় উপজেলার বহরপুর, চর-ফরিদপুর, বাড়াদী, নারায়নপুর, শহীদনগর, ভাতসালা, রাজধরপুর, বাওনাড়া গ্রামের বেশ কয়েকজন গাছি এ বছর হাতের নাগালে থাকা খেজুর গাছগুলি পরিচর্যার জন্য কাজ শুরু করেছে। শীতের মৌসুম শুরু হতে না হতেই খেজুরের রস আহরণের জন্য অন্যান্য গাছিরা খেজুর গাছ প্রস্তুত করতে শুরু করেছে। গাছিরা হাতে দা নিয়ে ও কোমরে ডোঙ্গা বেঁধে নিপুণ হাতে গাছ পরিষ্কার করছে। মৌসুমি খেজুরের রস দিয়েই জনপদে শুরু হয় শীতের আমেজ। শীত যত বাড়বে খেজুর রসের মিষ্টিও তত বাড়বে। শীতের দিনের সবচেয়ে আকর্ষণ দিনের শুরুতে খেজুরের রস, সন্ধ্যা রস ও সুস্বাদু গুড়-পাটালি। আর সুস্বাদু পিঠা, পায়েস তৈরিতে আবহমান কাল থেকে খেজুর গুড় পেয়ে থাকে কৃষকরা।
খেজুরের শুধু রসই নয়, পাটালি, নলেন গুড় ছাড়া শীতের পিঠা পার্বন জমেই ঊঠেনা। ধারালো দা (ছ্যান) দিয়ে খেজুর গাছের সোনালী অংশ বের করা হয়, যাকে বলে চাঁচ দেওয়া ও সপ্তাহ খানেক পর নলি স্থাপনের মাধ্যমে শুরু হবে সুস্বাদু খেজুর রস আহরণের কাজ। প্রভাতের শিশির ভেজা ঘাস জানান দিচ্ছে শীতের আগমনি বার্তা। এবছর সঠিক সময়ে শীতের আগমন হওয়াতে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে খেজুরের রস আহরণের জন্য গাছিরা আগাম খেজুর গাছগুলো প্রস্তুত শুরু করেছে। আগে থেকে রস ও গুড় পেলে খেজুর গাছ মালিকরা অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হবে। অল্পদিনের মধ্যে খেজুর গাছে কল স্থাপন এবং তারপর শুরু হবে সুস্বাদু খেজুর রস সংগ্রহের কাজ।
খেজুরের রস দিয়ে তৈরি করা নলের গুড়, ঝোলা গুড়, দানা গুড় ও পাটালি গুড়ের মিষ্টি গন্ধেই যেন অর্ধভোজন হয়ে যায়। যারা আগাম খেজুর গাছ তুলছে তারা বেশি দামে রস, গুড়, পাটালি বিক্রি করে অধিক লাভবান হবেন এমন টা আশা করছে। শীতের সকালে অনেকেই কিনতে আসেন খেজুরের রস। ছোট বড় বিভিন্ন রকমের খেজুর গাছে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই গাছিরা কোমরে রশি বেঁধে গাছে ঝুলে গাছ ছালছে।
অল্প ক’দিনের মধ্যে বাতাসে চিরসবুজের বুকচিরা অপরূপ সৌন্দর্যে সকলের মন মাতিয়ে তুলবে মিষ্টি খেজুর রস ও গুড়। কাক ডাকা ভোর থেকে চলবে রস সংগ্রহ। সন্ধ্যায় চলবে গাছ কাটার কাজ। চলতি মৌসুমে কিছুটা আগেই বিভিন্ন গাঁয়ের প্রান্তিক গাছিরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ জনপদে গ্রামে গ্রামে সকালের শিশিরের সঙ্গে অনুভূত হচ্ছে শীত। সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ ও গাছি।
বালিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি অফিসার রতন কুমার ঘোষ বলেন, অধিকাংশ পতিত জমিতে, ক্ষেতের আইলে, ঝোপঝাড়ের পাশে ও রাস্তার দু’ধার দিয়ে ছিল অসংখ্য খেজুর গাছ। খেজুর গাছ আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য তথা জীবনধারায় মিশে আছে। এছাড়া খেজুরের পাতা জ্বালানি কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, কালের বিবর্তনে বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।
জনপ্রিয়

চৌগাছার ইজিবাইক–প্রাইভেটকার মুখোমুখি সংঘর্ষ, শিক্ষার্থীসহ আহত ৭

রাজবাড়ীতে খেজুর গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত গাছিরা

প্রকাশের সময় : ০৪:২৫:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫
মেহেদী হাসান,  রাজবাড়ী 
গ্রাম বাংলায় ঐতিহ্যবাহী খেজুর রস নিয়ে অনেক গীতিকার লিখেছেন রিনোদনমুলক গান। ঋিনাইদহ অঞ্চলের আঞ্চলিক গান “ঠিলে ধুয়ে দে বউ গাছ কাটতি যাবো, রস, গুড়, পাটালি বেঁচে গয়না গড়ে দেবো, সাঁজে নস পাইরে আনে জাও নান্দে খাবো।” ফরিদপুর অঞ্চলের খেজুর রস নিয়ে রচিত হয়েছে “আইলো টালের কাল, ধরে কম্পো হাল, বিয়ান বেলা খাজুর গাছে রস পারিতে ব্যাস্ত তাহে গাছি রে, সেই রসেতে পিঠে পায়েস হয় যে মজার খাজুর গুড়, ওভাই খাবার চালি চলে আসো আমাগের বাড়ী ফরেদপুর।” এমন সব গানের কথায়, শীতের আভাস আসতে না আসতেই রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার গাছিরা আগাম খেজুর গাছ পরিচর্জায় ব্যস্ত সময় পার করছে। দিনে কিছুটা গরম হলেও সন্ধ্যা হলেই শীতের আগমন বার্তা চলে এসেছে। সকালে শিশির ভেজা পথ, যা শীতের আগমনের বার্তা জানান দিচ্ছে।
খেজুর গাছ থেকে বিশেষ ভাবে রস সংগ্রহ করতে পারদর্শি তাদেরকে গাছি বলা হয়। আগাম রস পাবার আশায় উপজেলার বহরপুর, চর-ফরিদপুর, বাড়াদী, নারায়নপুর, শহীদনগর, ভাতসালা, রাজধরপুর, বাওনাড়া গ্রামের বেশ কয়েকজন গাছি এ বছর হাতের নাগালে থাকা খেজুর গাছগুলি পরিচর্যার জন্য কাজ শুরু করেছে। শীতের মৌসুম শুরু হতে না হতেই খেজুরের রস আহরণের জন্য অন্যান্য গাছিরা খেজুর গাছ প্রস্তুত করতে শুরু করেছে। গাছিরা হাতে দা নিয়ে ও কোমরে ডোঙ্গা বেঁধে নিপুণ হাতে গাছ পরিষ্কার করছে। মৌসুমি খেজুরের রস দিয়েই জনপদে শুরু হয় শীতের আমেজ। শীত যত বাড়বে খেজুর রসের মিষ্টিও তত বাড়বে। শীতের দিনের সবচেয়ে আকর্ষণ দিনের শুরুতে খেজুরের রস, সন্ধ্যা রস ও সুস্বাদু গুড়-পাটালি। আর সুস্বাদু পিঠা, পায়েস তৈরিতে আবহমান কাল থেকে খেজুর গুড় পেয়ে থাকে কৃষকরা।
খেজুরের শুধু রসই নয়, পাটালি, নলেন গুড় ছাড়া শীতের পিঠা পার্বন জমেই ঊঠেনা। ধারালো দা (ছ্যান) দিয়ে খেজুর গাছের সোনালী অংশ বের করা হয়, যাকে বলে চাঁচ দেওয়া ও সপ্তাহ খানেক পর নলি স্থাপনের মাধ্যমে শুরু হবে সুস্বাদু খেজুর রস আহরণের কাজ। প্রভাতের শিশির ভেজা ঘাস জানান দিচ্ছে শীতের আগমনি বার্তা। এবছর সঠিক সময়ে শীতের আগমন হওয়াতে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে খেজুরের রস আহরণের জন্য গাছিরা আগাম খেজুর গাছগুলো প্রস্তুত শুরু করেছে। আগে থেকে রস ও গুড় পেলে খেজুর গাছ মালিকরা অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হবে। অল্পদিনের মধ্যে খেজুর গাছে কল স্থাপন এবং তারপর শুরু হবে সুস্বাদু খেজুর রস সংগ্রহের কাজ।
খেজুরের রস দিয়ে তৈরি করা নলের গুড়, ঝোলা গুড়, দানা গুড় ও পাটালি গুড়ের মিষ্টি গন্ধেই যেন অর্ধভোজন হয়ে যায়। যারা আগাম খেজুর গাছ তুলছে তারা বেশি দামে রস, গুড়, পাটালি বিক্রি করে অধিক লাভবান হবেন এমন টা আশা করছে। শীতের সকালে অনেকেই কিনতে আসেন খেজুরের রস। ছোট বড় বিভিন্ন রকমের খেজুর গাছে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই গাছিরা কোমরে রশি বেঁধে গাছে ঝুলে গাছ ছালছে।
অল্প ক’দিনের মধ্যে বাতাসে চিরসবুজের বুকচিরা অপরূপ সৌন্দর্যে সকলের মন মাতিয়ে তুলবে মিষ্টি খেজুর রস ও গুড়। কাক ডাকা ভোর থেকে চলবে রস সংগ্রহ। সন্ধ্যায় চলবে গাছ কাটার কাজ। চলতি মৌসুমে কিছুটা আগেই বিভিন্ন গাঁয়ের প্রান্তিক গাছিরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ জনপদে গ্রামে গ্রামে সকালের শিশিরের সঙ্গে অনুভূত হচ্ছে শীত। সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ ও গাছি।
বালিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি অফিসার রতন কুমার ঘোষ বলেন, অধিকাংশ পতিত জমিতে, ক্ষেতের আইলে, ঝোপঝাড়ের পাশে ও রাস্তার দু’ধার দিয়ে ছিল অসংখ্য খেজুর গাছ। খেজুর গাছ আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য তথা জীবনধারায় মিশে আছে। এছাড়া খেজুরের পাতা জ্বালানি কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, কালের বিবর্তনে বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।