বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভেনেজুয়েলায় রাষ্ট্রগঠনে ট্রাম্পের জড়ানোর আশঙ্কায় রিপাবলিকানরা উদ্বিগ্ন

ইমা এলিস, নিউ ইয়র্ক 

ভেনেজুয়েলায় নতুন করে ‘নেশন–বিল্ডিং’ বা রাষ্ট্রগঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়তে পারে এই আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন রিপাবলিকানরা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে যেটি স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এখন সেটির দিকেই তিনি এগোচ্ছেন কি না তা নিয়েই দলের ভেতরে প্রশ্ন বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার দায়িত্ব নিতে পারে এমন সম্ভাবনা মাগা শিবিরেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। উভয় দলের আইনপ্রণেতারাই জানতে চাইছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততার মাত্রা কতটা হবে এবং ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো পুনর্গঠনে যাকে ট্রাম্প বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন করদাতাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে কি না।

সিনেট রিপাবলিকান নেতৃত্ব দলের সদস্য সিনেটর শেলি মুর ক্যাপিটো বলেন, আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমাদের দেশ আরেকটি দেশের জন্য সরকার গঠন বা রাষ্ট্রগঠনের পথে যেতে চায় না, বিশেষ করে আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতার পর।

শনিবার সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের এই ঘোষণা আমরা ভেনেজুয়েলা চালাব এবং প্রয়োজনে মাটিতে সেনা নামাতেও আমরা ভয় পাই না, কিছু রিপাবলিকানকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।

রিপাবলিকান কৌশলবিদ ও সাবেক সিনেট সহকারী ব্রায়ান ডার্লিং বলেন, আমেরিকা ফার্স্ট মাগা আন্দোলন ট্রাম্পের বক্তব্য শুনে আশা করছে এটা কেবল শক্ত কথা, বাস্তবে যেন আমরা ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো পথে না যাই যেখানে সেনা পাঠিয়ে অন্য দেশের পুলিশ ও কূটনীতিকের ভূমিকায় নামতে হয়। তিনি যোগ করেন, সত্য কথা হলো, কেউই ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্ব চাইবে না।

উত্তর ক্যারোলাইনার সিনেটর থম টিলিস বলেন, ভেনেজুয়েলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সামরিক বাহিনী মোতায়েনের তিনি ১০০ শতাংশ বিরোধিতা করবেন। সোমবার তিনি বলেন, সমস্যা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট বলেছেন আমরা দেশটি চালাব, কিন্তু বাস্তবে আমাদের সেখানে কোনো সেনা নেই। ফোন কূটনীতির বাইরে আমাদের সেই ক্ষমতা নেই—তাই এই সপ্তাহে কী হয়, তা দেখা যাক।

তিনি আরও বলেন, ভেনেজুয়েলার জনগণ একটি বৈধভাবে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব পাওয়ার অধিকারী। হয়তো বিশেষ নির্বাচন সমর্থন করা যেতে পারে, পর্যবেক্ষক পাঠানো যেতে পারে কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার তাদেরই।

কেন্টাকির সিনেটর র‍্যান্ড পল বলেন, ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা চালানো ও মার্কিন কোম্পানিগুলোকে দেশটির তেলে প্রবেশাধিকার দেওয়ার বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ভেনেজুয়েলানদের ইতিবাচক মনোভাব নষ্ট করতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।

তিনি বলেন, মাদুরো চলে যাওয়ায় অনেকে খুশি। কিন্তু যদি বলা হয়—আমরা আসছি, আমাদের তেল কোম্পানিগুলো আনছি, আমরা দখল নিচ্ছি—তাহলে সেটা উনিশ শতকের মতো শোনায়, এবং আমি মনে করি না এতে প্রত্যাশিত ফল আসবে।

যদিও বেশিরভাগ রিপাবলিকান কারাকাসে সামরিক ঘাঁটি থেকে মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরে নিউইয়র্কে বিচারের মুখোমুখি করার ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন, তবু পরবর্তী ধাপে যুক্তরাষ্ট্র কতটা সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে জড়াবে—সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

ক্যাপিটো বলেন, তিনি মনে করেন ট্রাম্প বড় ধরনের সেনা মোতায়েন ছাড়াই ভেনেজুয়েলার ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া প্রভাবিত করতে চান, তবে তাঁর লক্ষ্য আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার।

সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুন বলেন, তিনি প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা সম্পর্কে আরও জানতে চান। তিনি বলেন, আমরা ব্রিফিং নেব এবং প্রশ্ন করব এর মানে কী।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা চালানো বক্তব্য কিছুটা নরম করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দৈনন্দিন শাসন পরিচালনা করবে না; বরং তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নতুন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

এর আগে, ৩ জানুয়ারির অভিযানের আগেই কিছু রিপাবলিকান সতর্ক করেছিলেন যে, ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তন বা সেনা মোতায়েন উল্টো ফল দিতে পারে।

রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৭২ শতাংশ আমেরিকান আশঙ্কা করছেন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় অতিরিক্তভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে। জরিপে মাত্র ৩৩ শতাংশ মানুষ মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযানে সমর্থন জানিয়েছেন।

২০১৬ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হওয়ার সময় ট্রাম্প নেশন–বিল্ডিংয়ের বিরোধিতা করেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, আমার লক্ষ্য এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি গড়া, যেখানে আমেরিকা প্রথম।

এদিকে, ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, ট্রাম্প সাধারণ মানুষের চেয়ে বড় তেল কোম্পানির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। সিনেট ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেন, আমাদের বাজারদর কমানো, ডে-কেয়ার সাশ্রয়ী করা এগুলোই আমেরিকানরা চায়, ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন নয়।

কিছু রিপাবলিকান আবার ইরাক যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা টানছেন। সাবেক কংগ্রেসম্যান রন পল বলেন, রেজিম পরিবর্তন আর নেশন–বিল্ডিং আবার ফিরে এসেছে।

এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে মার্জোরি টেইলর গ্রিন বলেন, মাদুরোকে ধরার অভিযান ওয়াশিংটনের সেই পুরোনো কৌশলপুস্তক, যা আমেরিকান জনগণের সেবা করে না।

জনপ্রিয়

বিএনপি জনগণের ভোটে ক্ষমতায় যেতে চায়, পেছনের দরজা দিয়ে নয়: ডা. শাহাদাত 

ভেনেজুয়েলায় রাষ্ট্রগঠনে ট্রাম্পের জড়ানোর আশঙ্কায় রিপাবলিকানরা উদ্বিগ্ন

প্রকাশের সময় : ১০:২৫:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬

ইমা এলিস, নিউ ইয়র্ক 

ভেনেজুয়েলায় নতুন করে ‘নেশন–বিল্ডিং’ বা রাষ্ট্রগঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়তে পারে এই আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন রিপাবলিকানরা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে যেটি স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এখন সেটির দিকেই তিনি এগোচ্ছেন কি না তা নিয়েই দলের ভেতরে প্রশ্ন বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার দায়িত্ব নিতে পারে এমন সম্ভাবনা মাগা শিবিরেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। উভয় দলের আইনপ্রণেতারাই জানতে চাইছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততার মাত্রা কতটা হবে এবং ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো পুনর্গঠনে যাকে ট্রাম্প বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন করদাতাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে কি না।

সিনেট রিপাবলিকান নেতৃত্ব দলের সদস্য সিনেটর শেলি মুর ক্যাপিটো বলেন, আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমাদের দেশ আরেকটি দেশের জন্য সরকার গঠন বা রাষ্ট্রগঠনের পথে যেতে চায় না, বিশেষ করে আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতার পর।

শনিবার সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের এই ঘোষণা আমরা ভেনেজুয়েলা চালাব এবং প্রয়োজনে মাটিতে সেনা নামাতেও আমরা ভয় পাই না, কিছু রিপাবলিকানকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।

রিপাবলিকান কৌশলবিদ ও সাবেক সিনেট সহকারী ব্রায়ান ডার্লিং বলেন, আমেরিকা ফার্স্ট মাগা আন্দোলন ট্রাম্পের বক্তব্য শুনে আশা করছে এটা কেবল শক্ত কথা, বাস্তবে যেন আমরা ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো পথে না যাই যেখানে সেনা পাঠিয়ে অন্য দেশের পুলিশ ও কূটনীতিকের ভূমিকায় নামতে হয়। তিনি যোগ করেন, সত্য কথা হলো, কেউই ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্ব চাইবে না।

উত্তর ক্যারোলাইনার সিনেটর থম টিলিস বলেন, ভেনেজুয়েলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সামরিক বাহিনী মোতায়েনের তিনি ১০০ শতাংশ বিরোধিতা করবেন। সোমবার তিনি বলেন, সমস্যা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট বলেছেন আমরা দেশটি চালাব, কিন্তু বাস্তবে আমাদের সেখানে কোনো সেনা নেই। ফোন কূটনীতির বাইরে আমাদের সেই ক্ষমতা নেই—তাই এই সপ্তাহে কী হয়, তা দেখা যাক।

তিনি আরও বলেন, ভেনেজুয়েলার জনগণ একটি বৈধভাবে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব পাওয়ার অধিকারী। হয়তো বিশেষ নির্বাচন সমর্থন করা যেতে পারে, পর্যবেক্ষক পাঠানো যেতে পারে কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার তাদেরই।

কেন্টাকির সিনেটর র‍্যান্ড পল বলেন, ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা চালানো ও মার্কিন কোম্পানিগুলোকে দেশটির তেলে প্রবেশাধিকার দেওয়ার বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ভেনেজুয়েলানদের ইতিবাচক মনোভাব নষ্ট করতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।

তিনি বলেন, মাদুরো চলে যাওয়ায় অনেকে খুশি। কিন্তু যদি বলা হয়—আমরা আসছি, আমাদের তেল কোম্পানিগুলো আনছি, আমরা দখল নিচ্ছি—তাহলে সেটা উনিশ শতকের মতো শোনায়, এবং আমি মনে করি না এতে প্রত্যাশিত ফল আসবে।

যদিও বেশিরভাগ রিপাবলিকান কারাকাসে সামরিক ঘাঁটি থেকে মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরে নিউইয়র্কে বিচারের মুখোমুখি করার ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন, তবু পরবর্তী ধাপে যুক্তরাষ্ট্র কতটা সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে জড়াবে—সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

ক্যাপিটো বলেন, তিনি মনে করেন ট্রাম্প বড় ধরনের সেনা মোতায়েন ছাড়াই ভেনেজুয়েলার ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া প্রভাবিত করতে চান, তবে তাঁর লক্ষ্য আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার।

সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুন বলেন, তিনি প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা সম্পর্কে আরও জানতে চান। তিনি বলেন, আমরা ব্রিফিং নেব এবং প্রশ্ন করব এর মানে কী।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা চালানো বক্তব্য কিছুটা নরম করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দৈনন্দিন শাসন পরিচালনা করবে না; বরং তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নতুন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

এর আগে, ৩ জানুয়ারির অভিযানের আগেই কিছু রিপাবলিকান সতর্ক করেছিলেন যে, ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তন বা সেনা মোতায়েন উল্টো ফল দিতে পারে।

রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৭২ শতাংশ আমেরিকান আশঙ্কা করছেন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় অতিরিক্তভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে। জরিপে মাত্র ৩৩ শতাংশ মানুষ মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযানে সমর্থন জানিয়েছেন।

২০১৬ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হওয়ার সময় ট্রাম্প নেশন–বিল্ডিংয়ের বিরোধিতা করেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, আমার লক্ষ্য এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি গড়া, যেখানে আমেরিকা প্রথম।

এদিকে, ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, ট্রাম্প সাধারণ মানুষের চেয়ে বড় তেল কোম্পানির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। সিনেট ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেন, আমাদের বাজারদর কমানো, ডে-কেয়ার সাশ্রয়ী করা এগুলোই আমেরিকানরা চায়, ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন নয়।

কিছু রিপাবলিকান আবার ইরাক যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা টানছেন। সাবেক কংগ্রেসম্যান রন পল বলেন, রেজিম পরিবর্তন আর নেশন–বিল্ডিং আবার ফিরে এসেছে।

এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে মার্জোরি টেইলর গ্রিন বলেন, মাদুরোকে ধরার অভিযান ওয়াশিংটনের সেই পুরোনো কৌশলপুস্তক, যা আমেরিকান জনগণের সেবা করে না।