
কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকী
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে আকাশচুম্বী এক ব্যক্তিত্ব—বেগম খালেদা জিয়া। তিনি কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, বরং এ দেশের মাটি ও মানুষের স্পন্দন অনুধাবনকারী এক কিংবদন্তি নেত্রী। দেশমাতৃকার টানে তার পদচারণা ছড়িয়ে ছিল বাংলার প্রতিটি প্রান্তে—রিকশা, ভ্যান, রেল, আকাশপথ কিংবা দুর্গম জনপদের মেঠোপথে; গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি পৌঁছে গেছেন সর্বত্র।
প্রতিটি নারীর মতো তিনিও স্বপ্ন দেখতেন একটি শান্ত সংসারের—স্বামী-সন্তানের মমতায় ঘেরা এক পরিতৃপ্ত জীবনের। ১৯৬০ সালে সেই স্বপ্নের পুরুষ হিসেবে তার জীবনে আসেন তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা ও পরবর্তীকালে স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। কিন্তু ব্যক্তিগত সুখের চেয়ে জাতির সংকটই বারবার হয়ে ওঠে তার জীবনের প্রধান নিয়তি।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে যখন তার স্বামী অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তখন দুই শিশু সন্তানকে আগলে রেখে বেগম জিয়াকে পাড়ি দিতে হয় অমানুষিক দুর্দশার দিন। লাশের সারি, বন্দুকের শব্দ, প্রিয় সহযোদ্ধাদের অকালে ঝরে পড়া—সবই তার কোমল হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। তবুও অসীম সাহস ও ধৈর্য নিয়ে তিনি অতিক্রম করেন সেই অগ্নিপরীক্ষা এবং স্বাধীন বাংলাদেশে ফেরেন নতুন আশার স্বপ্ন নিয়ে।
কিন্তু সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন এবং ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ড—দেশ, দল ও পরিবারকে নিমজ্জিত করে বিশাল শোক ও শূন্যতায়। সেই কঠিন সময়ে স্বামীর আদর্শকে অটুট রাখতে তিনি ঘর ছেড়ে নামেন রাজপথে। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সালের দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার দৃঢ় অবস্থান তাকে পরিণত করে গণমানুষের অটুট আশার প্রতীকে।
১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার এবং বিশেষ করে নারী শিক্ষার বিস্তারে তার ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়। শহীদ জিয়ার আদর্শে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে তিনি মাতৃস্নেহে আগলে রেখেছিলেন সারাটি জীবন।
কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, আইনি জটিলতা ও অবিরাম লড়াই তার জীবনের শেষ অধ্যায়কে করে তোলে বেদনাবিধুর। ২০১০ সালে দীর্ঘ ২৮ বছরের স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন ছাড়তে বাধ্য হওয়া থেকে শুরু করে ২০১৮ সালে কারাবরণ—প্রতিটি মুহূর্তে তিনি ছিলেন অটল ও আপোষহীন। বার্ধক্য ও নানা শারীরিক জটিলতায় জর্জরিত হয়েও জনগণের অধিকারের প্রশ্নে কখনও নতি স্বীকার করেননি।
অবশেষে দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ এবং অনমনীয় রাজনৈতিক যাত্রার পর বাংলার জনমানুষকে গভীর শোকের সাগরে ভাসিয়ে তিনি পাড়ি দিয়েছেন চিরন্তনের পথে।
বাংলার এই মহান জননেত্রীর অবদান, আত্মত্যাগ ও আদর্শ যুগের পর যুগ মনে রাখবে এ দেশের মানুষ।
তার স্মৃতি, তার সংগ্রাম ও তার দেশপ্রেম—শ্রদ্ধায় অম্লান।
কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকী 





































