বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

গরীবেরবন্ধু বঙ্গবন্ধু একজন ভালো লেখক ছিলেন

  • ঢাকা ব্যুরো।।
  • প্রকাশের সময় : ০৫:৪২:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৩
  • ১৫২

শিক্ষা জীবনের প্রস্তুতিতে তিনি অনুসরণীয়। শিক্ষার্থীদের জন্য সব ক্ষেত্রেই অনুকরণীয়। জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইতিবাচক উদাহরণ পাওয়া যাবে না। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর তেমনই কিছু দৃষ্টান্ত নিয়ে এই বিশেষ নিবন্ধ।

লেখক বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু একজন ভালো লেখক ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর লেখা ডায়েরি থেকে তার জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার সম্পাদিত বই ১) অসমাপ্ত আত্মজীবনী ২) কারাগারের রোজনামচ ৩) আমার দেখা নয় চীন।

এসব বই ডজন ডজন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এছাড়াও ইসলামিয়া কলেজে লেখাপড়াকালীন কলেজের প্রকাশনায় লিখতেন। তারই রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরায়ার্দী সম্পর্কে একটি সুলিখিত প্রবন্ধ ‘নেতাকে যেমন দেখেছি’ রচনা করেছেন। ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক রাজনৈতিক কলম যোদ্ধা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পর্কে ‘আমাদের মানিক ভাই’ শিরোনামে দুটি প্রবন্ধ লিখেছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি থাকাকালীন অসংখ্য প্যামপ্লেট, নির্দেশনা, চিঠিপত্র ইত্যাদি লিখেছেন। তিনি সবসময়ই কন্যা শেখ হাসিনা, বাবা লুৎফর রহমান এবং রাজনৈতিক সহযোগীদের কাছে নিজ হাতে চিঠি লিখেছেন। সেসব আজ বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি জাদুঘরে লাখো দর্শকের চিত্তে নাড়া দিচ্ছে।

পাঠক বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু একজন ভালো পাঠক ছিলেন। জীবনের জন্য প্রস্তুতিকাল শৈশব। লক্ষ কোটি মানুষের হাজার হাজার বছরের সঞ্চিত জ্ঞান বইয়ে লিখিত আকারে থাকে। পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, অনেক জ্ঞান সৃষ্টি হয় যা নিজে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হয় না। একমাত্র বই পড়ে এ সম্পর্কে জানা সম্ভব। তাই জীবনের প্রস্তুতি পর্বে পড়ার কোনও বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধু নিজে একজন ভালো পাঠক ছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কারাগারে থাকাকালে একটা বড় অংশ পড়ার জন্য ব্যয় করতেন। সেখানকার পাঠাগারে পছন্দের বইয়ের যোগান ছিল না। তাই কারাগারে দেখা করতে আসার সময় বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা বই নিয়ে আসতেন।

অভিভাবক বঙ্গবন্ধু

রাজনৈতিক কারণেই বঙ্গবন্ধু জীবনের এক-চতুর্থংশ সময় কারাঅভ্যন্তরে কাটিয়েছেন। বাকি এক-চতুর্থাংশ সময় মাঠে-ময়দানে রাজনৈতিক সভা ও আলোচনার মাধ্যমে অতিবাহিত করেছেন। এর মাঝে যেটুকু সময় পেয়েছেন, নিজ পরিবারের যত্ন নিতে ত্রুটি করেননি। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া থেকে স্বাস্থ্যের খবর নিয়েছেন। জ্যেষ্ঠ কন্যা যখন বুঝতে শিখেছে তার কাছেও নিজ হাতে চিঠি লিখেছেন, পরামর্শ-উপদেশ দিয়েছেন। লেখাপড়ার তাগিদ দিয়েছেন।

স্বামী হিসেবে বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধুর বয়স যখন ১২ বছর, আর বেগম ফজিলাতুন্নেছার তিন বছর, তখনই অভিভাবকরা তাদের দুইজনের বিয়ের অঙ্গীকার করেন। ফজিলাতুন্নেছার বয়স ১২ বছরে পৌঁছুলে তাদের বিয়ে হয়। শেখ মুজিবের বয়স তখন ২১ বছর। বিয়ের পরপরই বঙ্গবন্ধু কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে লেখাপড়া করতে গেছেন। কিন্তু, বাল্যসাথীকে কখনোই অবহেলা করেননি। কখনো হয়তো রাজনৈতিক রোষানলে কারাগারে থেকেছেন। কিন্তু সেই নির্জন থেকে চিঠি লিখেছেন, চিঠির অংশ বিশেষ কালি লেপে সেন্সর করা হয়েছে। সঠিক বোঝাপড়া থাকার কারণে তা থেকে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী ঠিকই বঙ্গবন্ধুর মনের কথাটি পড়ে নিয়েছেন। সংসার কিভাবে চলবে, আর্থিক সংস্থান কিভাবে হবে, রাজনৈতিক সহকর্মীদের কিভাবে চাঙ্গা রাখতে হবে তার নির্দেশনা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলেন।

শিক্ষক বঙ্গবন্ধু

তিনিই ভালো শিক্ষক যিনি ভাল পড়ান। শ্রেষ্ঠ শিক্ষক তিনিই যিনি শিক্ষার্থীদের সারা জীবনের জন্য অনুপ্রাণিত করতে পারেন। একটা গান আছে- একবার চাবি মাইরা দেছেন ছাইড়া চলতে আছে জনম ভরে …. । বঙ্গবন্ধু একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। পুরো বাঙালি জাতিকে ২৭ বছর ধরে শিখিয়েছিলেন, পড়িয়েছিলেন, বুঝিয়েছেন যে তোমাদেরকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, শোষণ করা হচ্ছে, অবহেলা করা হচ্ছে, এমনকি তোমাদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা হচ্ছে। বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর কথায় বুঝেছিলো, শিখেছিলো, তাইতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো স্বাধীনতা আন্দোলনে, যুদ্ধে ছিনিয়ে এনেছিলো মানুষের জন্য স্বাধীনতা, একটি দেশ। আজকে যারা প্যালেস্টাইনের মতো অন্য দেশের বা অন্য জাতির অধীনে শাসিত হয় শুধু তারাই এর মর্ম বোঝে। এই উপলব্ধির জন্য ইতিহাস পড়তে হবে। সেই সময়ের পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে হবে। অন্যদের সাথে কথা বলতে হবে, তাদেরকে শুনতে হবে।

নেতা বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু ছিলেন চুম্বকের মতো। তার চারপাশে কর্মীরা সবসময় আকর্ষিত হতো। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গবন্ধুর মা-বাবা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমার ছেলে যেখানে যায় সেখানকার সবাই তাকে নেতা বলে মানে। দীর্ঘদিনের জনসাধারণের সাথে মিথষ্ক্রিয়া করার অভিজ্ঞতা এবং নানা চড়াই-উতরাই পার হওয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা হয়েছেন। এমনকি হত্যাকারীদের স্বীকারোক্তিতে বেরিয়ে এসেছে তিনি এমন একজন নেতা ছিলেন যে, মানুষকে সহজেই সম্মোহন করতে পারতেন। সব নেতাকর্মীর নাম মুখস্ত, তাদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা ছিলো তার। মানুষকে একনজর দেখেই বঙ্গবন্ধু তার সম্পর্কে সম্যক ধারণা করতে পারতেন। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে যখন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করতে মারি যাওয়ার পথে ট্রেনে বসেই পাকিস্তানের জনসাধারণ সম্পর্কে মন্তব্য করছেন -এখানকার মরুভূমি দিয়ে বালু উড়ে যাচ্ছে মানুষের মনও উড়ু উড়ু, নির্দয় রুক্ষ-সূক্ষ্ম কোন মায়া নেই, দয়া নেই।

রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু

রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধু অন্যান্য রাষ্ট্রদায়কদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। কমনওয়েলথ সম্মেলন, জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন, ইসলামিক কনফারেন্স ইত্যাদি যেখানেই গেছেন সেখানেই সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছেন। একটি বিধ্বস্ত দেশ, যেখান থেকে এক কোটি মানুষ নিরাপত্তার সন্ধানে ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলো। আরো দুই কোটি মানুষ দেশের ভেতরে উদ্বাস্তু হয়েছিলো। তারা তাদের বাস্তুভিটায় ফিরে এসেছিলো। কিন্তু চাল নেই, চুলো নেই, গরু নেই, হালের লাঙল নেই, এমন কি ফসলের বীজও নেই। সেতু-কালভার্টসহ রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। সেগুলি মেরামত ও সংস্কার করতে হয়েছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত শিল্পকারখানা পরিচালনার জন্য নিহত কর্মীর স্থলে নতুন কর্মী বাহিনী প্রস্তুত করার জন্য তৎকালীন বন্ধুপ্রতিম পূর্ব ইউরোপের দেশে পাঠানো হয়েছিল। জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশের উপরে উঠেছিলো।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধুকে একুশে মার্চ পল্টন ময়দানে জাতির পিতা ঘোষণা করা করেছিলো।

পাকিস্তান সৃষ্টির ৯ বছর পর সংবিধান দেয়া হয়েছিলো। সত্যিকার অর্থে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের সংবিধান দেয়ার আগ পর্যন্ত পাকিস্তান একটি ডোমিনিয়াম ছিলো। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের পর স্বাধীন দেশ হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধু এক বছরের মাথায় ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর জাতীয় সংসদে সংবিধান পাস করান। ১১৬টি দেশের স্বীকৃতি অর্জন করিয়েছিলেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করিয়েছিলেন।

গরিবের বন্ধু বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু গরিবের বন্ধু ছিলেন। একবার বিভিন্ন জেলা থেকে খুলনায় ধান কাটতে গিয়েছিল যাদেরকে দাওয়াল বলা হতো। যারা ধান কাটার বিনিময়ে মজুরি হিসাবে ধান পেতো। কিন্তু তখন দুর্ভিক্ষের কারণে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় খাদ্যশস্য নেওয়া নিষেধ ছিল। তাই খুলনার তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার নাজির চৌধুরী সারা মাস ধান কাটার পর পাওয়া মজুরি ধান তাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু তখন সেই মজুরদের নিয়ে জেলা প্রশাসকের বাসায় গেলেন এবং তাদেরকে ধান নিয়ে যার অনুমতি দেয়ার জন্য বললেন। বেশ পিড়াপিড়ি করার পর জেলা প্রশাসক জানালেন, সরকার থেকে সার্কুলারের মাধ্যমে তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সুতরাং তার করার কিছুই নেই। এখানে বেশ ঝুঁকি ছিলো। জেলা প্রশাসক লাঠিপেটা করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে পারতেন। ঠিক তেমনিভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ রূপ মুজিবুর রহমান অবস্থান নিয়েছিলেন। তার ফলশ্রুতিতে বঙ্গবন্ধুর ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে ছাত্রত্ব বাতিলের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ছোটবেলা থেকেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন এবং নির্যাতিতদের পক্ষে থাকতেন। যখন তিনি রাষ্ট্রনায়ক হয়েছিলেন তখনও আলজেরিয়ায় গিয়ে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বলেছিলেন, পৃথিবী আজ দুই ভাগে বিভক্ত, একদিকে শোষক আরেক দিকে শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।

শিক্ষাবান্ধব বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু শিক্ষাবান্ধব ছিলেন। একমাত্র বঙ্গবন্ধুর সময় শিক্ষায় সর্বোচ্চ জিডিপির শতকরা চার ভাগ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিলো। ছুটির দিনে বঙ্গবন্ধু তার শিক্ষককে গাড়ি পাঠিয়ে এনেছেন তার সাথে খাবার খাওয়ার জন্য। তার শিক্ষকদের সাথে আজীবন সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।

১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গবন্ধু যখন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গিয়েছিলেন, তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমিক স্কুল পরিদর্শন করেছিলেন ও শিক্ষার্থীদের সাথে মিথস্ক্রিয়া করেছিলেন।

কূটনীতিক বঙ্গবন্ধু

অসাধারণ কূটনৈতিক নৈপুন্যের অধিকারী ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসের ১৯ তারিখে খুলনার সার্কিট হাউস ময়দানে বলেছিলেন, ‘কারো সাথে বৈরিতা নয়, সকলের সাথে বন্ধুত্ব, সকল সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান।’ বাংলাদেশ আজও সেই নীতিতে বিশ্বাসী। এটি যেমন রাষ্ট্রীয় জীবনে তেমনি ব্যক্তি জীবনে বা সমাজ জীবনেও সমভাবে প্রযোজ্য। ঘৃণা শুধু ঘৃণারই জন্ম দেয় আর ভালোবাসা জন্ম দেয় ভালোবাসার।

১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু যখন ভারতের কলকাতা ভ্রমণ করেছিলেন, তখন তিনি কলকাতার রাজভবনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। সেই সময় বঙ্গবন্ধু শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেছিলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার জন্মদিনে আপনি একটি উপহার দিবেন সেটি হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে আপনার সৈন্য সরিয়ে নিবেন।’

ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১২ মার্চ বাংলাদেশ থেকে সৈন্য সরিয়ে নিয়ে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে বাংলাদেশে এসেছিলেন। এই স্বল্প সময়ে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের অনন্য দৃষ্টান্ত অন্যান্য দেশকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে নৈতিক তাগিদ দিয়েছিলো।

দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু একজন অসাধারণ দূরদর্শী মানুষ ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে তার পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তিনি বলেছিলেন, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তবে তোমরা বুঝে শুনে কাজ করো। অসংখ্য ঘটনার মধ্যে ৭ মার্চের ভাষণ এবং তার সাথে ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা তুলনা করলে তার দূরদর্শিতার অসাধারণত্বের পরিচয় মেলে।

খাদ্য নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খাদ্য নির্বাচনে খাঁটি বাঙালির পরিচয় পাওয়া যায়। তার পছন্দের খাদ্য তালিকায় ছিলো কৈ মাছ, শিং মাছের ঝোল আর ভাত। চীন সফরের সময় পাকিস্তানি দূতাবাসের কর্মকর্তারা বাসায় বাঙালি খানা খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়েছেন। সে কারণেই তিনি বুক ফুলিয়ে বলেছেন, যারা বিভিন্ন দেশের রাজনীতি করেন তারা কিভাবে বাঙালির দরদ বুঝবে।

বাঙালির বঙ্গবন্ধু-বাংলার বঙ্গবন্ধু

বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। তাই তাকে স্বাধীনতার আগে ১৯৭১ এর ৩ মার্চ জাতির পিতা করেছিলেন। তারও আগে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি তাকে বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত করেছিলেন। আর বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে কেমন ভালোবাসতেন তার বহিঃপ্রকাশ ‘যা কিছু বাঙালিকে নিয়ে তাই আমাকে ভাবায়’ এই উক্তির মধ্যে। কতিপয় বিপথগামীকে দিয়ে সমগ্র বাঙালি জাতিকে বিচার করা যাবে না।

লিখেছেন: নজরুল ইসলাম খান, কিউরেটর, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর

মৌলভীবাজারে প্রতিপক্ষের হামলার শিকার শিশু মিনহাজ বাদ পড়েনি 

গরীবেরবন্ধু বঙ্গবন্ধু একজন ভালো লেখক ছিলেন

প্রকাশের সময় : ০৫:৪২:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৩

শিক্ষা জীবনের প্রস্তুতিতে তিনি অনুসরণীয়। শিক্ষার্থীদের জন্য সব ক্ষেত্রেই অনুকরণীয়। জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইতিবাচক উদাহরণ পাওয়া যাবে না। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর তেমনই কিছু দৃষ্টান্ত নিয়ে এই বিশেষ নিবন্ধ।

লেখক বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু একজন ভালো লেখক ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর লেখা ডায়েরি থেকে তার জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার সম্পাদিত বই ১) অসমাপ্ত আত্মজীবনী ২) কারাগারের রোজনামচ ৩) আমার দেখা নয় চীন।

এসব বই ডজন ডজন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এছাড়াও ইসলামিয়া কলেজে লেখাপড়াকালীন কলেজের প্রকাশনায় লিখতেন। তারই রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরায়ার্দী সম্পর্কে একটি সুলিখিত প্রবন্ধ ‘নেতাকে যেমন দেখেছি’ রচনা করেছেন। ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক রাজনৈতিক কলম যোদ্ধা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পর্কে ‘আমাদের মানিক ভাই’ শিরোনামে দুটি প্রবন্ধ লিখেছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি থাকাকালীন অসংখ্য প্যামপ্লেট, নির্দেশনা, চিঠিপত্র ইত্যাদি লিখেছেন। তিনি সবসময়ই কন্যা শেখ হাসিনা, বাবা লুৎফর রহমান এবং রাজনৈতিক সহযোগীদের কাছে নিজ হাতে চিঠি লিখেছেন। সেসব আজ বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি জাদুঘরে লাখো দর্শকের চিত্তে নাড়া দিচ্ছে।

পাঠক বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু একজন ভালো পাঠক ছিলেন। জীবনের জন্য প্রস্তুতিকাল শৈশব। লক্ষ কোটি মানুষের হাজার হাজার বছরের সঞ্চিত জ্ঞান বইয়ে লিখিত আকারে থাকে। পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, অনেক জ্ঞান সৃষ্টি হয় যা নিজে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হয় না। একমাত্র বই পড়ে এ সম্পর্কে জানা সম্ভব। তাই জীবনের প্রস্তুতি পর্বে পড়ার কোনও বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধু নিজে একজন ভালো পাঠক ছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কারাগারে থাকাকালে একটা বড় অংশ পড়ার জন্য ব্যয় করতেন। সেখানকার পাঠাগারে পছন্দের বইয়ের যোগান ছিল না। তাই কারাগারে দেখা করতে আসার সময় বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা বই নিয়ে আসতেন।

অভিভাবক বঙ্গবন্ধু

রাজনৈতিক কারণেই বঙ্গবন্ধু জীবনের এক-চতুর্থংশ সময় কারাঅভ্যন্তরে কাটিয়েছেন। বাকি এক-চতুর্থাংশ সময় মাঠে-ময়দানে রাজনৈতিক সভা ও আলোচনার মাধ্যমে অতিবাহিত করেছেন। এর মাঝে যেটুকু সময় পেয়েছেন, নিজ পরিবারের যত্ন নিতে ত্রুটি করেননি। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া থেকে স্বাস্থ্যের খবর নিয়েছেন। জ্যেষ্ঠ কন্যা যখন বুঝতে শিখেছে তার কাছেও নিজ হাতে চিঠি লিখেছেন, পরামর্শ-উপদেশ দিয়েছেন। লেখাপড়ার তাগিদ দিয়েছেন।

স্বামী হিসেবে বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধুর বয়স যখন ১২ বছর, আর বেগম ফজিলাতুন্নেছার তিন বছর, তখনই অভিভাবকরা তাদের দুইজনের বিয়ের অঙ্গীকার করেন। ফজিলাতুন্নেছার বয়স ১২ বছরে পৌঁছুলে তাদের বিয়ে হয়। শেখ মুজিবের বয়স তখন ২১ বছর। বিয়ের পরপরই বঙ্গবন্ধু কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে লেখাপড়া করতে গেছেন। কিন্তু, বাল্যসাথীকে কখনোই অবহেলা করেননি। কখনো হয়তো রাজনৈতিক রোষানলে কারাগারে থেকেছেন। কিন্তু সেই নির্জন থেকে চিঠি লিখেছেন, চিঠির অংশ বিশেষ কালি লেপে সেন্সর করা হয়েছে। সঠিক বোঝাপড়া থাকার কারণে তা থেকে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী ঠিকই বঙ্গবন্ধুর মনের কথাটি পড়ে নিয়েছেন। সংসার কিভাবে চলবে, আর্থিক সংস্থান কিভাবে হবে, রাজনৈতিক সহকর্মীদের কিভাবে চাঙ্গা রাখতে হবে তার নির্দেশনা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলেন।

শিক্ষক বঙ্গবন্ধু

তিনিই ভালো শিক্ষক যিনি ভাল পড়ান। শ্রেষ্ঠ শিক্ষক তিনিই যিনি শিক্ষার্থীদের সারা জীবনের জন্য অনুপ্রাণিত করতে পারেন। একটা গান আছে- একবার চাবি মাইরা দেছেন ছাইড়া চলতে আছে জনম ভরে …. । বঙ্গবন্ধু একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। পুরো বাঙালি জাতিকে ২৭ বছর ধরে শিখিয়েছিলেন, পড়িয়েছিলেন, বুঝিয়েছেন যে তোমাদেরকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, শোষণ করা হচ্ছে, অবহেলা করা হচ্ছে, এমনকি তোমাদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা হচ্ছে। বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর কথায় বুঝেছিলো, শিখেছিলো, তাইতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো স্বাধীনতা আন্দোলনে, যুদ্ধে ছিনিয়ে এনেছিলো মানুষের জন্য স্বাধীনতা, একটি দেশ। আজকে যারা প্যালেস্টাইনের মতো অন্য দেশের বা অন্য জাতির অধীনে শাসিত হয় শুধু তারাই এর মর্ম বোঝে। এই উপলব্ধির জন্য ইতিহাস পড়তে হবে। সেই সময়ের পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে হবে। অন্যদের সাথে কথা বলতে হবে, তাদেরকে শুনতে হবে।

নেতা বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু ছিলেন চুম্বকের মতো। তার চারপাশে কর্মীরা সবসময় আকর্ষিত হতো। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গবন্ধুর মা-বাবা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমার ছেলে যেখানে যায় সেখানকার সবাই তাকে নেতা বলে মানে। দীর্ঘদিনের জনসাধারণের সাথে মিথষ্ক্রিয়া করার অভিজ্ঞতা এবং নানা চড়াই-উতরাই পার হওয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা হয়েছেন। এমনকি হত্যাকারীদের স্বীকারোক্তিতে বেরিয়ে এসেছে তিনি এমন একজন নেতা ছিলেন যে, মানুষকে সহজেই সম্মোহন করতে পারতেন। সব নেতাকর্মীর নাম মুখস্ত, তাদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা ছিলো তার। মানুষকে একনজর দেখেই বঙ্গবন্ধু তার সম্পর্কে সম্যক ধারণা করতে পারতেন। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে যখন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করতে মারি যাওয়ার পথে ট্রেনে বসেই পাকিস্তানের জনসাধারণ সম্পর্কে মন্তব্য করছেন -এখানকার মরুভূমি দিয়ে বালু উড়ে যাচ্ছে মানুষের মনও উড়ু উড়ু, নির্দয় রুক্ষ-সূক্ষ্ম কোন মায়া নেই, দয়া নেই।

রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু

রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধু অন্যান্য রাষ্ট্রদায়কদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। কমনওয়েলথ সম্মেলন, জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন, ইসলামিক কনফারেন্স ইত্যাদি যেখানেই গেছেন সেখানেই সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছেন। একটি বিধ্বস্ত দেশ, যেখান থেকে এক কোটি মানুষ নিরাপত্তার সন্ধানে ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলো। আরো দুই কোটি মানুষ দেশের ভেতরে উদ্বাস্তু হয়েছিলো। তারা তাদের বাস্তুভিটায় ফিরে এসেছিলো। কিন্তু চাল নেই, চুলো নেই, গরু নেই, হালের লাঙল নেই, এমন কি ফসলের বীজও নেই। সেতু-কালভার্টসহ রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। সেগুলি মেরামত ও সংস্কার করতে হয়েছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত শিল্পকারখানা পরিচালনার জন্য নিহত কর্মীর স্থলে নতুন কর্মী বাহিনী প্রস্তুত করার জন্য তৎকালীন বন্ধুপ্রতিম পূর্ব ইউরোপের দেশে পাঠানো হয়েছিল। জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশের উপরে উঠেছিলো।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধুকে একুশে মার্চ পল্টন ময়দানে জাতির পিতা ঘোষণা করা করেছিলো।

পাকিস্তান সৃষ্টির ৯ বছর পর সংবিধান দেয়া হয়েছিলো। সত্যিকার অর্থে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের সংবিধান দেয়ার আগ পর্যন্ত পাকিস্তান একটি ডোমিনিয়াম ছিলো। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের পর স্বাধীন দেশ হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধু এক বছরের মাথায় ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর জাতীয় সংসদে সংবিধান পাস করান। ১১৬টি দেশের স্বীকৃতি অর্জন করিয়েছিলেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করিয়েছিলেন।

গরিবের বন্ধু বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু গরিবের বন্ধু ছিলেন। একবার বিভিন্ন জেলা থেকে খুলনায় ধান কাটতে গিয়েছিল যাদেরকে দাওয়াল বলা হতো। যারা ধান কাটার বিনিময়ে মজুরি হিসাবে ধান পেতো। কিন্তু তখন দুর্ভিক্ষের কারণে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় খাদ্যশস্য নেওয়া নিষেধ ছিল। তাই খুলনার তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার নাজির চৌধুরী সারা মাস ধান কাটার পর পাওয়া মজুরি ধান তাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু তখন সেই মজুরদের নিয়ে জেলা প্রশাসকের বাসায় গেলেন এবং তাদেরকে ধান নিয়ে যার অনুমতি দেয়ার জন্য বললেন। বেশ পিড়াপিড়ি করার পর জেলা প্রশাসক জানালেন, সরকার থেকে সার্কুলারের মাধ্যমে তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সুতরাং তার করার কিছুই নেই। এখানে বেশ ঝুঁকি ছিলো। জেলা প্রশাসক লাঠিপেটা করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে পারতেন। ঠিক তেমনিভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ রূপ মুজিবুর রহমান অবস্থান নিয়েছিলেন। তার ফলশ্রুতিতে বঙ্গবন্ধুর ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে ছাত্রত্ব বাতিলের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ছোটবেলা থেকেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন এবং নির্যাতিতদের পক্ষে থাকতেন। যখন তিনি রাষ্ট্রনায়ক হয়েছিলেন তখনও আলজেরিয়ায় গিয়ে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বলেছিলেন, পৃথিবী আজ দুই ভাগে বিভক্ত, একদিকে শোষক আরেক দিকে শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।

শিক্ষাবান্ধব বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু শিক্ষাবান্ধব ছিলেন। একমাত্র বঙ্গবন্ধুর সময় শিক্ষায় সর্বোচ্চ জিডিপির শতকরা চার ভাগ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিলো। ছুটির দিনে বঙ্গবন্ধু তার শিক্ষককে গাড়ি পাঠিয়ে এনেছেন তার সাথে খাবার খাওয়ার জন্য। তার শিক্ষকদের সাথে আজীবন সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।

১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গবন্ধু যখন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গিয়েছিলেন, তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমিক স্কুল পরিদর্শন করেছিলেন ও শিক্ষার্থীদের সাথে মিথস্ক্রিয়া করেছিলেন।

কূটনীতিক বঙ্গবন্ধু

অসাধারণ কূটনৈতিক নৈপুন্যের অধিকারী ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসের ১৯ তারিখে খুলনার সার্কিট হাউস ময়দানে বলেছিলেন, ‘কারো সাথে বৈরিতা নয়, সকলের সাথে বন্ধুত্ব, সকল সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান।’ বাংলাদেশ আজও সেই নীতিতে বিশ্বাসী। এটি যেমন রাষ্ট্রীয় জীবনে তেমনি ব্যক্তি জীবনে বা সমাজ জীবনেও সমভাবে প্রযোজ্য। ঘৃণা শুধু ঘৃণারই জন্ম দেয় আর ভালোবাসা জন্ম দেয় ভালোবাসার।

১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু যখন ভারতের কলকাতা ভ্রমণ করেছিলেন, তখন তিনি কলকাতার রাজভবনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। সেই সময় বঙ্গবন্ধু শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেছিলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার জন্মদিনে আপনি একটি উপহার দিবেন সেটি হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে আপনার সৈন্য সরিয়ে নিবেন।’

ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১২ মার্চ বাংলাদেশ থেকে সৈন্য সরিয়ে নিয়ে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে বাংলাদেশে এসেছিলেন। এই স্বল্প সময়ে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের অনন্য দৃষ্টান্ত অন্যান্য দেশকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে নৈতিক তাগিদ দিয়েছিলো।

দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু একজন অসাধারণ দূরদর্শী মানুষ ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে তার পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তিনি বলেছিলেন, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তবে তোমরা বুঝে শুনে কাজ করো। অসংখ্য ঘটনার মধ্যে ৭ মার্চের ভাষণ এবং তার সাথে ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা তুলনা করলে তার দূরদর্শিতার অসাধারণত্বের পরিচয় মেলে।

খাদ্য নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খাদ্য নির্বাচনে খাঁটি বাঙালির পরিচয় পাওয়া যায়। তার পছন্দের খাদ্য তালিকায় ছিলো কৈ মাছ, শিং মাছের ঝোল আর ভাত। চীন সফরের সময় পাকিস্তানি দূতাবাসের কর্মকর্তারা বাসায় বাঙালি খানা খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়েছেন। সে কারণেই তিনি বুক ফুলিয়ে বলেছেন, যারা বিভিন্ন দেশের রাজনীতি করেন তারা কিভাবে বাঙালির দরদ বুঝবে।

বাঙালির বঙ্গবন্ধু-বাংলার বঙ্গবন্ধু

বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। তাই তাকে স্বাধীনতার আগে ১৯৭১ এর ৩ মার্চ জাতির পিতা করেছিলেন। তারও আগে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি তাকে বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত করেছিলেন। আর বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে কেমন ভালোবাসতেন তার বহিঃপ্রকাশ ‘যা কিছু বাঙালিকে নিয়ে তাই আমাকে ভাবায়’ এই উক্তির মধ্যে। কতিপয় বিপথগামীকে দিয়ে সমগ্র বাঙালি জাতিকে বিচার করা যাবে না।

লিখেছেন: নজরুল ইসলাম খান, কিউরেটর, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর