
চাকরি প্রত্যাশী বিশেষ করে ক্যাডার প্রত্যাশী ভাই বোনেরা, চলুন প্রথমেই একটু হাসাহাসি করে নেই। সরকারি হাইস্কুলের মাস্টাররা ক্যাডার হতে চায় এটা শুনলে আমার আপনার কেন, আমাদের সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত যেকোনো মানুষেরই হাসি পাওয়ার কথা। হাইস্কুলে পড়ানো অপ্রয়োজনীয় বা খুব কম গুরুত্বপূর্ণ ও কম দক্ষতা ও যোগ্যতার একটা কাজ, সাধারণ শিক্ষা আমাদের এমন মানসিকতাই গঠন করে দিয়েছে। এটাই স্কুল শিক্ষকদের প্রতি সাধারণ জনমনস্তাত্বিক সেটাপ।
হাসির বেগ কমলে বাস্তবতায় আসি। বাস্তবতা হলো রাষ্ট্র তার নিজের প্রয়োজনে বিভিন্ন ক্যাডার তৈরি করেছে, বিভিন্ন আবশ্যিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনার জন্য। মাধ্যমিক শিক্ষা পরিচালনা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ, এর জন্য জনবল দরকার। কাজের ধরণ অনুযায়ী এই কাজের উপযোগী দক্ষ, প্রশিক্ষিত লোক দরকার। মোট কথা ক্যাডার দরকার। এই বাস্তবতা রাষ্ট্র কখনোই উপেক্ষা করতে পারে নাই। মাধ্যমিক শিক্ষা রাষ্ট্রের কাছে এতোই গুরুত্বপূর্ণ! তাই স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্যাডারের সৃষ্টির সময় এখানেও ক্যাডার পদ তৈরি করা হয়। পদগুলির নামকরণ করা হয় এসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার, সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার, বিদ্যালয় পরিদর্শক, হেডমাস্টার, জেলা শিক্ষা অফিসার, ডেপুটি ডাইরেক্টর(আঞ্চলিক) ইত্যাদি। বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ বিধি বা ক্যাডার কম্পোজিশন যেটা বর্তমানে বহাল আছে, সেটাতে এসব পদের অস্তিত্ব এখনো ঐরকমই আছে। সহজে বিনাশ করা সম্ভব না।
কিন্তু বিসিএস(মাধ্যমিক শিক্ষা) নামকরণ না করে, নামকরণ করা হয় ‘বিসিএস সাধারণ শিক্ষা (স্কুল এন্ড ইন্সপেকশন ব্রাঞ্চ)’। এবং বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারেরই একটা অংশ করে রাখা হয়।
শুধু তাই নয়, দূর্ভাগ্যজনকভাবে এইসব ক্যাডার পদে নিয়োগ পাওয়ার একটা ব্যতিক্রম পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। এসব ক্যাডার পদে বিসিএস থেকে ডাইরেক্ট নেওয়া হয় না, সরকারি হাইস্কুলে কমপক্ষে পাঁচ বছর সহকারী শিক্ষক হিসাবে চাকুরী করতে হবে এবং বিএড ডিগ্রি অর্জন করতে হবে। সহকারী শিক্ষকদের পদটা ননক্যাডার দ্বিতীয় শ্রেণির। বর্তমানে এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাওয়া শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের খুব অল্প একটা সংখ্যা কর্মরত আছে। দ্বিতীয় শ্রেণির সহকারী শিক্ষক থেকে ক্যাডার পদে প্রবেশের বিধিগত বাধ্যবধকতার কারণে, সরকারি হাইস্কুলের মাস্টাররা ক্যাডারভূক্ত হয়ে যায়।
শিক্ষা ক্যাডারের কলেজ অংশের কেউ এইসব তথ্য নিয়ে হাসাহাসি করলেই এসব তথ্য মিথ্যা হয়ে যায় না। তারা আসলে জেনেও ‘জাহান্নামের আগুনে বসিয়া পুষ্পের হাসি হাসে’, তাই এক্ষেত্রে তাদের কথাই শেষ কথা নয়। এগুলি তাদের বেদনাহত হৃদয়ের কথা, বিধিগত কথা না।
কর্তৃপক্ষ এই অংশে নিয়োগের এরকম বিধান কেন রাখলো তার যুক্তি একমাত্র সরকারি হাইস্কুলের মাস্টার ছাড়া আর কারো কাছে যৌক্তিক মনে হবে না। মাধ্যমিক নাকি আলাদা প্রকৃতির একটা কাজ, নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ এবং সরাসরি কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা না থাকলে যতো জ্ঞানীই হোন না কেন, এখানে স্যূট করবেন না!
কলেজ অংশের কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের এসব যুক্তি ফুক্তি, বিধি বিধানের ক্ষ্যাতা পুড়ে, স্কুল এন্ড ইন্সপেকশন অংশকে আক্রমণ করে দূর্বল করতে করতে বিলুপ্তির পথে নিয়ে গেলেও নিশ্চিহ্ন করতে পারে নি। কারণ ঐ যে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সৃষ্ট ক্যাডার পদগুলি! সেগুলি যে কেবলই মাধ্যমিকের। সেগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। যাওয়ার উপায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে ইদ্দতকাল শেষ করা। কিন্তু দূর্বলতার কারণে পুরো চাকরি শেষ করলেও ক্যাডার পদগুলিতে যেতে পারছে না। তাদের দূর্বলতার দুইটা কারণ বলি।
প্রথমটা,সাধারণ জনমনস্তাত্বিক ভ্রান্ত ধারণাগত প্রবাহটা কলেজ অংশের পক্ষে, যেমন স্কুলের মাস্টাররা তো কলেজের মাস্টারদের চাইতে একটু কমই যোগ্য। যদিও অন্য ক্যাডারদের মতোই কমপক্ষে অনার্স না করে এখানে আবেদনের সুযোগ নাই। শুধু হাইস্কুল লেভেলে পড়ানোর অপরাধে তাকে অযোগ্য মনে করা হয়, সাধারণ জনমনস্তাত্বিক সেটাপের কারণে। এই জনমনস্তাত্বিক সেটাপের কারণে বিধিগত সুযোগ থাকলেও,কারো সমর্থন তারা পায় না।
‘আপনি কোন বিসিএস থেকে আসছেন?’ আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র স্কুল মাস্টারদের ঘায়েল করার জন্য। আসলে এখানে বিসিএস থেকে সরাসরি নেওয়া হয় না, ঐ যে সহকারী শিক্ষক পদের অভিজ্ঞতা।
রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং এরকম একটা নিয়োগ পদ্ধতি উপযুক্ত মনে হওয়ায় জিনিসটা চলে গেছে ‘মাস্টাররা ক্যাডার হতে চায়’ পর্যায়ে। রাষ্ট্রীয় জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হলো কিনা তার আগে আমাদের বিবেচনায় আসে ‘মাস্টররা ক্যাডার হয়ে যাচ্ছে, যেকোনো মূল্যে আটকাও’। সামান্য স্কুল মাস্টার ক্যাডার হয়ে যাবে! এই দৃশ্য দেখার আগে ধরণী দ্বিধা হও!’ মাস্টারদের আটকাতে গিয়ে সরকারি মাধ্যমিক বা শিক্ষা ক্যাডারের ‘স্কুল এন্ড ইন্সপেকশন ব্রাঞ্চ’ আজ বিলুপ্তির পথে।
একজন ক্যাডার প্রত্যাশী হিসাবে আপনি কি চান এই ক্যাডার পদগুলি শুধুমাত্র মাধ্যমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট হওয়ার অপরাধে বিলুপ্ত হয়ে যাক? মাধ্যমিক শিক্ষায় কাজ করা কি এতোই ঘৃণার? নাকি কলেজ শিক্ষার সমসংখ্যক পদ নিয়ে একটা ক্যাডার হোক এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাধ্যমিক শিক্ষার সেই ক্যাডারে মেধাবীরা আসুক?
বিধিমোতাবেক এখানে সাতশোর অধিক স্কুলে চৌদ্দ শতাধিক সহকারী প্রধান, সাত শতাধিক প্রধান, শতাধিক সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার, প্রতিটা জেলায় জেলা শিক্ষা অফিসার, বিদ্যালয় পরিদর্শক পদ থাকার কথা। এগুলো যে ক্যাডার পদ এবং শুধুমাত্র সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের জন্য, এটা বিসিএস ক্যাডার কম্পোজিশনের কথা। সরাসরি বিসিএস থেকে এখানে আসা সবার জন্য উন্মুক্ত হবে যদি সহকারী শিক্ষক পদ বা এন্ট্রিপদকে ক্যাডারভূক্ত করা হয়। বাকিগুলি ত এমনিতেই ক্যাডার।
বর্তমানে যে সরকারি হাইস্কুলের শিক্ষকরা আন্দোলন করছে, তা নতুন করে ক্যাডারভূক্ত হওয়ার না। উনাদের পরবর্তী পদ আসলেই ক্যাডার পদ এবং সেটা বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের। মাধ্যমিক শিক্ষাকে বিলুপ্ত না করতে পারলে তাদের পদগুলিকেও বিলুপ্ত করা যাবে না। তাদের দাবি এই ক্যাডার সার্ভিসটিকে বাঁচাতে হলে এন্ট্রি পদে সরাসরি বিসিএস থেকে নিয়োগ দিতে হবে, তার জন্য সহকারী শিক্ষক পদটিকে নবম গ্রেডের ক্যাডারভূক্ত করতে হবে।
বিসিএস না দিয়েই কেন ক্যাডার তা কিন্তু বললাম, তারপরও এই খুটা দিবেই মানুষ। যদিও এইটা ধোপে টিকে না। এখানকার অর্ধেক শিক্ষক ৩৪,৩৫,৩৬,৩৮,৪১,৪৩তম বিসিএস থেকে আসা। যদিও শিক্ষা ক্যাডাররা রাগে গোস্বায় বিসিএস না দেওয়া বা বিসিএস ফেল বলে থাকে। কিন্তু আপনারা ত জানেন ননক্যাডাররা বিসিএস ফেল না!
সহকারী শিক্ষকের ইদ্দকাল শেষে এখানকার কাজকর্ম, দ্বায়-দ্বায়িত্ব কলেজ শিক্ষক ক্যাডারদের কাজের চাইতে উপভোগ্য, আপনি উপভোগ করতে পারলে। মাধ্যমিক বস্তুত কলেজের চাইতে বিশাল বড় একটা সেক্টর। তাই জানুন, বুঝুন, মাধ্যমিকে আসুন। সেকেন্ডারি ইজ ওয়েটিং ফর ইউ,দ্যা ব্রিলিয়ান্টস।
আনিস রহমান, সহকারী শিক্ষক শেরপুর সরকারি ভিক্টোরিয়া একাডেমি।
আনিস রহমান 





































