মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৮ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বাঁচার সব হিসাব বদলে দিয়েছে করোনা ভা্ইরাস :- মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী

রোকনুজ্জামান রিপন ।। 

করোনা সংকটের সম্মুখসারির যোদ্ধা ডা. মঈনকে হারালাম! হারিয়েছি অনেকগুলো তাজা প্রাণ। এ ব্যথা শব্দে প্রকাশের নয়! করোনা সংক্রমণ প্রায় ছয় হাজার। সামনে কী ভয়াবহতা আসছে, আল্লাহই জানেন! লিখব না ভেবেছিলাম। করোনার দেশের মূল করণিদের সময়মতো করণীয় ভাবছি। দৈনিক, অনলাইন, টিভি, সামাজিক অ্যাপস যেটাই খুলি করোনাময়। দেশে-বিদেশে মৃত, আক্রান্ত বা সুস্থতার খবর।

আমাদের আজকের অবস্থা ঠেকানো যেত। অনেক ভালো অবস্থানে থাকতে পারতাম! কোরিয়া, সুইডেন, তাইওয়ানের মতো বহু দেশ করেছে। ওদের জনগণ সচেতন আগে হয়েছে। প্রতিটি রোগী চিহ্নিত ও বিচ্ছিন্ন করে সামাজিক সংক্রমণ ঠেকিয়েছে। আমাদের দেশেও ভালোভাবে শুরু হয়েছিল। ধারাবাহিকতা থাকেনি। সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা যায়নি। গুজবের সংবাদ পড়ে সচেতনতা বা করোনা থেকে বাঁচার উপায় জানা যায় না। লকডাউন, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন, হাঁচি-কাশির ড্রপলেটসের ভয়াবহতা, পিপিই, স্যানিটাইজার, ৩ ফুট দূরত্ব, ভাইরাস চারদিন গলায় থাকা ইত্যাদি আমরা ৮ মার্চের পর জেনেছি।

জাতির দুর্যোগে প্রতিটি নাগরিক দেশের সেবক! মহাদুর্যোগে সে দায়িত্ব বেড়ে যায়। জ্ঞানে মানে বড় হলে তার দায়িত্ব আরও বেশি। বিবেকবান গণমাধ্যমসেবী ও কলমধারীগণ আরো বড়। আমেরিকান লেখক ও গণমাধ্যম আলোচক ট্রিসিয়া হ্যারিস বলেছেন, The mass media, their influence is everywhere. They tell us what to do, what to think, and they tell us to think about ourselves all of the time.

সরকারের পক্ষ থেকেও করোনা নিবারণে কাস্টম হাউস বেনপোলের পদক্ষেপের প্রশংসা করা হয়েছে। সরকারের একার পক্ষে এমন দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব নয় বলে মিডিয়ার ভূমিকার কথাও বলা হয়। মিডিয়াকে পজিটিভ সংবাদ পরিবেশনে দায়িত্বশীল হওয়ার কথা বলছে সরকার। কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগে সিকি শতাব্দীর কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা সরকারের নগণ্য কর্মী। রাষ্ট্রের সংবিধান আমাকে নির্দেশ দেয় ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য’, বাংলাদেশ সংবিধান: অনুচ্ছেদ ২১(২)। সেই দায়িত্ববোধ থেকে বেনাপোল কাস্টমস টিম নিয়ে করোনা দুর্যোগ প্রাদুর্ভাবের প্রথম থেকে লড়ছি। আমরা নিজেদের তাগিদে কাজ করি। প্রয়োজনে করি। দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবেসে করি। মূল্যায়ন বা পুরস্কারের আশায় নয়। সম্প্রতি করোনা নিয়ে কাজের মূল্যায়ন প্রসঙ্গ এসেছে।

গত ২৯ জানুয়ারির সচেতনতা সেমিনার ও ২০ ফেব্রুয়ারি কথিত করোনা রোগী আটক নিয়ে এখন ইতিবাচক আলোচনা হচ্ছে। অনেক বিজ্ঞজনের সাথে উদার সংবাদসেবীরা এখন বলছেন, ‘আপনারা যশোর বেনাপোলকে বাঁচিয়েছেন! কিছু মানুষ ও মিডিয়া তখন বুঝে বা না বুঝেই আপনাদের ভিলেন বানিয়েছিল! আসলে দেশব্যাপী কাজ করার ওটাই উপযুক্ত সময় ছিল।’ অথচ ২৯ জানুয়ারি করোনা সেমিনার নিয়ে অনেক উপহাস হয়েছে। গণমাধ্যমের অনেকেই সেখানে ছিলেন। সেমিনারের সংবাদও গুরুত্ব পায়নি। বলেছেন, এত আগে তোড়জোড় কেন! এত প্রচারের দরকার কি! করোনা আমেরিকা-ইউরোপের রোগ! আমাদের দেশে আসবে না! তাচ্ছিল্যের সুরে অনেকেই বলেছেন, আমরা প্যানিক তৈরি করছি, ক্রেডিট নেওয়ার জন্য সেমিনার করেছি, বেহুদা প্রচারে নেমেছি।

দেশের সীমান্তে আমাদের অবস্থান বলেই সতর্কতা জরুরি ছিল। যেখানে চেকপোস্ট দিয়ে দিনে ১০ হাজার মানুষের গমনা-গমন। ভাইরাসটির মারাত্মক সংক্রমণতা নিয়ে সে সময় কিছু পড়াশোনা করেছিলাম। জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের রাজি করিয়ে আমাদের টিম অক্লান্ত পরিশ্রমে মাত্র দুদিনে বৃহৎ সেমিনারের আয়োজন করেছিল। সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ২০০ সদস্য করোনা সম্বন্ধে ধারণা নেন। যশোর-মনিরামপুরে একজন স্বাস্থ্যকর্মীর করোনা ধরা পড়ে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ৪১ কিলোমিটার দূরে বেনাপোলে। আমার লোকজন ছাড়াও বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মী ফোনে উদ্বিগ্ন। যেন তাদের করোনা ধাওয়া করছে। আমি বাঁচার উপায় বলে দেই! হয়তো আস্থা থেকেই কোনো কোনো সংবাদকর্মী পিপিই চাইলেন। মনিরাম পুরের আতঙ্ক বেনাপোলে কেন! মানুষ এখন ‘করোনা’ বোঝে। ভয়াবহতা জানে। আমাদের গণমাধ্যম এখানে সফল। কারণ ইতোমধ্যে তারাও করোনা ভয়াবহতা নিজেরা বুঝেছে। সবাই আড়াই মাস আগে বুঝলে জাতির জন্য অনেক ভালো হতো।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি ভারত থেকে লিখিতভাবে পুশব্যাক করা করোনা রোগীর বিষয়ে বেনাপোল কাস্টম হাউস সতর্ক পদক্ষেপ নেয়। পরে তার করোনা প্রমাণিত হয়নি। আজকে যদি ভারত লিখিত দিয়ে একজন করোনা রোগী বেনাপোল সীমান্তে পাঠায়, আমরা কী করব! অবশ্যই সেদিনের চেয়ে বেশি সতর্কতা নেব। কিন্তু আমরা সংবাদমাধ্যমকে বোঝাতে ব্যর্থ হলাম।

স্থানীয় সাংবাদিকরা বেনাপোল ভালো চেনেন। ঝুঁকি কোথায় বুঝেছিলেন। তারা বাস্তবতা তুলে ধরতে চাইলেন। স্থানীয়দের এড়িয়ে ঢাকার অতি উৎসাহীরা এগিয়ে গেলেন। যার কাজ সে না করলে যেমন হয়। কয়েকজন রিপোর্টার আমাদের সতর্কতার ভুল ব্যাখ্যা করলেন। সকল গণমাধ্যম বড় শিরোনামে গুজব ছড়ানোর অপবাদ দিলেন। অতি ধীমান কয়েকজন আসামির কাঠগড়ায় দিলেন। চাকরিচ্যুতির সুপারিশও করলেন। বেনপোলবাসীর সাথে দেশের মানুষও ভুল বার্তা পেল। সবাই ভেবে নিলেন, করোনা চীনে তৈরি, আমেরিকা ইউরোপের জন্য! একটি জাতীয় দৈনিকের প্রিন্ট ও অনলাইনে আমাদের বিরুদ্ধে কয়েকটি রিপোর্ট গেল। গুজব ছড়ানোর গুরুতর অভিযোগ। প্রতিবেদক আমার সাথে কথাও বলেননি। প্রথম সারির বা অনলাইন পোর্টালগুলোর কথা না বললাম। পরে ওই জাতীয় দৈনিক থেকে বলা হলো, এসব আসলে স্থানীয় প্রতিনিধির অর্বাচীনতা! আর স্থানীয় প্রতিনিধি বলেন, ঢাকা থেকে অতি উৎসাহে এমনটা হয়েছে।

অনেকের আক্রোশ দেখে মনে হয়েছে আমি যেন যুদ্ধাপরাধী! কমিশনার পদে এমন নাদান তাঁরা দেখেননি। টেলিফোনে শিক্ষণীয় অশোভন শব্দাগার শেষ করে মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখলেন। পরে শুনেছি দুরাচারের কারণে তিনি ওই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়ে কোয়ারেন্টিনে গেছেন। আমরা শিখেছি অনেক হারিয়ে। শিখলাম যখন ছয় লক্ষাধিক বিদেশ ফেরত মানুষ ষোল কোটিতে মিশে গেল। ৮ মার্চের পরও লকডাউন, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন বুঝতে কয়েক সপ্তাহ লেগে গেল।

আমাদের পাঠকদের আগে জানাতে পারলে লকডাউনে মানুষ ড্রামে করে লুকিয়ে পালানো, কুরিয়ারের গাড়ি ভেতরে করে যাওয়া, গার্মেটস খুলে দিয়ে লক্ষ শ্রমিক রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া, ভারতে তাবলীগ জামাতের জমায়েতে বাঙালির মৃত্যু, প্রবাসীদের দুসপ্তাহ লুকিয়ে রাখা কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাজার মানুষের মারামারির ঘটনা ঘটত না। এখন হলে কী আমরা করতাম! ভারতের শনাক্ত করা সম্ভাব্য করোনা রোগী আমরা লুকাবো? চূড়ান্ত পরীক্ষায় তার করোনা ধরা পড়ুক বা না পড়ুক। করোনা নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম থেকে অনেক কিছু জেনেছি। সীমান্তে ফেরত পাঠানো করোনা সন্ধিগ্ধ ব্যক্তিকে সাবধানে গ্রহণ ও তার কোয়ারেন্টিন কিভাবে নিশ্চিত করা হবে তা জেনে গেছি। পালানো ঠেকাতে পাহারা বসাতে হবে। যেমন বাগ-এ-জান্নাতে কোয়ারেন্টিন সেন্টার না হওয়ার জন্য মিডিয়াসহ পুরো বেনাপোল ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সফলও হয়েছে।

সেদিনের ঘটনা সংক্ষেপে বলা দরকার। ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০। ভারতীয় রেলের সিনিয়র গার্ড কৃষ্ণেন্দু বোস নিজে আসেন। পুশব্যাক করা একজন বাংলাদেশিকে করোনা রোগী বলে লিখিত দিয়ে কাস্টমসের হাতে তুলে দেন। তার সাম্প্রতিক অতীতে চীন ভ্রমণের বৃত্তান্ত ছিল। আমরা আরও সাবধানী হলাম। বেনপোলের ১৫ হাজার মানুষের সংক্রমণ নিরপত্তায় উদ্বিগ্ন ছিলাম। ইতোমধ্য করেনার ভয়াবহ সংক্রমণতা নিয়ে কয়েকটা নিবন্ধ পড়েছিলাম। আমরা বেশি সতর্ক ছিলাম! নিজেদের স্বার্থেই। সেমিনার জ্ঞান ও এ নিয়ে পড়াশোনার কারণেও। বহির্দেশীয় সরকারি প্রতিনিধির সশরীরে লিখিত দেওয়া, দেশের সরকারি বিভাগ উপেক্ষা করে না। আমরাও পারিনি। সীমান্তের দু’দেশের প্রথাগত শিষ্টাচারের ঐতিহ্যও বিবেচ্য। আমরা তাৎক্ষণিক ফেসবুকে যাত্রীর পরিচয়সহ পোস্ট দিয়ে সবাইকে সতর্ক করলাম। তখনো তিনি করোনা রোগী কি না স্বাস্থ্যকর্মীরা নিশ্চিত ছিলেন না। যশোরে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীও একথা বলেছেন। তাঁরা ঢাকায় কথা বলে তিনি করোনামুক্ত লিখিত সনদ দেন। আমরা সেটি সবাইকে জানিয়ে দিয়ে পোস্ট দেওয়ার এক ঘণ্টারও কম সময়ে আগের পোস্ট মুছে নতুন পোস্ট দেই।

বিশ্বব্যাপী প্রথম করোনা কেস ধরা পড়ে ২০ ফেব্রুয়ারির আগের দিন পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্রে ১ জানুয়ারি, ইতালি ৩১ জানুয়ারি, স্পেন ১ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাজ্য ৩১ জানুয়ারি, জার্মানি ২৭ জানুয়ারি, ফ্রান্স ২৪ জানুয়ারি ও ভারতে ৩০ জানুয়ারি।

অনুযোগের জন্য নয়। আগামিতে আমাদের ও কলম সেনাপতিদের সঠিক অবস্থান খোঁজার জন্য আমার এ লেখা। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীও সে কথাই বলেছেন। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা! তিনি আমাদেরকে মূল্যায়ন ও পুরস্কারের কথা বলেছেন। আপনার এ স্বীকৃতিই আমাদের প্রাপ্তি ও অনুপ্রেরণা।

কত দিন পৃথিবীতে আছি জানি না! করোনা বাঁচার সব হিসাব বদলে দিয়েছে। সময় গড়িয়ে জীবন যেন আরও অনিশ্চিত! যতোক্ষণ বেঁচে আছি যেন দেশ ও মানুষের কাজে আসি, দেশের সংবিধান সমুন্নত রাখতে পারি, এ দোয়া চাই।

মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী : কমিশনার অব কাস্টমস, কাস্টম হাউস, বেনাপোল

আপনার মন্তব্য লিখুন

লেখকের সম্পর্কে

Shahriar Hossain

জনপ্রিয়

টাকা দিয়ে ভোট কেনা জামায়াতের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও আচরণবিধির লঙ্ঘন: মাহদী আমিন

বাঁচার সব হিসাব বদলে দিয়েছে করোনা ভা্ইরাস :- মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী

প্রকাশের সময় : ০৫:৩০:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২০

রোকনুজ্জামান রিপন ।। 

করোনা সংকটের সম্মুখসারির যোদ্ধা ডা. মঈনকে হারালাম! হারিয়েছি অনেকগুলো তাজা প্রাণ। এ ব্যথা শব্দে প্রকাশের নয়! করোনা সংক্রমণ প্রায় ছয় হাজার। সামনে কী ভয়াবহতা আসছে, আল্লাহই জানেন! লিখব না ভেবেছিলাম। করোনার দেশের মূল করণিদের সময়মতো করণীয় ভাবছি। দৈনিক, অনলাইন, টিভি, সামাজিক অ্যাপস যেটাই খুলি করোনাময়। দেশে-বিদেশে মৃত, আক্রান্ত বা সুস্থতার খবর।

আমাদের আজকের অবস্থা ঠেকানো যেত। অনেক ভালো অবস্থানে থাকতে পারতাম! কোরিয়া, সুইডেন, তাইওয়ানের মতো বহু দেশ করেছে। ওদের জনগণ সচেতন আগে হয়েছে। প্রতিটি রোগী চিহ্নিত ও বিচ্ছিন্ন করে সামাজিক সংক্রমণ ঠেকিয়েছে। আমাদের দেশেও ভালোভাবে শুরু হয়েছিল। ধারাবাহিকতা থাকেনি। সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা যায়নি। গুজবের সংবাদ পড়ে সচেতনতা বা করোনা থেকে বাঁচার উপায় জানা যায় না। লকডাউন, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন, হাঁচি-কাশির ড্রপলেটসের ভয়াবহতা, পিপিই, স্যানিটাইজার, ৩ ফুট দূরত্ব, ভাইরাস চারদিন গলায় থাকা ইত্যাদি আমরা ৮ মার্চের পর জেনেছি।

জাতির দুর্যোগে প্রতিটি নাগরিক দেশের সেবক! মহাদুর্যোগে সে দায়িত্ব বেড়ে যায়। জ্ঞানে মানে বড় হলে তার দায়িত্ব আরও বেশি। বিবেকবান গণমাধ্যমসেবী ও কলমধারীগণ আরো বড়। আমেরিকান লেখক ও গণমাধ্যম আলোচক ট্রিসিয়া হ্যারিস বলেছেন, The mass media, their influence is everywhere. They tell us what to do, what to think, and they tell us to think about ourselves all of the time.

সরকারের পক্ষ থেকেও করোনা নিবারণে কাস্টম হাউস বেনপোলের পদক্ষেপের প্রশংসা করা হয়েছে। সরকারের একার পক্ষে এমন দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব নয় বলে মিডিয়ার ভূমিকার কথাও বলা হয়। মিডিয়াকে পজিটিভ সংবাদ পরিবেশনে দায়িত্বশীল হওয়ার কথা বলছে সরকার। কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগে সিকি শতাব্দীর কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা সরকারের নগণ্য কর্মী। রাষ্ট্রের সংবিধান আমাকে নির্দেশ দেয় ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য’, বাংলাদেশ সংবিধান: অনুচ্ছেদ ২১(২)। সেই দায়িত্ববোধ থেকে বেনাপোল কাস্টমস টিম নিয়ে করোনা দুর্যোগ প্রাদুর্ভাবের প্রথম থেকে লড়ছি। আমরা নিজেদের তাগিদে কাজ করি। প্রয়োজনে করি। দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবেসে করি। মূল্যায়ন বা পুরস্কারের আশায় নয়। সম্প্রতি করোনা নিয়ে কাজের মূল্যায়ন প্রসঙ্গ এসেছে।

গত ২৯ জানুয়ারির সচেতনতা সেমিনার ও ২০ ফেব্রুয়ারি কথিত করোনা রোগী আটক নিয়ে এখন ইতিবাচক আলোচনা হচ্ছে। অনেক বিজ্ঞজনের সাথে উদার সংবাদসেবীরা এখন বলছেন, ‘আপনারা যশোর বেনাপোলকে বাঁচিয়েছেন! কিছু মানুষ ও মিডিয়া তখন বুঝে বা না বুঝেই আপনাদের ভিলেন বানিয়েছিল! আসলে দেশব্যাপী কাজ করার ওটাই উপযুক্ত সময় ছিল।’ অথচ ২৯ জানুয়ারি করোনা সেমিনার নিয়ে অনেক উপহাস হয়েছে। গণমাধ্যমের অনেকেই সেখানে ছিলেন। সেমিনারের সংবাদও গুরুত্ব পায়নি। বলেছেন, এত আগে তোড়জোড় কেন! এত প্রচারের দরকার কি! করোনা আমেরিকা-ইউরোপের রোগ! আমাদের দেশে আসবে না! তাচ্ছিল্যের সুরে অনেকেই বলেছেন, আমরা প্যানিক তৈরি করছি, ক্রেডিট নেওয়ার জন্য সেমিনার করেছি, বেহুদা প্রচারে নেমেছি।

দেশের সীমান্তে আমাদের অবস্থান বলেই সতর্কতা জরুরি ছিল। যেখানে চেকপোস্ট দিয়ে দিনে ১০ হাজার মানুষের গমনা-গমন। ভাইরাসটির মারাত্মক সংক্রমণতা নিয়ে সে সময় কিছু পড়াশোনা করেছিলাম। জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের রাজি করিয়ে আমাদের টিম অক্লান্ত পরিশ্রমে মাত্র দুদিনে বৃহৎ সেমিনারের আয়োজন করেছিল। সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ২০০ সদস্য করোনা সম্বন্ধে ধারণা নেন। যশোর-মনিরামপুরে একজন স্বাস্থ্যকর্মীর করোনা ধরা পড়ে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ৪১ কিলোমিটার দূরে বেনাপোলে। আমার লোকজন ছাড়াও বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মী ফোনে উদ্বিগ্ন। যেন তাদের করোনা ধাওয়া করছে। আমি বাঁচার উপায় বলে দেই! হয়তো আস্থা থেকেই কোনো কোনো সংবাদকর্মী পিপিই চাইলেন। মনিরাম পুরের আতঙ্ক বেনাপোলে কেন! মানুষ এখন ‘করোনা’ বোঝে। ভয়াবহতা জানে। আমাদের গণমাধ্যম এখানে সফল। কারণ ইতোমধ্যে তারাও করোনা ভয়াবহতা নিজেরা বুঝেছে। সবাই আড়াই মাস আগে বুঝলে জাতির জন্য অনেক ভালো হতো।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি ভারত থেকে লিখিতভাবে পুশব্যাক করা করোনা রোগীর বিষয়ে বেনাপোল কাস্টম হাউস সতর্ক পদক্ষেপ নেয়। পরে তার করোনা প্রমাণিত হয়নি। আজকে যদি ভারত লিখিত দিয়ে একজন করোনা রোগী বেনাপোল সীমান্তে পাঠায়, আমরা কী করব! অবশ্যই সেদিনের চেয়ে বেশি সতর্কতা নেব। কিন্তু আমরা সংবাদমাধ্যমকে বোঝাতে ব্যর্থ হলাম।

স্থানীয় সাংবাদিকরা বেনাপোল ভালো চেনেন। ঝুঁকি কোথায় বুঝেছিলেন। তারা বাস্তবতা তুলে ধরতে চাইলেন। স্থানীয়দের এড়িয়ে ঢাকার অতি উৎসাহীরা এগিয়ে গেলেন। যার কাজ সে না করলে যেমন হয়। কয়েকজন রিপোর্টার আমাদের সতর্কতার ভুল ব্যাখ্যা করলেন। সকল গণমাধ্যম বড় শিরোনামে গুজব ছড়ানোর অপবাদ দিলেন। অতি ধীমান কয়েকজন আসামির কাঠগড়ায় দিলেন। চাকরিচ্যুতির সুপারিশও করলেন। বেনপোলবাসীর সাথে দেশের মানুষও ভুল বার্তা পেল। সবাই ভেবে নিলেন, করোনা চীনে তৈরি, আমেরিকা ইউরোপের জন্য! একটি জাতীয় দৈনিকের প্রিন্ট ও অনলাইনে আমাদের বিরুদ্ধে কয়েকটি রিপোর্ট গেল। গুজব ছড়ানোর গুরুতর অভিযোগ। প্রতিবেদক আমার সাথে কথাও বলেননি। প্রথম সারির বা অনলাইন পোর্টালগুলোর কথা না বললাম। পরে ওই জাতীয় দৈনিক থেকে বলা হলো, এসব আসলে স্থানীয় প্রতিনিধির অর্বাচীনতা! আর স্থানীয় প্রতিনিধি বলেন, ঢাকা থেকে অতি উৎসাহে এমনটা হয়েছে।

অনেকের আক্রোশ দেখে মনে হয়েছে আমি যেন যুদ্ধাপরাধী! কমিশনার পদে এমন নাদান তাঁরা দেখেননি। টেলিফোনে শিক্ষণীয় অশোভন শব্দাগার শেষ করে মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখলেন। পরে শুনেছি দুরাচারের কারণে তিনি ওই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়ে কোয়ারেন্টিনে গেছেন। আমরা শিখেছি অনেক হারিয়ে। শিখলাম যখন ছয় লক্ষাধিক বিদেশ ফেরত মানুষ ষোল কোটিতে মিশে গেল। ৮ মার্চের পরও লকডাউন, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন বুঝতে কয়েক সপ্তাহ লেগে গেল।

আমাদের পাঠকদের আগে জানাতে পারলে লকডাউনে মানুষ ড্রামে করে লুকিয়ে পালানো, কুরিয়ারের গাড়ি ভেতরে করে যাওয়া, গার্মেটস খুলে দিয়ে লক্ষ শ্রমিক রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া, ভারতে তাবলীগ জামাতের জমায়েতে বাঙালির মৃত্যু, প্রবাসীদের দুসপ্তাহ লুকিয়ে রাখা কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাজার মানুষের মারামারির ঘটনা ঘটত না। এখন হলে কী আমরা করতাম! ভারতের শনাক্ত করা সম্ভাব্য করোনা রোগী আমরা লুকাবো? চূড়ান্ত পরীক্ষায় তার করোনা ধরা পড়ুক বা না পড়ুক। করোনা নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম থেকে অনেক কিছু জেনেছি। সীমান্তে ফেরত পাঠানো করোনা সন্ধিগ্ধ ব্যক্তিকে সাবধানে গ্রহণ ও তার কোয়ারেন্টিন কিভাবে নিশ্চিত করা হবে তা জেনে গেছি। পালানো ঠেকাতে পাহারা বসাতে হবে। যেমন বাগ-এ-জান্নাতে কোয়ারেন্টিন সেন্টার না হওয়ার জন্য মিডিয়াসহ পুরো বেনাপোল ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সফলও হয়েছে।

সেদিনের ঘটনা সংক্ষেপে বলা দরকার। ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০। ভারতীয় রেলের সিনিয়র গার্ড কৃষ্ণেন্দু বোস নিজে আসেন। পুশব্যাক করা একজন বাংলাদেশিকে করোনা রোগী বলে লিখিত দিয়ে কাস্টমসের হাতে তুলে দেন। তার সাম্প্রতিক অতীতে চীন ভ্রমণের বৃত্তান্ত ছিল। আমরা আরও সাবধানী হলাম। বেনপোলের ১৫ হাজার মানুষের সংক্রমণ নিরপত্তায় উদ্বিগ্ন ছিলাম। ইতোমধ্য করেনার ভয়াবহ সংক্রমণতা নিয়ে কয়েকটা নিবন্ধ পড়েছিলাম। আমরা বেশি সতর্ক ছিলাম! নিজেদের স্বার্থেই। সেমিনার জ্ঞান ও এ নিয়ে পড়াশোনার কারণেও। বহির্দেশীয় সরকারি প্রতিনিধির সশরীরে লিখিত দেওয়া, দেশের সরকারি বিভাগ উপেক্ষা করে না। আমরাও পারিনি। সীমান্তের দু’দেশের প্রথাগত শিষ্টাচারের ঐতিহ্যও বিবেচ্য। আমরা তাৎক্ষণিক ফেসবুকে যাত্রীর পরিচয়সহ পোস্ট দিয়ে সবাইকে সতর্ক করলাম। তখনো তিনি করোনা রোগী কি না স্বাস্থ্যকর্মীরা নিশ্চিত ছিলেন না। যশোরে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীও একথা বলেছেন। তাঁরা ঢাকায় কথা বলে তিনি করোনামুক্ত লিখিত সনদ দেন। আমরা সেটি সবাইকে জানিয়ে দিয়ে পোস্ট দেওয়ার এক ঘণ্টারও কম সময়ে আগের পোস্ট মুছে নতুন পোস্ট দেই।

বিশ্বব্যাপী প্রথম করোনা কেস ধরা পড়ে ২০ ফেব্রুয়ারির আগের দিন পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্রে ১ জানুয়ারি, ইতালি ৩১ জানুয়ারি, স্পেন ১ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাজ্য ৩১ জানুয়ারি, জার্মানি ২৭ জানুয়ারি, ফ্রান্স ২৪ জানুয়ারি ও ভারতে ৩০ জানুয়ারি।

অনুযোগের জন্য নয়। আগামিতে আমাদের ও কলম সেনাপতিদের সঠিক অবস্থান খোঁজার জন্য আমার এ লেখা। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীও সে কথাই বলেছেন। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা! তিনি আমাদেরকে মূল্যায়ন ও পুরস্কারের কথা বলেছেন। আপনার এ স্বীকৃতিই আমাদের প্রাপ্তি ও অনুপ্রেরণা।

কত দিন পৃথিবীতে আছি জানি না! করোনা বাঁচার সব হিসাব বদলে দিয়েছে। সময় গড়িয়ে জীবন যেন আরও অনিশ্চিত! যতোক্ষণ বেঁচে আছি যেন দেশ ও মানুষের কাজে আসি, দেশের সংবিধান সমুন্নত রাখতে পারি, এ দোয়া চাই।

মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী : কমিশনার অব কাস্টমস, কাস্টম হাউস, বেনাপোল