
সোহেল রানা বাবু, বাগেরহাট প্রতিনিধি
শুষ্ক মৌসুম এলেই দুশ্চিন্তা বাড়ে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন।বারবার অগ্নিকান্ডে বনভুমি পুড়ে ছাই হচ্ছে। হুমকির মুখে পড়ছে জীব বৈচিত্র্য।বারবার আগুনে ক্ষতির পর এবার কঠোর অবস্থানে বন বিভাগ। প্রথমবারের মতো নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রবেশপথে বিড়ি–সিগারেট ও যেকোনো দাহ্য পদার্থ নিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
বন বিভাগ বলছে, শুষ্ক মৌসুমে একটি অসতর্ক মুহূর্তই বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। তাই আগে ভাগেই সতর্কতা।
বাগেরহাটের শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও মোংলা উপজেলার বনসংলগ্ন সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের জিউধরা, চিলা, জয়মুনি, কপিলমুনি ও কটকা প্রবেশপথে জেলে, বাওয়ালী ও স্থানীয় কেউ বিড়ি–সিগারেট কিংবা দাহ্য বস্তু নিয়ে ঢুকতে পারবেন না।
চাদঁপাই রেঞ্জের জিউধরা স্টেশনের বনরক্ষী মাজহারুল সরদার বলেন, আগুন লাগার বেশিরভাগ ঘটনার পেছনে মানুষের অসচেতনতা বা দুর্বৃত্তের হাত থাকে। আমরা টহল জোরদার করেছি। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলার শরণখোলা উপজেলার রাজাপুরগ্রামের বাসিন্দা আবু তোয়েব বলেন,সুন্দরবন আমাদের জীবন-জীবিকা।যেখান থেকে আয় না করলে সংসার চলে না। সেখানে এক শ্রেনীর মানুষ ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য বৃহত্তম স্বার্থ নষ্ট করছে।বারবার আগুনে বন পুড়তে দেখে আমাদের কষ্ট হয়। বন বিভাগের এই উদ্যোগকে আমরা সমর্থন করি। কেউ নিষেধাজ্ঞা না মানলে কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন,গত দুই দশকে অগ্নিকাণ্ডে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তাই এবার প্রতিরোধেই জোর দিচ্ছি। বনসংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের সহযোগিতা ছাড়া বন রক্ষা সম্ভব নয়। আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছি। বন বিভাগের তদন্তে আগের অগ্নিকাণ্ডগুলোর ঘটনায় একশ্রেণীর স্থানীয় দুর্বৃত্ত চক্রের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে। এবার যাতে এমন কোনো ঘটনা না ঘটে, সে জন্য টহল বাড়ানো হয়েছে এবং প্রবেশপথগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। গত ২৩ বছরে ২৭ বার অগ্নিকাণ্ডে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে শতাধিক একর বনভূমি পুড়ে গেছে ।
বিশ্বের অন্যান্য ম্যানগ্রোভ বনের তুলনায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য অধিকতর সমৃদ্ধ। এই বনে সুন্দরীসহ রয়েছে ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল ও ১৩ প্রজাতির অর্কিড। বাঘ, হরিণ, কুমির, কিং কোবরা,বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতিসহ ছয় প্রজাতির ডলফিন,৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও ২১০ প্রজাতির মৎস্যসম্পদ।
সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই জনপদ এখনও টিকে আছে শুধু সুন্দরবনের আশ্রয়ে। দেশের সর্ব দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের অববাহিকায় গড়ে উঠেছে এ বিশ্ব ঐতিহ্য। এর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সারা বছরই ভ্রমণপিপাসুদের হাতছানি দেয়। তবে সুন্দরবন এখন অস্তিত্ব সংকটে। কিছু মানুষের লোভ-লালসা আর অপকর্মের শিকার হচ্ছে বননির্ভরশীল মানুষ ও গোটা বনের জীববৈচিত্র্য।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একসময় এ বনে বাস করত ৪০০ প্রজাতির পাখি, যা কমতে কমতে এখন ২৭০ প্রজাতিতে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়ছে সাগর-নদীর পানির উচ্চতা ও লবণাক্ততা। কমে যাচ্ছে সুন্দরবনের কম লবণসহিষ্ণু সুন্দরীসহ অন্যান্য গাছ, কমছে বন্যপ্রাণীর বিচরণ ক্ষেত্রও। একশ্রেণির জেলে সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ আহরণ করায় হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবনের মৎস্যভাণ্ডার। একইভাবে হত্যা করা হচ্ছে বাঘ, হরিণ, শূকরসহ অন্যান্য প্রাণী।
সুন্দরবনের টিকে থাকার ওপর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সমৃদ্ধি অনেকাংশেই নির্ভরশীল। সুন্দরবন প্রকৃতিগতভাবেই সৃষ্টি এবং প্রকৃতিই এর রক্ষক।
সোহেল রানা বাবু, বাগেরহাট প্রতিনিধি 







































